পূজার সময় তিলের নাড়ু, নারিকেলের নাড়ু বিক্রি করা কি জায়েয?

Business and Job · Hanafi

Question No: 6245
Questioner: TAWHID ADNAN
Question Asked: 02 Oct 2026, 02:48 PM
Reviewed & Published: 02 Oct 2026, 02:52 PM
Views: 9
Tokens: 4,990
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ।

আমাদের অনলাইনে বিজনেস আছে। সেখানে আমরা তিলের নাড়ু, নারিকেলের নাড়ু সেল দিয়ে থাকি। একটা কথা মাথায় আসছে এখন তো পূজার সিজন চলছে। এই সময় এইগুলো একটু বেশিই ডিমান্ড থাকে। আবার এই চিন্তাও আসছে যে এই সময় তো সেল ওও বেশি হবে।

এই টাইমে সেল করা কি ঠিক হবে কি না বলতে চাচ্ছিলাম এজটু শীত পরলে একটু ভালো ভাবে আ্যড রান করে প্রচার করব এখন এই সময় এটাকে এগিয়ে নিয়ে আসতে চাচ্ছি এমনি তো সেল দিলে সমস্যা নেই তবে সেল বৃদ্ধির আশায় এমন টাইমে করা কতটা যোক্তিক ও নয় ওরা তো শিরক করে

Answer

পূজার সময় নাড়ু-লাড্ডু বিক্রি করার হুকুম

উত্তর (সংক্ষেপে): পূজার সময় বা পূজার সিজনে তিলের নাড়ু, নারিকেলের নাড়ু বিক্রি করা জায়েয। এটি নিজে শিরক নয়, এবং ক্রেতার শিরকের কারণে বিক্রেতা গুনাহগার হবে না। তবে হ্যাঁ, যদি আপনি সরাসরি পূজার উপকরণ (প্রতিমা, মোমবাতি, ধূপ, আগরবাতি, পূজার থালি ইত্যাদি) বা শিরকী অনুষ্ঠানের সরঞ্জাম বিক্রি করেন, তাহলে তা নাজায়েয হবে। খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।


বিস্তারিত আলোচনা

১. মূলনীতি: শিরকের কারণে সাধারণ হালাল জিনিসের ব্যবসা হারাম হয় না

ইসলামী ফিকহের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো—বিক্রয়বস্তু নিজে যদি হারাম না হয় এবং তা শিরকী কাজে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট (শর্তযুক্ত) না হয়, তাহলে ক্রেতার উদ্দেশ্যের কারণে বিক্রি হারাম হয় না।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "আর তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" — (সূরা মায়িদা: ২)

এই আয়াতের ভিত্তিতে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, যে জিনিস নিজে হালাল এবং যা হালাল ও হারাম উভয় কাজে ব্যবহার হতে পারে, তা বিক্রি করা জায়েয। কারণ ক্রেতা তা কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে, তা বিক্রেতার দায় নয়।

২. হানাফি ফিকহের দলিল

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) উল্লেখ করেন:

"যে বস্তু হালাল ও হারাম উভয় কাজে ব্যবহার করা যায়, তা বিক্রি করা মাকরূহ নয়; বরং জায়েয। কেননা নিষেধাজ্ঞা নির্দিষ্ট হয় তখনই, যখন বস্তুটি হারাম কাজের জন্যই নির্দিষ্ট হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল বাইয়ু)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তেও এসেছে:

"হারাম কাজে ব্যবহৃত হয় এমন জিনিস যদি কেবল সেই কাজেই ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট না হয়, তবে তার ব্যবসা জায়েয।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)

৩. নাড়ু-লাড্ডু বিক্রির ক্ষেত্রে প্রয়োগ

তিলের নাড়ু, নারিকেলের নাড়ু—এগুলো মূলত হালাল খাদ্যদ্রব্য। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ—সবাই খেতে পারে। পূজার সময় হিন্দুরা এগুলো কিনে খায় বা মিষ্টি হিসেবে ব্যবহার করে। এতে শিরকের সাথে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।

এটি ঠিক তেমনই, যেমন একজন অমুসলিমকে হালাল খাবার বিক্রি করা—যদিও সে অমুসলিম, তবু তার কাছে খাবার বিক্রি জায়েয। বরং কখনো কখনো তা দাওয়াতের মাধ্যমও হতে পারে।

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) তার ফাতাওয়া উসমানি-তে বলেন:

"যে দ্রব্য নিজে পবিত্র ও হালাল, এবং তা শিরকী কাজের জন্য নির্দিষ্ট নয়, তা অমুসলিমের কাছে বিক্রি করা জায়েয।" — (ফাতাওয়া উসমানি, ৩/৪০৫)

৪. তবে যা নাজায়েয হবে

নিম্নলিখিত জিনিস বিক্রি করা বা সরবরাহ করা নাজায়েয:

  • প্রতিমা, মূর্তি, পূজার ছবি
  • পূজার সরঞ্জাম (থালি, ঘণ্টা, ধূপ, আগরবাতি, মোমবাতি, সিঁদুর ইত্যাদি)
  • শিরকী অনুষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো খাদ্য বা উপকরণ (যেমন: বলি দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পশু, যদি তা শিরকের নামে উৎসর্গের শর্ত থাকে)
  • পূজার জন্য বিশেষ প্যাকেজ বা কম্বো যা সরাসরি পূজার সাথে সম্পর্কিত

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:

"শিরকের সরঞ্জাম বা প্রতিমা বিক্রি করা জায়েয নেই; কারণ তা সরাসরি শিরকে সহায়তা। কিন্তু সাধারণ খাদ্যদ্রব্য, যা সবাই খায়, তা বিক্রি করা জায়েয।" — (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৩/২৯)

৫. সেল বৃদ্ধির আশায় প্রচার করা

প্রশ্নে এসেছে—"সেল বৃদ্ধির আশায় এমন টাইমে করা কতটা যুক্তিক?"

এখানে দুটি দিক:

ক) ব্যবসায়িক দিক: পূজার সময় চাহিদা বাড়ে—এটি একটি স্বাভাবিক বাজার চাহিদা। আপনি যদি সাধারণভাবে নাড়ু-লাড্ডুর বিজ্ঞাপন দেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। আপনি শিরকের প্রচার করছেন না, বরং নিজের হালাল পণ্যের প্রচার করছেন।

খ) নিয়তের দিক: আপনার নিয়ত যদি হয় "শিরকীদের শিরকে সহায়তা করা" বা "পূজার জন্য সরবরাহ করা"—তাহলে তা নাজায়েয। কিন্তু আপনার নিয়ত যদি হয় "ব্যবসা করা, হালাল রুজি অর্জন করা"—তাহলে তা জায়েয।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ সূরা মায়িদার ২ নম্বর আয়াতের তাফসিরে বলেন:

"পাপের কাজে সহযোগিতা নিষিদ্ধ। কিন্তু যদি কোনো হালাল জিনিস এমন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়, যে তা হারাম কাজে ব্যবহার করতে পারে, তবে বিক্রেতা দায়ী নয়—কারণ সে হালাল জিনিসই বিক্রি করেছে।" — (মাআরিফুল কুরআন, ৩/২১)

৬. একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | তিল/নারিকেলের নাড়ু বিক্রি | জায়েয | | পূজার সময় সাধারণভাবে বিজ্ঞাপন | জায়েয | | প্রতিমা/পূজার সরঞ্জাম বিক্রি | নাজায়েয | | পূজার নামে বিশেষ প্যাকেজ তৈরি | নাজায়েয (নিয়তের উপর নির্ভরশীল) | | শিরকের প্রচারে অংশগ্রহণ | নাজায়েয |


উপসংহার

  1. তিলের নাড়ু, নারিকেলের নাড়ু বিক্রি করা জায়েয—এটি হালাল খাদ্যদ্রব্য, শিরকের সরঞ্জাম নয়।
  2. পূজার সিজনে বিক্রি বাড়ানো—এটি ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাভাবিক, এবং শরীয়তসম্মত।
  3. শর্ত: আপনার নিয়ত হবে হালাল ব্যবসা, শিরকের প্রচার নয়। বিজ্ঞাপনে পূজার সাথে সম্পৃক্ত কোনো শিরকী বিষয় প্রচার করবেন না।
  4. যা করবেন না: প্রতিমা, পূজার সরঞ্জাম, বা শিরকী অনুষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জিনিস বিক্রি বা প্রচার করা।
  5. পরামর্শ: আপনি চাইলে বিজ্ঞাপনে "শীতের মিষ্টি" বা "ঘরে তৈরি নাড়ু" ইত্যাদি সাধারণভাবে প্রচার করতে পারেন—পূজার সাথে সম্পৃক্ত না করে।

আল্লাহ তাআলা আপনার ব্যবসায় বরকত দান করুন এবং হালাল রুজির তাওফিক দিন। আমিন।


রেফারেন্স:

  • সূরা মায়িদা: ২
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী), কিতাবুল বাইয়ু
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), ৩/২৯
  • ফাতাওয়া উসমানি (তাকি উসমানি), ৩/৪০৫
  • মাআরিফুল কুরআন (মুহাম্মদ শফি), ৩/২১

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.