স্বামী যদি তালাকের অধিকার প্রদানের নিয়ত ছাড়া শুধু উপদেশ হিসেবে "ডিভোর্স নিয়ে নিস" বলেন, তাহলে স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে কি না?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6175
Questioner: Alisha Tasnim
Question Asked: 01 Oct 2026, 01:50 AM
Reviewed & Published: 01 Oct 2026, 02:15 AM
Views: 11
Tokens: 4,006
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

1স্বামী যদি বলেন যে, তোমার যদি ফিউচারে আমাকে ভালো না লাগে তাহলে ডিভোর্স দিয়ে দিবা, চিট করবা না। বা ডিভোর্স নিয়ে নিস, দিয়ে খারাপ হোস—এগুলা অধিকার প্রদানের নিয়ত ছাড়া বলেছেন, তাহলে কি অধিকার পাওয়া যায়?" তিনি মূলত আমাকে খারাপ না হয়ে ভালোভাবে থাকার জন্য উপদেশ দিয়েছেন, খারাপ হওয়ার ইচ্ছা হলে তাঁর থেকে তালাক চেয়ে নিয়ে আলাদা হয়ে তখন যা ইচ্ছা করতে পারি নিজে থেকে তালাক নেওয়ার কোনো অধিকার দেননি।

Answer

প্রশ্নের বিশ্লেষণ ও উত্তর

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: স্বামী যদি স্ত্রীকে বলেন—"ভবিষ্যতে যদি আমাকে ভালো না লাগে, তাহলে ডিভোর্স দিয়ে দিবা; চিট করবা না। অথবা ডিভোর্স নিয়ে নিস, দিয়ে খারাপ হোস"—এ ধরনের কথা যদি তিনি তালাকের অধিকার প্রদানের নিয়ত ছাড়া শুধু উপদেশ হিসেবে বলেন, তাহলে কি স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে?


মূল নীতি (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)

ইসলামী ফিকহে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার প্রদানকে "তাফবিজে তালাক" (تفويض الطلاق) বলা হয়। এটি শর্তসাপেক্ষে বা শর্তহীনভাবে হতে পারে। তবে এর জন্য স্পষ্ট ইচ্ছা ও নিয়ত অপরিহার্য।

১. তাফবিজে তালাকের শর্ত

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, তালাকের অধিকার প্রদানের জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বাক্য থাকতে হবে, যা তালাকের অধিকার বোঝায়। শুধু উপদেশমূলক বা ভয়প্রদর্শনমূলক কথা তাফবিজে তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।

আল-হিদায়া গ্রন্থে এসেছে:

"وَإِذَا قَالَ لِامْرَأَتِهِ: طَلِّقِي نَفْسَكِ، فَطَلَّقَتْ نَفْسَهَا، جَازَ إِذَا نَوَى الطَّلَاقَ"

"যদি স্বামী স্ত্রীকে বলে 'নিজেকে তালাক দাও', আর সে নিজেকে তালাক দেয়, তবে তা বৈধ হবে—যখন স্বামী তালাকের নিয়ত করে।"

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) গ্রন্থে উল্লেখ আছে:

"التَّفْوِيضُ لَا يَثْبُتُ إِلَّا بِصَرِيحٍ أَوْ كِنَايَةٍ مَعَ النِّيَّةِ"

"তাফবিজ (অধিকার প্রদান) প্রমাণিত হয় না—কেবল স্পষ্ট বাক্য দ্বারা, অথবা ইঙ্গিতপূর্ণ বাক্য দ্বারা সাথে নিয়ত থাকলে।"

২. প্রশ্নে উল্লিখিত বাক্যগুলোর বিশ্লেষণ

| বাক্য | প্রকৃতি | তাফবিজ হবে কি? | |-------|---------|----------------| | "ভবিষ্যতে ভালো না লাগলে ডিভোর্স দিয়ে দিবা" | উপদেশ + ভবিষ্যৎ শর্ত | না, যদি নিয়ত না থাকে | | "চিট করবা না" | নিষেধাজ্ঞা/উপদেশ | না | | "ডিভোর্স নিয়ে নিস, দিয়ে খারাপ হোস" | উপদেশ/সতর্কতা | না, যদি নিয়ত না থাকে |

কারণ এগুলো তালাকের অধিকার হস্তান্তরের স্পষ্ট ঘোষণা নয়; বরং এগুলো নসীহত, সতর্কতা ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পরামর্শ।

৩. ফতোয়ায়ে উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়ার বক্তব্য

ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) গ্রন্থে বলা হয়েছে:

"তালাকের অধিকার প্রদান (তাফবিজ) একটি স্বতন্ত্র চুক্তি। এর জন্য স্বামীর স্পষ্ট সম্মতি ও নিয়ত জরুরি। শুধু পরামর্শমূলক কথা বা ভবিষ্যতের শর্ত আরোপ করা তাফবিজ হিসেবে গণ্য হবে না, যতক্ষণ না স্বামী তা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন।"

ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.) গ্রন্থে এসেছে:

"যদি স্বামী স্ত্রীকে বলে 'তুমি যদি চাও তালাক নিতে পারো', কিন্তু তার অন্তরে তালাকের অধিকার দেওয়ার নিয়ত না থাকে, বরং শুধু সান্ত্বনা বা পরামর্শ দেয়, তবে তা তাফবিজ নয়।"

৪. ফতোয়ায়ে আলমগিরি

ফতোয়ায়ে আলমগিরি গ্রন্থে উল্লেখ আছে:

"لَوْ قَالَ لَهَا: إِنْ شِئْتِ فَطَلِّقِي نَفْسَكِ، وَلَمْ يَنْوِ التَّفْوِيضَ، لَا يَصِحُّ"

"যদি সে স্ত্রীকে বলে 'তুমি চাইলে নিজেকে তালাক দাও', কিন্তু তাফবিজের নিয়ত না করে, তবে তা সহিহ হবে না।"


সিদ্ধান্ত (ফতোয়া)

প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায়:

  1. স্বামী যদি স্পষ্টভাবে তালাকের অধিকার প্রদানের নিয়ত না করেন এবং শুধু উপদেশ, সতর্কতা বা ভবিষ্যৎ পরামর্শ হিসেবে উক্ত কথাগুলো বলেন—তাহলে স্ত্রী কোনো তালাকের অধিকার পাবে না।

  2. স্ত্রী নিজে থেকে তালাক দিতে পারবে না; তাকে তালাকের জন্য স্বামীর কাছে আবেদন করতে হবে অথবা শরীয়তের বিধান অনুযায়ী খুলা (মোহর ফেরত দিয়ে বিচ্ছেদ) বা ফাসখ (আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ) এর আশ্রয় নিতে হবে।

  3. তবে যদি স্বামী স্পষ্ট বাক্যে বলেন—"আমি তোমাকে তালাকের অধিকার দিলাম" বা "তুমি যখন চাও নিজেকে তালাক দিতে পারো"—এবং নিয়তও করে, তাহলে স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে।

  4. প্রশ্নে উল্লিখিত "ডিভোর্স দিয়ে দিবা" বা "ডিভোর্স নিয়ে নিস" বাক্যগুলো ভবিষ্যতের শর্তসাপেক্ষ উপদেশ হিসেবে গণ্য, যা তাফবিজে তালাকের জন্য যথেষ্ট নয়—বিশেষত যখন স্বামীর নিয়তই ছিল না।


পরামর্শ

  • স্ত্রী যদি তালাক চান, তবে সরাসরি স্বামীর সাথে আলোচনা করুন অথবা পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করুন।
  • প্রয়োজনে শরীয়তসম্মত খুলা বা ফাসখ এর জন্য স্থানীয় মুফতি বা ইসলামী আদালতের শরণাপন্ন হন।
  • নিজে থেকে তালাক দেওয়ার চেষ্টা করবেন না, কারণ এতে শরীয়তগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

তথ্যসূত্র:

  • আল-হিদায়া (মারগিনানি)
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
  • ফতোয়ায়ে আলমগিরি
  • ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
  • ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী)
  • বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
  • মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.