সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে সরকারি চাকুরি কি হালাল নাকি হারাম?

Business and Job · Hanafi

Question No: 6150
Questioner: Khan
Question Asked: 30 Sep 2026, 01:00 PM
Reviewed & Published: 30 Sep 2026, 03:59 PM
Views: 26
Tokens: 6,079
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম হুজুর দয়া করে উত্তর দিবেন প্লিজ।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরীক্ষা ১০ তারিখে। বাংলাদেশ সরকার বেকার যুবকদের উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে ঋণ প্রদান করে এবং সেই ঋণ সঠিক সময়ে আদায়ের জন্য সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়। কর্মকর্তাদের কাজ হলো কিস্তি আদায় করে তবে তা সার্ভিস চার্জের সাথে। সার্ভিস চার্জ হচ্ছে এজন্য যে, যুবকদের ঋণ প্রদানের পর মাঠ পর্যায়ে তদারকি করা, এবং তহবিল সচল রাখা। তাই ঋণ প্রদান এর পাশাপাশি পরিশোধের সময় ৫% সার্ভিস চার্জ দিতে হবে। যেমন কেউ যদি লাখ টাকার বেশি ঋণ নিয়ে থাকে তাহলে তাকে সার্ভিস চার্জ সহ পরিশোধ করতে হবে কিস্তির মাধ্যমে । সার্ভিস চার্জ হচ্ছে মাঠ তদারকি করা এবং তহবিল সচল রাখা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজসমূহের জন্য চার্জ।
এখন এই সরকারি চাকরির পদে কি চাকরি করা জায়েজ হবে ?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর: প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে (অর্থাৎ ঋণের সাথে অতিরিক্ত ৫% সার্ভিস চার্জ আদায় করা) যে ঋণদান ও আদায় কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে সুদভিত্তিক (রিবাভিত্তিক) ব্যবস্থা। কারণ মূল ঋণের উপর অতিরিক্ত যে কোনো চার্জ—তা যে নামেই হোক (সার্ভিস চার্জ, প্রসেসিং ফি, তদারকি খরচ ইত্যাদি)—যদি তা ঋণের শর্ত হিসেবে ধার্য করা হয় এবং মূলধনের অতিরিক্ত হিসেবে আদায় করা হয়, তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত। তাই এমন পদে চাকরি করা—যেখানে মূল দায়িত্বই হলো এই সুদভিত্তিক কিস্তি আদায় করা—জায়েজ নয়।

তবে বিস্তারিত জানার জন্য নিচে দলিলসহ ব্যাখ্যা পেশ করা হলো।


১. সুদের সংজ্ঞা ও মূলনীতি

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ "রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ খাওয়ালে, সুদ খাওয়াতে সাহায্যকারী, সুদের লেখক এবং তার দুই সাক্ষীকে অভিশাপ করেছেন এবং বলেছেন: তারা সবাই সমান (গুনাহগার)।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৩৩; সহীহ মুসলিমে অনুরূপ অর্থে বর্ণিত)

ফিকহি মূলনীতি:

كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا "প্রত্যেক এমন ঋণ, যা (ঋণদাতার জন্য) কোনো উপকার টেনে আনে, তা সুদ।" (এই মূলনীতিটি বহু হাদিস ও ফিকহি কিতাবে উদ্ধৃত; দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল বুয়ু', বাবু রিবা; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩)

অর্থাৎ, ঋণ দেওয়ার শর্তে মূলধনের অতিরিক্ত কোনো কিছু নেওয়া—তা যতই সামান্য হোক বা যে নামেই হোক—শরীয়তের দৃষ্টিতে সুদ। এখানে "সার্ভিস চার্জ" নামকরণ সুদের হুকুম পরিবর্তন করে না।


২. প্রশ্নের বিষয়বস্তুর উপর প্রয়োগ

প্রশ্নে বর্ণিত হয়েছে:

  • সরকার বেকার যুবকদের ঋণ প্রদান করে।
  • ঋণ পরিশোধের সময় ৫% সার্ভিস চার্জ সহ পরিশোধ করতে হয়।
  • সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার মূল কাজ হলো এই কিস্তি (সার্ভিস চার্জসহ) আদায় করা।

এখানে লক্ষণীয়:

  1. এটি একটি ঋণ (قرض) চুক্তি, ব্যবসা বা ইজারা নয়।
  2. মূলধনের অতিরিক্ত ৫% শর্তসাপেক্ষে ধার্য করা হয়েছে।
  3. এই অতিরিক্ত আদায়ই কর্মকর্তার মূল দায়িত্ব।

সুতরাং এটি সুদের একটি স্পষ্ট প্রয়োগ। "মাঠ তদারকি", "তহবিল সচল রাখা" ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে সুদকে হালাল করা যায় না। কারণ:

  • তদারকি খরচ ঋণগ্রহীতার উপর চাপানো শরীয়তসম্মত নয়; এটি ঋণদাতার নিজস্ব দায়িত্ব।
  • তহবিল সচল রাখা ঋণদাতার স্বার্থ; এর খরচ ঋণগ্রহীতার ঘাড়ে চাপানো সুদ।
  • ইসলামি ব্যাংকিং-এ "সার্ভিস চার্জ" শুধু প্রকৃত খরচের সমপরিমাণ (actual cost) নেওয়া যায়, নির্দিষ্ট শতাংশ হারে মুনাফা হিসেবে নয়। এখানে ৫% নির্দিষ্ট হার—এটি সুদ।

৩. এমন চাকরির হুকুম

যেহেতু এই পদে চাকরির মূল দায়িত্বই হলো সুদভিত্তিক লেনদেনের কিস্তি আদায় করা, তাই:

  • সরাসরি সুদ আদায়কারী হিসেবে কাজ করা জায়েজ নয়।
  • হাদিসে সুদ আদায়কারী, সুদ খাওয়ানো, সুদের লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে সমান গুনাহগার বলা হয়েছে।
  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, সুদি চুক্তি লেখা বা তার বাস্তবায়নে সহায়তা করাও নাজায়েজ।
  • রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

    "সুদি চুক্তি লেখা, সাক্ষী হওয়া বা তার আদায়ে সহায়তা করা—সবই গুনাহ, যদিও সে নিজে সুদ না খায়।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল বুয়ু', ফাসলুন ফির রিবা)

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত থানভী (রহ.) বলেন:

"সুদি লেনদেনে কোনোভাবে সহযোগিতা করা জায়েজ নয়; চাই তা লেখার মাধ্যমে হোক, সাক্ষী হওয়ার মাধ্যমে হোক বা আদায়ের মাধ্যমে হোক।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ৩৪২)

ফাতাওয়া উসমানী-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:

"কোনো প্রতিষ্ঠানের চাকরি তখনই জায়েজ হবে যখন তার মূল কার্যক্রম হালাল হবে। যদি প্রতিষ্ঠানের মূল আয়ই সুদভিত্তিক হয় বা চাকরির মূল দায়িত্ব সুদ আদায় করা হয়, তবে তা জায়েজ নয়।" (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৪০০-এর কাছাকাছি)


৪. সম্ভাব্য দ্বিধার সমাধান

প্রশ্ন: যদি কেউ বলে, "আমি তো শুধু চাকরি করছি, সুদ তো সরকার নিচ্ছে"?

উত্তর: হাদিসে সুদ আদায়কারীকে সুদ খাওয়ালের সমান বলা হয়েছে। যে ব্যক্তির মূল দায়িত্বই সুদ আদায় করা, সে সরাসরি সুদি ব্যবস্থার অংশ। এছাড়া তার মাসিক বেতনও সুদি আয় থেকে আসে, যা আরও একটি সমস্যা।

প্রশ্ন: যদি চাকরির অন্য দায়িত্বও থাকে (যেমন তদারকি)?

উত্তর: যদি চাকরির মূল ও প্রধান দায়িত্ব সুদ আদায় হয় এবং তদারকি গৌণ হয়, তবে তা জায়েজ নয়। আর যদি এমন হয় যে সুদ আদায় ছাড়া অন্য হালাল কাজই প্রধান এবং সুদ আদায় একেবারে গৌণ/বিরল, তবে কঠিন। তবে প্রশ্নে বর্ণিত বর্ণনায় স্পষ্ট যে কিস্তি আদায়ই মূল কাজ।


৫. করণীয়

  1. এই পদে আবেদন না করা—যদি জানা থাকে যে মূল দায়িত্ব সুদি কিস্তি আদায়।
  2. বিকল্প খোঁজা—হালাল আয়ের সরকারি বা বেসরকারি চাকরি।
  3. দুআ করা—আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে হালাল রুজির জন্য দুআ করা।
  4. যদি ইতিমধ্যে চাকরিতে থাকেন—তবে তাওবা করে হালাল বিকল্প খোঁজা, এবং সম্ভব হলে এমন বিভাগে বদলি নেওয়া যেখানে সুদি লেনদেন নেই।
  5. সুদি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সচেতনতা—সমাজে ইসলামি ব্যাংকিং বা সুদমুক্ত ঋণের প্রচলন বাড়ানোর চেষ্টা করা।

৬. সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |---|---| | মূল ঋণের উপর ৫% সার্ভিস চার্জ | সুদ (হারাম) | | সুদি কিস্তি আদায়ের চাকরি | জায়েজ নয় | | সুদ আদায়ে সহায়তা | হাদিসে অভিশপ্ত | | বেতন | সুদি আয় থেকে, তাই সন্দেহজনক |

চূড়ান্ত ফতোয়া: প্রশ্নে বর্ণিত পদে চাকরি করা জায়েজ নয়, যতক্ষণ না ব্যবস্থাটি সুদমুক্ত হয় বা চাকরির দায়িত্ব সুদ আদায় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়।


আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুদ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন এবং হালাল রুজির ব্যবস্থা করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.