পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে মৃত্যু কামনা করা কি জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
কারো যদি জীবনে নানান ধরনের সমস্যা থাকে,জীবনের প্রতিটা সম্পর্কে আনফিট থাকে।যার কাছেই যায় তারই সমস্যা সৃষ্টি হয়।মোটকথা বোঝা হিসেবেই সব জায়গায় বিবেচিত হয় তাহলে তার কি কল্যাণের সাথে দ্রুত মৃত্যুর দুআ করতে পারবে আর এটার জন্য কি স্বলাতুল হাজত পড়ে পড়ে দুআ করলে কি গুনাহ হবে? এই দুনিয়ার প্রতিটা জায়গায় চলার জন্য মাহরাম প্রয়োজন হয়।মেয়েটার এমন কোনো মাহরামও দুনিয়াতে নেই।যে বা যারা ছিলো তারাও বোঝা হিসেবে নিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।তার একা থাকাও সম্ভব না, কারো সাথেও থাকা সম্ভব হচ্ছেনা বোঝা হয়ে যাওয়ার জন্য।বিয়ে করে কারো দ্বায়িত্ব হবে সেই মানুষটাও দিনশেষে ধোঁকা দিয়েছে অন্য আরেকটা মেয়ের জন্য সেও নিজ মুখেই বলেছে যে উক্ত নারী তার জন্যও বোঝা।
এখানে মেয়েটার মাটির নিচে থাকা ছাড়া আর কোনো অবস্থান নেই।সেক্ষেত্রে দুআ করা যাবে কি?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যক্তির দুঃখজনক অবস্থার জন্য আমরা অত্যন্ত সমবেদনা প্রকাশ করছি। ইসলাম সবসময় কষ্ট ও পরীক্ষার সময় ধৈর্য, আল্লাহর উপর ভরসা এবং দুআ করার নির্দেশ দেয়। নিচে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
১. কল্যাণের সাথে দ্রুত মৃত্যুর দুআ করা যাবে কি?
হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যেন কোনো কষ্টের কারণে মৃত্যু কামনা না করে। যদি কারো মৃত্যু কামনা করতেই হয়, তবে সে যেন বলে: ‘হে আল্লাহ! যতক্ষণ আমার জন্য জীবন কল্যাণকর, ততক্ষণ আমাকে জীবিত রাখো, এবং যখন আমার জন্য মৃত্যু কল্যাণকর হবে, তখন আমাকে মৃত্যু দান করো’।" (বুখারী, মুসলিম)
অতএব, চরম দুর্দশায় পড়ে যদি কেউ মনে করে যে মৃত্যুই তার জন্য কল্যাণকর, তবে এই দুআ করা জায়েয আছে। তবে এটি অন্তরে দুর্বলতা ও হতাশার কারণে না হয়ে বরং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে করা উচিত। হাদীসে আরো এসেছে যে, "মৃত্যু কামনা করো না, কারণ মৃত্যুর সময় কষ্ট আরো বেশি।" (তিরমিযী)
তাই, শর্তসাপেক্ষে অর্থাৎ "যদি মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর হয় তবেই" এই নিয়তে দুআ করা যেতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ হতাশা ও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে মৃত্যু কামনা করা কবিরা গুনাহ।
২. স্বলাতুল হাজত পড়ে এই দুআ করলে কি গুনাহ হবে?
স্বলাতুল হাজত (প্রয়োজনের নামায) যেকোনো বৈধ প্রয়োজনের জন্য পড়া জায়েয। যেহেতু উপরের শর্তসাপেক্ষে মৃত্যুর দুআ জায়েয, তাই স্বলাতুল হাজত পড়ে সেই দুআ করলে গুনাহ হবে না। তবে নিয়ত হতে হবে: "হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো যে আমার জন্য মৃত্যুই ভালো, তবে তা দান করো। আর যদি জীবনই ভালো হয়, তবে আমাকে সেই কষ্ট থেকে উত্তরণের পথ দেখাও।"
৩. মেয়েটির বর্তমান অবস্থায় করণীয় কী?
- আল্লাহর উপর ভরসা ও ধৈর্য: কুরআনে আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান অপরিমিতভাবে দেওয়া হবে।" (সূরা আয-যুমার, ১০)
- নিরাপদ পরিবেশের সন্ধান: মাহরাম না থাকলে কোনো বিশ্বস্ত মুসলিম মহিলার সাথে অথবা কোনো মহিলা হোস্টেল/মাদ্রাসায় থাকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নিজে একা থাকা নিষেধ নয় তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
- মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন: বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার চিন্তা থেকে দূরে থাকতে ইসলামী কাউন্সেলিং বা চিকিৎসকের সাহায্য নিন। আত্মহত্যা কবিরা গুনাহ (বুখারী)।
- প্রতারণার শিকার হওয়ার পর: স্বামী প্রতারণা করলে ইসলামী আইনে তালাক ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা আছে। কোনো ইসলামী প্রতিষ্ঠানের (যেমন- জামিয়া, দারুল ইফতা) সাহায্য নিন।
৪. সংশ্লিষ্ট হানাফী ফতোয়া:
- ফতোয়া উসমানী (মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.) তে এসেছে, "বিপদে পতিত ব্যক্তির জন্য ধৈর্য ও দুআ করাই উত্তম। মৃত্যু কামনা করা সংগত নয়, কিন্তু যদি কারো ঈমানের জন্য ভয় হয়, তবে তা অনুমোদিত।" (ফতোয়া উসমানী, ২/৪১)
- ইমদাদুল ফতোয়া তে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন, "মৃত্যু কামনার হাদীসটি পার্থিব মুসীবতের জন্য নয়, বরং দ্বীনী ফিতনার জন্য প্রযোজ্য। তবে অসহ্য কষ্টে পড়লেও 'আল্লাহ তুমি আমার ভালো যা জানো তাই করো' বলা উচিত।" (ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২৭২)
সারসংক্ষেপ
- শর্তসাপেক্ষে (যদি কল্যাণকর হয়) মৃত্যুর দুআ করা জায়েয, তবে সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে নয়।
- স্বলাতুল হাজত পড়ে সেই দুআ করায় গুনাহ নেই, তবে নিয়ত শুদ্ধ রাখতে হবে।
- বর্তমান অবস্থায় ধৈর্য, আল্লাহর রহমতের আশা এবং ব্যবহারিক সমাধানের চেষ্টা করাই উত্তম। কোনো অবস্থাতেই আত্মহত্যা বা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া জায়েয নয়।
আল্লাহ তাকে ধৈর্য ও উত্তম পথ দেখান। আমীন।