৪ রাকাত বিশিষ্ট সুন্নত নামাজে প্রথম দুই রাকাতে সূরা মিলিয়ে শেষ দুই রাকাতে না মিলালে নামাজ ভঙ্গ হবে কি?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: ৪ রাকাত বিশিষ্ট সুন্নত নামাজে প্রথম দুই রাকাতে সূরা মিলানো এবং শেষ দুই রাকাতে সূরা না মিলানো
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রথম দুই রাকাতে সূরা মিলানো এবং শেষ দুই রাকাতে সূরা না মিলানো — এতে নামাজ ভঙ্গ হবে না, নতুন করে পড়তে হবে না। তবে এটি সুন্নতের খিলাফ (বিপরীত) এবং মাকরূহ। আর ইচ্ছাকৃতভাবে শেষ দুই রাকাতে সূরা না মিলানো এবং কেবল প্রথম দুই রাকাতে মিলানো — এটি বিদআত নয়, বরং সুন্নত পরিত্যাগের কারণে মাকরূহ ও গুনাহের কাজ। তবে কেউ যদি এটাকে ইবাদত মনে করে নিয়মিত করে, তাহলে বিদআতের সীমায় পৌঁছাতে পারে।
বিস্তারিত উত্তর
১. ৪ রাকাত বিশিষ্ট সুন্নত নামাজে সূরা মিলানোর বিধান
হানাফি মাজহাবে ৪ রাকাত বিশিষ্ট সুন্নত নামাজে (যেমন: যোহরের আগের ৪ রাকাত, যোহরের পরের ২ রাকাত, আসরের আগের ৪ রাকাত, ইশার পরের ২ রাকাত, জুমার আগের ৪ রাকাত) প্রত্যেক রাকাতেই সূরা ফাতিহার পর সূরা বা আয়াত মিলানো সুন্নত।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنَ الْقُرْآنِ "সুতরাং কুরআনের যতটুকু সহজ হয়, ততটুকু পড়ো।" — (সূরা মুযযাম্মিল: ২০)
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
ثُمَّ اقْرَأْ بِمَا تَيَسَّرَ مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ "অতঃপর কুরআন থেকে যা তোমার জন্য সহজ হয়, তা পড়ো।" — (সহিহ বুখারি: ৭৫৭, সহিহ মুসলিম: ৩৯৭)
ফিকহের কিতাবে বর্ণনা:
وَيَقْرَأُ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ مِنَ السُّنَنِ وَالنَّوَافِلِ الْفَاتِحَةَ وَمَا تَيَسَّرَ مِنَ الْقُرْآنِ "সুন্নত ও নফল নামাজের প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহা এবং কুরআন থেকে যা সহজ হয় তা পড়বে।" — (আল-হিদায়া, কিতাবুস সালাত; রাদ্দুল মুহতার: ২/২৬৩)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত হলো, নফল ও সুন্নত নামাজের প্রত্যেক রাকাতেই সূরা ফাতিহার পর সূরা মিলানো উত্তম ও সুন্নত। (ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/৭০)
২. প্রথম দুই রাকাতে সূরা মিলিয়ে শেষ দুই রাকাতে না মিলালে নামাজের হুকুম
নামাজ ভঙ্গ হবে না, নতুন করে পড়তে হবে না। কারণ সূরা মিলানো সুন্নত — ফরজ বা ওয়াজিব নয়। সুন্নত ছুটে গেলে সিজদা সাহু ওয়াজিব হয় না (কারণ সিজদা সাহু ওয়াজিব হয় ওয়াজিব ছুটলে বা ফরজে বিল-ইনফিরাদে ত্রুটি হলে)। তবে সুন্নত ছুটে যাওয়ার কারণে নামাজ মাকরূহ হবে এবং গুনাহ হবে।
وَلَا سُجُودَ لِتَرْكِ سُنَّةٍ مِنَ السُّنَنِ إِلَّا فِي مَوَاضِعَ مَخْصُوصَةٍ "সুন্নত ছুটে গেলে সিজদা সাহু নেই, কিছু নির্দিষ্ট স্থান ব্যতীত।" — (রাদ্দুল মুহতার: ২/৫৫০; আল-হিদায়া)
তবে হ্যাঁ, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে শেষ দুই রাকাতে সূরা না মিলায়, তাহলে সে সুন্নত পরিত্যাগের গুনাহগার হবে। আর যদি ভুলে ছুটে যায়, তাহলে ইনশাআল্লাহ ক্ষমা পাওয়ার আশা আছে, নামাজ হয়ে যাবে।
৩. ইচ্ছাকৃতভাবে কেবল প্রথম দুই রাকাতে সূরা মিলানো — এটি কি বিদআত?
সরাসরি বিদআত নয়, বরং সুন্নত পরিত্যাগের কারণে মাকরূহ ও গুনাহ। কারণ:
- বিদআত হলো — দ্বীনে এমন নতুন কিছু সৃষ্টি করা যা রাসূল ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম করেননি এবং যাকে ইবাদত মনে করা হয়।
- এখানে ব্যক্তি নতুন কোনো ইবাদত সৃষ্টি করছে না; বরং সুন্নত পরিত্যাগ করছে। সুতরাং এটি বিদআত নয়, বরং তরকুস সুন্নাহ (সুন্নত পরিত্যাগ)।
তবে যদি কেউ এটাকে নিয়ম বানিয়ে ফেলে এবং মনে করে যে এটাই সঠিক পদ্ধতি বা এটাই সুন্নত — তাহলে তা বিদআতের সীমায় পৌঁছাবে। কারণ তখন সে সুন্নতকে অস্বীকার বা বিকৃত করছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করবে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।" — (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)
আর সুন্নত পরিত্যাগ সম্পর্কে:
فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي "যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।" — (সহিহ বুখারি: ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম: ১৪০১)
৪. করণীয়
১. নামাজ হয়ে যাবে, নতুন করে পড়তে হবে না। ২. তবে ইচ্ছাকৃতভাবে শেষ দুই রাকাতে সূরা না মিলানো মাকরূহ ও গুনাহের কাজ — এটি পরিত্যাগ করা আবশ্যক। ৩. ভুলে ছুটে গেলে নামাজ সহিহ, তবে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকতে হবে। ৪. প্রত্যেক রাকাতেই সূরা ফাতিহার পর কমপক্ষে তিন আয়াত বা একটি ছোট সূরা মিলানো সুন্নত। ৫. কেউ যদি এটাকে নিয়ম বানিয়ে ইবাদত মনে করে, তাহলে তাওবা করতে হবে এবং সুন্নত অনুযায়ী আমল করতে হবে।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |------|------| | প্রথম দুই রাকাতে সূরা মিলানো | সুন্নত | | শেষ দুই রাকাতে সূরা না মিলানো (ভুলে) | নামাজ সহিহ, সিজদা সাহু নেই | | শেষ দুই রাকাতে সূরা না মিলানো (ইচ্ছাকৃত) | মাকরূহ ও গুনাহ, নামাজ সহিহ | | নামাজ ভঙ্গ হবে কি? | না | | নতুন করে পড়তে হবে কি? | না |