বিয়েতে স্বামী কর্তৃক প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের বিষয়ে মিথ্যা বলা ও ধোঁকা দেওয়ার শরয়ী হুকুম কী?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার বিয়েটা পারিবারিকভাবে হয়েছিল। বিয়ের সময় সে বলেছিল তার বউ আছে কিন্তু তার সাথে থাকে না, মাঝে মাঝে বাড়িতে আসে এবং তার ২টা বাচ্চা। ঘটকও এই কথা বলেছিল। বিয়ের পরে জানতে পারলাম তার স্ত্রী তার সাথেই থাকে এবং তার ৫টা বাচ্চা।
সে বলেছিল তার মায়ের সাথে আমাকে কথা বলিয়ে দেবে, কিন্তু দেয়নি। তার বাবা-মা এই বিয়ের কথা জানত না, শুধু তার মামাতো ভাই জানত। আমাদের বিয়ের পর তার দুলাভাই আমাদের বাসায় এসেছিল এবং তার মা-বাবাকে বুঝিয়েছিল, কিন্তু তারাও মানেনি।
সে বলে সে আমাকে মানতেক (বুঝিয়ে) করেছে। আসলে কি এটা মানতেক হলো, নাকি শরীয়তের দৃষ্টিতে একজন অসহায় মেয়েকে ধোঁকা দেওয়া হলো? এর হুকুম কী?
দয়া করে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জানাবেন।
Answer
বিয়েতে ধোঁকা দেওয়ার শরয়ী হুকুম
উত্তর (সংক্ষেপে): প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় স্বামী কর্তৃক তার প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে স্পষ্ট ধোঁকা ও প্রতারণা, যা হারাম ও কবিরা গুনাহ। এটি "মানতেক" বা বৈধ বোঝানো নয়; বরং এটি তালবিস ও ধোঁকা। তবে উলামায়ে কেরামের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কেবল এই ধোঁকা দেওয়ার কারণে নিকাহ স্বয়ং বাতিল হয় না — নিকাহ শুদ্ধ থাকার জন্য পক্ষদ্বয়ের সম্মতি ও সাক্ষীই মূল শর্ত। স্বামীর প্রথম স্ত্রীর সাথে থাকা সত্ত্বেও "তার সাথে থাকি না" বলা — এটা সরাসরি মিথ্যা, যা কুরআনের নির্দেশের পরিপন্থী।
১. কুরআনের দলিল
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ
"তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জেনে-বুঝে সত্য গোপন করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ৪২)
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
বিয়ের প্রস্তাবের সময় স্ত্রী-সন্তান সম্পর্কে সত্য তথ্য গোপন করা বা মিথ্যা বলা — এগুলো সবই উপরোক্ত আয়াতসমূহের পরিপন্থী।
২. হাদীসের দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
"যে ব্যক্তি আমাদের সাথে ধোঁকা (গিশ) করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম: ১০১; সুনানে আবু দাউদ: ৩৪৫২)
الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ
"মুসলিমগণ তাদের শর্তসমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।" (সুনানে তিরমিযী: ১৩৫২; সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৯৪ — হাসান সহীহ)
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
"ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির শিকার হওয়াও যাবে না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১; মুয়াত্তা মালিক: ২/৭৪৫)
إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ صِدِّيقًا، وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ
"নিশ্চয়ই সত্যবাদিতা সৎকর্মের দিকে নিয়ে যায়, আর সৎকর্ম জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। আর নিশ্চয়ই মিথ্যাচার পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।" (সহীহ বুখারী: ৬০৯৪; সহীহ মুসলিম: ২৬০৭)
উপসংহার: প্রশ্নে বর্ণিত কাজটি শরীয়তের দৃষ্টিতে স্পষ্ট ধোঁকা ও হারাম। এটি "মানতেক" নয়; বরং তালবিস। নিকাহ শুদ্ধ থাকলেও স্বামী কবীরা গুনাহের দায় থেকে মুক্ত নয়।