সকাল সন্ধ্যা সুরা হাশরের তিন আয়াত
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
সকাল-সন্ধ্যা সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠের ফযীলত: হাদীসের আলোকে পর্যালোচনা
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—সকাল-সন্ধ্যা সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত (অর্থাৎ ২২, ২৩, ২৪ নং আয়াত) পাঠ করলে কি ৭০ হাজার ফেরেশতা সেই ব্যক্তির জন্য দুআ করেন? এটা কি সহীহ? এরকম কোনো হাদীস আছে কি?
উত্তর
সংক্ষিপ্ত উত্তর
সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত সকাল-সন্ধ্যা পাঠের ফযীলত সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসটি দুর্বল (য'ঈফ), এমনকি কিছু মুহাদ্দিসের মতে অত্যন্ত দুর্বল বা বাতিলের কাছাকাছি। তবে ফযীলতের ক্ষেত্রে য'ঈফ হাদীস আমলযোগ্য হওয়ার নীতি অনুযায়ী অনেক আলিম এটি আমলযোগ্য বলেছেন। কিন্তু "৭০ হাজার ফেরেশতা দুআ করে" —এই নির্দিষ্ট সংখ্যা ও বিষয়টি হাদীসে সহীহভাবে প্রমাণিত নয়; বরং এ বিষয়ে বর্ণিত হাদীসটি সনদের দিক থেকে দুর্বল।
তবে সূরা হাশরের শেষ আয়াতগুলোর ফযীলত সম্পর্কে সহীহ হাদীসও রয়েছে, যা নিম্নে উল্লেখ করা হবে।
বিস্তারিত আলোচনা
১. যে হাদীসে ৭০ হাজার ফেরেশতার কথা এসেছে
হযরত মা'কিল ইবনে ইয়াসার (রাযি.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে:
مَنْ قَالَ حِينَ يُصْبِحُ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ: أَعُوذُ بِاللَّهِ السَّمِيعِ الْعَلِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ، ثُمَّ قَرَأَ الثَّلَاثَ آيَاتٍ مِنْ آخِرِ سُورَةِ الْحَشْرِ، وَكَّلَ اللَّهُ بِهِ سَبْعِينَ أَلْفَ مَلَكٍ يُصَلُّونَ عَلَيْهِ حَتَّى يُمْسِيَ، وَإِنْ مَاتَ فِي ذَلِكَ الْيَوْمِ مَاتَ شَهِيدًا، وَمَنْ قَالَهَا حِينَ يُمْسِي كَانَ بِتِلْكَ الْمَنْزِلَةِ
অনুবাদ: "যে ব্যক্তি সকালে তিনবার বলবে—'আউযু বিল্লাহিস সামী'ইল আলীমি মিনাশ শাইতানির রাজীম', অতঃপর সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করবে, আল্লাহ তার জন্য সত্তর হাজার ফেরেশতা নিযুক্ত করবেন, যারা সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য দুআ (সালাত) করতে থাকবে। আর যদি সে ঐ দিন মারা যায়, তবে শহীদ হিসেবে মারা যাবে। আর যে সন্ধ্যায় তা বলবে, তার জন্যও অনুরূপ মর্যাদা হবে।"
তাখরীজ (হাদীসের সনদ পর্যালোচনা):
এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন:
- ইমাম তিরমিযী (রহ.) — তার সুনানে (হাদীস নং ২৯২২)
- ইমাম আবু দাউদ (রহ.) — তবে তিনি এটি বর্ণনা করেননি মুসনাদ হিসেবে; বরং ইমাম তিরমিযী ও অন্যরা বর্ণনা করেছেন
- ইমাম বাইহাকী (রহ.) — শুআবুল ঈমান-এ
- ইমাম তাবরানী (রহ.) — মু'জামুল কাবীর-এ
- ইমাম ইবনে সুননী (রহ.) — আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ-এ
সনদের সমালোচনা:
১. ইমাম তিরমিযী (রহ.) এই হাদীস বর্ণনার পর বলেন:
هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ، لَا نَعْرِفُهُ إِلَّا مِنْ هَذَا الْوَجْهِ
"এটি একটি গরীব (দুর্বল) হাদীস; আমরা এটি এই সনদ ছাড়া জানি না।"
২. হাফিয ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, এই হাদীসের সনদে খালিদ ইবনে তাহমান নামক রাবী রয়েছেন, যিনি দুর্বল। (তাহযীবুত তাহযীব)
৩. ইমাম নাসাঈ (রহ.) খালিদ ইবনে তাহমান সম্পর্কে বলেন: "তিনি নির্ভরযোগ্য নন।" (লিসানুল মীযান)
৪. হাফিয ইবনে কাসীর (রহ.) এই হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর)
৫. শাইখ আলবানী (রহ.) এই হাদীসকে "য'ঈফ" (দুর্বল) বলেছেন। (সিলসিলা য'ঈফা, হাদীস নং ৫৭৮২; য'ঈফুল জামি', হাদীস নং ৫৭৩০)
৬. ইমাম বাইহাকী (রহ.) বলেছেন, এই হাদীসের সনদে দুর্বলতা রয়েছে। (শুআবুল ঈমান)
উপসংহার: ৭০ হাজার ফেরেশতার নির্দিষ্ট সংখ্যা ও বিষয়টি এই দুর্বল হাদীসেই বর্ণিত। তবে ফযীলতের ক্ষেত্রে য'ঈফ হাদীস গ্রহণযোগ্য—এই নীতির ভিত্তিতে অনেক হানাফী আলিম এটি আমলযোগ্য বলেছেন।
২. সূরা হাশরের শেষ আয়াতের ফযীলত সম্পর্কে সহীহ হাদীস
সূরা হাশরের শেষ আয়াত (২৪ নং আয়াত) সম্পর্কে সহীহ হাদীস বর্ণিত আছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ قَرَأَ آخِرَ ثَلَاثِ آيَاتٍ مِنْ سُورَةِ الْحَشْرِ حِينَ يُصْبِحُ وَحِينَ يُمْسِي، غَفَرَ اللَّهُ لَهُ
অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করবে, আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।"
তাখরীজ: এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিরমিযী (রহ.) তার সুনানে (হাদীস নং ২৯২৩)। তবে এই সনদও দুর্বল। ইমাম তিরমিযী নিজেই বলেন: "এটি গরীব হাদীস।"
৩. হানাফী মাযহাবের আলিমদের অভিমত
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ ফযীলতের ক্ষেত্রে য'ঈফ হাদীস আমল করার নীতির আলোচনায় বলেন:
وَالْحَاصِلُ أَنَّ الْحَدِيثَ الضَّعِيفَ يُعْمَلُ بِهِ فِي فَضَائِلِ الْأَعْمَالِ بِشُرُوطٍ
"সারকথা হলো, ফযীলতের ক্ষেত্রে য'ঈফ হাদীস কিছু শর্তসাপেক্ষে আমলযোগ্য।" (রাদ্দুল মুহতার, ১ম খণ্ড)
শর্তগুলো: ১. হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল না হওয়া ২. এটি ইসলামের কোনো প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির বিরোধী না হওয়া ৩. আমল করার সময় এটি সহীহ হিসেবে বিশ্বাস না করা
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানী"-তে উল্লেখ করেন যে, ফযীলতের ক্ষেত্রে য'ঈফ হাদীস আমলযোগ্য, তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা বা বিশেষ প্রতিশ্রুতি (যেমন ৭০ হাজার ফেরেশতা) সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী যেওর"-এ সকাল-সন্ধ্যার আমলসমূহের মধ্যে সূরা হাশরের শেষ আয়াত পাঠের কথা উল্লেখ করেছেন, তবে নির্দিষ্ট সংখ্যার বিষয়ে বিশেষ জোর দেননি।
৪. সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াতের অর্থ ও তাৎপর্য
আয়াত ২২:
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ ۖ هُوَ الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ
"তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের জ্ঞানী। তিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু।"
আয়াত ২৩:
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ ۚ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ
"তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি বাদশাহ, পবিত্র, শান্তিদাতা, নিরাপত্তাদাতা, রক্ষক, পরাক্রমশালী, মহাপ্রতাপশালী, মহিমান্বিত। তারা যাকে শরীক করে, আল্লাহ তা থেকে পবিত্র।"
আয়াত ২৪:
هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ ۖ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ ۚ يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"তিনিই আল্লাহ, সৃষ্টিকর্তা, উদ্ভাবক, আকৃতি দানকারী। তাঁরই জন্য উত্তম নামসমূহ। আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।"
এই আয়াতগুলোতে আল্লাহর তাওহীদ, তাঁর অসীম গুণাবলী ও সৃষ্টিশীলতার বর্ণনা রয়েছে। এগুলো পাঠ করা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বরকতময় ও ফযীলতপূর্ণ।
৫. সঠিক আমল কী হবে?
১. সকাল-সন্ধ্যা সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করা —এটি ফযীলতপূর্ণ আমল। য'ঈফ হাদীসে বর্ণিত ফযীলতের ভিত্তিতে এটি আমল করা যেতে পারে, তবে "৭০ হাজার ফেরেশতা" —এই নির্দিষ্ট সংখ্যাকে সহীহ হাদীস হিসেবে বিশ্বাস করা উচিত নয়।
২. আগে 'আউযু বিল্লাহিস সামী'ইল আলীমি মিনাশ শাইতানির রাজীম' তিনবার পড়া —এটিও ঐ দুর্বল হাদীসে বর্ণিত। তবে সাধারণভাবে আউযু পড়া সুন্নত।
৩. সহীহ হাদীসে বর্ণিত আমলসমূহ বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যেমন:
- সকাল-সন্ধ্যা আয়াতুল কুরসী পাঠ
- সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস তিনবার পাঠ
- "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি" ১০০ বার
- সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন দুআসমূহ
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
| বিষয় | অবস্থা | |------|--------| | সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত সকাল-সন্ধ্যা পাঠের ফযীলত | য'ঈফ হাদীসে বর্ণিত; ফযীলতের ক্ষেত্রে আমলযোগ্য | | ৭০ হাজার ফেরেশতা দুআ করার নির্দিষ্ট বিষয় | দুর্বল হাদীসে বর্ণিত; সহীহভাবে প্রমাণিত নয় | | শহীদ হিসেবে মৃত্যু | ঐ দুর্বল হাদীসেই বর্ণিত | | গুনাহ ক্ষমার বিষয় | অপর একটি দুর্বল হাদীসে বর্ণিত | | আয়াতগুলোর মর্যাদা ও বরকত | নিঃসন্দেহে ফযীলতপূর্ণ; আল্লাহর তাওহীদের বর্ণনা |
পরামর্শ: সকাল-সন্ধ্যা সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করা যেতে পারে ফযীলতের আশায়, তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা (৭০ হাজার ফেরেশতা) বা বিশেষ প্রতিশ্রুতিকে (শহীদ হওয়া) সহীহ হাদীসের মতো নিশ্চিত বিশ্বাস করা উচিত নয়। বরং সহীহ হাদীসে বর্ণিত আমলসমূহকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
আরবি সারসংক্ষেপ
الْحَدِيثُ الْوَارِدُ فِي فَضْلِ قِرَاءَةِ آخِرِ ثَلَاثِ آيَاتٍ مِنْ سُورَةِ الْحَشْرِ صَبَاحًا وَمَسَاءً، وَفِيهِ ذِكْرُ سَبْعِينَ أَلْفَ مَلَكٍ، حَدِيثٌ ضَعِيفٌ عِنْدَ جُمْهُورِ الْمُحَدِّثِينَ، بَلْ قَالَ بَعْضُهُمْ إِنَّهُ شَدِيدُ الضَّعْفِ. وَالْعَمَلُ بِالْحَدِيثِ الضَّعِيفِ فِي فَضَائِلِ الْأَعْمَالِ جَائِزٌ عِنْدَ الْحَنَفِيَّةِ بِشُرُوطٍ، مِنْهَا أَنْ لَا يُعْتَقَدَ صِحَّتُهُ. وَأَمَّا تَعْيِينُ عَدَدِ الْمَلَائِكَةِ بِسَبْعِينَ أَلْفًا فَلَا يَثْبُتُ ثُبُوتًا صَحِيحًا. وَالْأَوْلَى الِاقْتِصَارُ عَلَى الْأَحَادِيثِ الصَّحِيحَةِ فِي الْأَذْكَارِ الصَّبَاحِيَّةِ وَالْمَسَائِيَّةِ.