কিনায়া শব্দে মনে মনে তালাকের নিয়ত করলে ও মনে মনে ইনশাআল্লাহ বললে তালাক পতিত হবে কি না?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
মনে মনে ওয়াদা ও কিনায়া শব্দে তালাক সম্পর্কে ফতোয়া
প্রশ্ন ১: মনে মনে ওয়াদা করলে কি ওয়াদা হয়?
উত্তর:
ওয়াদা একটি ইবাদত-সংক্রান্ত ও সামাজিক চুক্তি। ইসলামী ফিকহের মূলনীতি হলো—মনে মনে সংকল্প করলে বা মনে মনে ওয়াদা করলে তা শরীয়তসম্মত ওয়াদা হিসেবে গণ্য হয় না, যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারণ করা হয় বা লিখিত আকারে প্রকাশ করা হয়।
দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسُهَا مَا لَمْ تَتَكَلَّمْ بِهِ أَوْ تَعْمَلْ بِهِ»
অর্থ: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের অন্তরের কল্পনা (ওয়াসওয়াসা) ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা বলে বা কাজে পরিণত করে।" — সহীহ বুখারী: ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম: ১২৭
ফিকহী ব্যাখ্যা:
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:
"الحديث النفس لا يؤاخذ به الإنسان في الأيمان والنذور والوعود، وإنما المؤاخذة باللفظ أو الكتابة"
অর্থ: "অন্তরের কল্পনা দ্বারা কসম, মান্নত ও ওয়াদার ক্ষেত্রে বান্দা পাকড়াও হবে না; পাকড়াও হবে কেবল মুখের উচ্চারণ বা লেখনী দ্বারা।" — রাদ্দুল মুহতার: ৩/৭০০ (কিতাবুল আয়মান)
সারসংক্ষেপ:
| অবস্থা | ওয়াদা হবে কি? | |--------|----------------| | শুধু মনে মনে সংকল্প | না | | মুখে উচ্চারণ (নিজে শুনতে পায়) | হ্যাঁ | | ফিসফিস করে (নিজে শুনতে পায়) | হ্যাঁ | | ঠোঁট নাড়ল কিন্তু আওয়াজ বের হলো না | না (তবে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম) |
বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ: যদি কেউ ওয়াদা করে এবং তা পূরণ না করে, তবে তা নৈতিকভাবে গর্হিত ও আখিরাতে জবাবদিহির বিষয় হবে—যদিও তা শরীয়তসম্মত বাধ্যতামূলক ওয়াদা হিসেবে গণ্য না হয়। তাই ওয়াদা করা হলে তা পূরণ করাই মুমিনের কর্তব্য।
প্রশ্ন ২: বিবাহের পর কিনায়া শব্দ বলে মনে মনে তালাকের নিয়ত করলে এবং মনে মনে "ইনশাআল্লাহ" বললে তালাক হবে কি?
উত্তর:
এই প্রশ্নের উত্তর দুটি স্তরে বিভক্ত:
(ক) কিনায়া শব্দে তালাকের মূলনীতি:
কিনায়া শব্দ (যেমন: "যাও", "তোমাকে ছেড়ে দিলাম", "তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই" ইত্যাদি) দ্বারা তালাক পতিত হয় কেবল তখনই, যখন সাথে তালাকের নিয়ত থাকে অথবা তালাকের প্রমাণবহ পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকে।
ইমাম কাসানী (রহ.) «বাদায়েউস সানায়ে»-তে বলেন:
"الكناية لا يقع بها الطلاق إلا بالنية أو بدلالة الحال"
অর্থ: "কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হয় না, তবে নিয়ত বা অবস্থার দলীল থাকলে পতিত হয়।" — বাদায়েউস সানায়ে: ৩/২৯৫; আল-হিদায়া: ২/৩৭৩
(খ) "ইনশাআল্লাহ" বলার প্রভাব:
এখানে তিনটি সম্ভাব্য অবস্থা বিবেচনা করতে হবে:
অবস্থা ১: মুখে কিনায়া শব্দ বলল + মনে মনে তালাকের নিয়ত করল + মনে মনে "ইনশাআল্লাহ" বলল
হুকুম: এ ক্ষেত্রে তালাক পতিত হবে। কারণ—
- কিনায়া শব্দ মুখে উচ্চারিত হয়েছে
- তালাকের নিয়ত অন্তরে বিদ্যমান ছিল
- মনে মনে "ইনশাআল্লাহ" বলার দ্বারা তালাক স্থগিত হয় না, কারণ ইনশাআল্লাহ শব্দটি মুখে উচ্চারিত হয়নি; আর তালাকের ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহর প্রভাব কেবল তখনই কার্যকর হয় যখন তা তালাকের সাথে সংযুক্ত করে মুখে উচ্চারণ করা হয়।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"لو قال أنت طالق إن شاء الله لا يقع الطلاق، ولو نوى بقلبه إن شاء الله ولم يتلفظ به يقع"
অর্থ: "যদি বলে 'তুমি তালাক, ইনশাআল্লাহ' তবে তালাক পতিত হবে না; আর যদি অন্তরে ইনশাআল্লাহ নিয়ত করে কিন্তু মুখে না বলে, তবে তালাক পতিত হবে।" — রাদ্দুল মুহতার: ৩/২৪৭
অবস্থা ২: মুখে কিনায়া শব্দ বলল + মনে মনে তালাকের নিয়ত করল + মুখে "ইনশাআল্লাহ" বলল
হুকুম: এ ক্ষেত্রে তালাক পতিত হবে না। কারণ ইনশাআল্লাহ মুখে উচ্চারণ করা হয়েছে, যা তালাককে স্থগিত করে দেয়।
অবস্থা ৩: মুখে কিনায়া শব্দ বলল + মনে মনে তালাকের নিয়ত নেই + মনে মনে "ইনশাআল্লাহ" বলল
হুকুম: তালাক পতিত হবে না। কারণ কিনায়া শব্দে তালাকের জন্য নিয়ত শর্ত; নিয়ত না থাকলে তালাক হয় না।
চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ:
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | মনে মনে ওয়াদা করলে ওয়াদা হয়? | না, মুখে উচ্চারণ বা লেখা ছাড়া ওয়াদা শরীয়তসম্মতভাবে সংঘটিত হয় না | | ঠোঁট নাড়ল কিন্তু আওয়াজ বের হলো না? | না, ওয়াদা হয় না (তবে সতর্কতা কাম্য) | | কিনায়া শব্দ + মনে মনে তালাকের নিয়ত + মনে মনে ইনশাআল্লাহ? | তালাক পতিত হবে | | কিনায়া শব্দ + মনে মনে তালাকের নিয়ত + মুখে ইনশাআল্লাহ? | তালাক পতিত হবে না | | কিনায়া শব্দ + তালাকের নিয়ত নেই? | তালাক পতিত হবে না |