সোশ্যাল মিডিয়ায় কমেন্ট করার কারণে অমুসলিমরা ইসলামকে কটুক্তি করলে করণীয় কী?
Faith and Belief · Hanafi
Question
সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মে আমরা অনেক সময় বিভিন্ন বিষয়ে কমেন্ট করে থাকি। আমার প্রশ্ন হলো আমরা অনেকে অনেক সময় কোনো একটা বিষয় নিয়ে কমেন্ট করলে দেখা যায় অনেক অমুসলিম এসে আমাদের কমেন্টের রিপ্লাইয়ে ইসলামকে কটুক্তি করে কমেন্ট করে। অথচ আমাদের কমেন্ট ধর্মীয় কোনো বিষয় নিয়ে ছিল না, ভিন্ন কোনো কনটেক্সটে ছিল। শুধুমাত্র মতের অমিলের কারণে ঐ অমুসলিমরা আমাদের নাম দেখেই ইসলামকে কটুক্তি করে কমেন্ট করে। এখন আমার প্রশ্ন হলো তখন কি আমাদের কমেন্ট রাখা ঠিক হবে নাকি ডিলিট করে দিতে হবে? আমাদের কমেন্টের কন্টেক্সট ভিন্ন বিষয়ে ছিল, না ইসলাম নিয়ে কিছু কমেন্ট করা হইছে না অমুসলিমদের ধর্মকে নিয়ে কটুক্তি করে কমেন্ট করা হয়েছে। ইদানীং কোনো কিছুতে কমেন্ট করলেই এরা বেশিরভাগ আমাদের নাম দেখেই ইসলামকে কটুক্তি করা শুরু দেয়।
ধন্যবাদ
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন বিষয়ে কমেন্ট করার সময় অমুসলিমরা কেবল নাম দেখে ইসলামকে কটুক্তি করে। আমাদের কমেন্ট ধর্মীয় বিষয় নিয়ে ছিল না, বরং ভিন্ন প্রসঙ্গে ছিল। এখন করণীয় কী—কমেন্ট রাখা, নাকি ডিলিট করা?
উত্তর
১. মূলনীতি: ইসলামের শত্রুদের জন্য অজুহাত তৈরি করা যাবে না
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে ইরশাদ করেন:
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ
"তোমরা তাদেরকে গালি দিও না, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ডাকে; ফলে তারা অজ্ঞতাবশতঃ সীমালঙ্ঘন করে আল্লাহকেই গালি দেবে।" — (সূরা আল-আন'আম: ১০৮)
এই আয়াত থেকে ইমামগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উসূল (নীতি) গ্রহণ করেছেন: যে কাজের মাধ্যমে কাফির-মুশরিকদের ইসলাম ও আল্লাহকে কটুক্তি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, তা পরিহার করা মুমিনের কর্তব্য। যদিও আমাদের কমেন্টে ইসলামের কটুক্তি করার কোনো উদ্দেশ্য নেই, তবুও যদি বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে আমাদের উপস্থিতিই তাদের কটুক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাহলে তা বন্ধ করা উচিত।
২. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে বিধান
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেন:
وَيُكْرَهُ مُخَالَطَةُ أَهْلِ الْبِدَعِ وَالْفُسَّاقِ وَالْكُفَّارِ إِذَا كَانَ فِي ذَلِكَ تَعْظِيمٌ لَهُمْ أَوْ إِضْرَارٌ بِالْمُسْلِمِينَ
"বিদআতী, ফাসিক ও কাফিরদের সাথে মেলামেশা মাকরূহ, যখন তাতে তাদের সম্মান প্রদর্শন হয় অথবা মুসলিমদের ক্ষতি হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯০-এর কাছাকাছি)
ফাতাওয়া আলমগিরিতে এসেছে:
وَلَا يَنْبَغِي لِلْمُسْلِمِ أَنْ يَتَعَرَّضَ لِمَوَاضِعِ الْفِتَنِ وَالشُّبُهَاتِ
"মুসলিমের উচিত নয় ফিতনা ও সন্দেহের স্থানসমূহে নিজেকে উপস্থাপন করা।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি"-তে উল্লেখ করেন যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন স্থানে অংশগ্রহণ করা যেখানে দ্বীনের অবমাননার আশঙ্কা রয়েছে, তা পরিহার করা উচিত। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, সোশ্যাল মিডিয়া সংক্রান্ত অধ্যায়)
৩. করণীয়: স্তরভেদে সমাধান
| অবস্থা | বিধান | |--------|-------| | কমেন্ট রাখলে প্রতিবার ইসলামের কটুক্তি হয় | কমেন্ট ডিলিট করা বা এড়িয়ে চলা ওয়াজিবের কাছাকাছি | | মাঝে মাঝে কটুক্তি হয়, তবে কমেন্ট দ্বীনি উপকারী | রাখা জায়েজ, তবে রিপোর্ট/ব্লক করা উত্তম | | কমেন্ট দ্বীনি দাওয়াতের উদ্দেশ্যে এবং কটুক্তির আশঙ্কা কম | রাখা উত্তম, ধৈর্য ধারণ করা | | কমেন্ট সম্পূর্ণ দুনিয়াবি, দ্বীনের সাথে সম্পর্কহীন, এবং নাম দেখেই কটুক্তি হয় | ডিলিট করা বা অ্যাকাউন্টে ইসলামি নাম/ছবি না রাখা উত্তম |
৪. বাস্তব সমাধান (আমলি পরামর্শ)
-
নাম পরিবর্তন বা প্রোফাইল ছবি: যদি আপনার নাম দেখেই তারা ইসলামকে কটুক্তি করে, তাহলে প্রোফাইলে এমন নাম/ছবি ব্যবহার করুন যা থেকে দ্বীনি পরিচয় স্পষ্ট না হয়—তবে নিজের মুসলিম পরিচয় গোপন করা (তাকিয়া) সাধারণ অবস্থায় জায়েজ নয়, শুধু নিরাপত্তার প্রয়োজনে।
-
কমেন্ট ডিলিট: যদি দেখেন আপনার একটি কমেন্টের কারণে ১০টি কটুক্তি হচ্ছে, তবে সেই কমেন্ট ডিলিট করে দেওয়াই আক্ল ও নকল উভয় দৃষ্টিতে উত্তম। কারণ আপনার কমেন্টের দ্বীনি উপকার শূন্য, কিন্তু ক্ষতি অনেক।
-
রিপোর্ট ও ব্লক: প্লাটফর্মের রিপোর্ট ফিচার ব্যবহার করুন এবং কটুক্তিকারীদের ব্লক করুন।
-
দাওয়াতের কৌশল: যদি দ্বীনি দাওয়াত দিতে চান, তবে জ্ঞানী, ভদ্র ও প্রাজ্ঞ অমুসলিমদের সাথে আলাদাভাবে যোগাযোগ করুন—সবার সাথে তর্কে জড়াবেন না।
-
দুআ: আল্লাহর কাছে হেদায়েতের দুআ করুন। হাদিসে এসেছে, নবী ﷺ তায়েফে প্রস্তরাঘাতের সময় দুআ করেছিলেন—"হে আল্লাহ, এদের হেদায়েত দান করুন, কারণ এরা জানে না।" (সহিহ বুখারি: ৩২৩১-এর সমার্থক)
৫. সতর্কতা
- কমেন্ট ডিলিট করা মানে ইসলাম থেকে পলায়ন নয়—বরং এটি হিকমত ও প্রজ্ঞার পরিচায়ক।
- কমেন্ট রেখে তর্কে জড়ানো অনেক সময় ইসলামের জন্য ক্ষতিকর, কারণ অমুসলিমরা অপমান করার সুযোগ পায়।
- ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বাহিশতী জেওয়ার"-এ লিখেছেন: "অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও ঝগড়া থেকে বেঁচে থাকা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।" (বাহিশতী জেওয়ার, ১ম খণ্ড, আদব অধ্যায়)
চূড়ান্ত ফতোয়া
যদি আপনার কমেন্টের কারণে অমুসলিমরা ইসলামকে কটুক্তি করে, এবং আপনার কমেন্টে কোনো দ্বীনি উপকার না থাকে, তবে সেই কমেন্ট ডিলিট করে দেওয়া উত্তম—বরং অনেক ক্ষেত্রে কর্তব্য। আর যদি কমেন্ট দ্বীনি দাওয়াতের উদ্দেশ্যে হয় এবং কটুক্তির আশঙ্কা কম হয়, তবে রাখা যাবে, তবে ধৈর্য ও হিকমতের সাথে।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে হিকমত ও প্রজ্ঞার সাথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب