মাসনুন দুআ আরবিতে পড়ার বিশেষত্ব কী? বাংলায় দুআ করলে কি কবুল হবে?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
আমর্ কেন আরবিতে মাসনুন দুয়াগুলো পড়বো, এর বিশেষত্ব কি? বাংলায় বললে কি হবে? আসলেই কি বলোতো আমি যদি বের হওয়ার সময় বাংলায় বলি, আমি আল্লাহর উপরে ভরসা করে বের হলাম, তাহলে কি হবেনা? মানে আমি যদি আরবি না বলি তাহলে?
Answer
জবাব
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর
মাসনুন দুআগুলো আরবিতে পড়াই সুন্নত ও সর্বোত্তম। তবে আরবি জানা না থাকলে বা অর্থ না বুঝলে বাংলায় দুআ করা জায়েয, এবং তা কবুল হওয়ার আশা রাখা যায়। কিন্তু মাসনুন দুআর যে বিশেষ ছওয়াব, বরকত ও ফজিলত রয়েছে, তা হুবহু আরবি পড়ার মধ্যেই নিহিত। তাই আরবি শেখা ও মুখস্থ করা কর্তব্য।
বিস্তারিত আলোচনা
১. মাসনুন দুআ আরবিতে পড়ার বিশেষত্ব
ক) এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সরাসরি শিক্ষা ও অনুসরণ
রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে এই দুআগুলো এই আরবি শব্দেই পড়েছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে শিখিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ "নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।" (সূরা আহযাব: ২১)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا "রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।" (সূরা হাশর: ৭)
খ) দুআর শব্দ ও ভাষা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হওয়ার হিকমত
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, মাসনুন দুআর শব্দগুলো এমনভাবে সংকলিত হয়েছে যাতে আল্লাহর প্রশংসা, তাওহিদ, তাসবিহ ও ইস্তিগফার সবই একসাথে বিদ্যমান থাকে। নিজের ভাষায় দুআ করলে এই পূর্ণাঙ্গতা অর্জিত হয় না। (রাদ্দুল মুহতার, ২/২৬৫)
গ) আরবি দুআতে রয়েছে জামে' (সমন্বিত) ও মানি' (নিষ্কৃতি) বৈশিষ্ট্য
হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন:
أَمَّا بَعْدُ، فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ، وَخَيْرَ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ "নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম পথনির্দেশ মুহাম্মদ ﷺ-এর পথনির্দেশ।" (সহিহ মুসলিম: ৮৬৭)
ঘ) ফজিলত ও ছওয়াবের পার্থক্য
মাসনুন দুআ হুবহু আরবিতে পড়লে প্রতিটি হরফের বিনিময়ে নেকি লেখা হয়। রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ "যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পড়ে, তার জন্য একটি নেকি রয়েছে।" (তিরমিজি: ২৯১০)
মাসনুন দুআও ওহির অন্তর্ভুক্ত—এগুলো রাসূল ﷺ-এর কাছে জিব্রাইল (আ.) নিয়ে এসেছেন। তাই এগুলো পড়ার ছওয়াবও কুরআন তিলাওয়াতের ন্যায়।
২. বাংলায় দুআ করা কি জায়েয?
হ্যাঁ, জায়েয। তবে কয়েকটি শর্ত ও সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে:
ক) নিজের ভাষায় দুআ করা জায়েয
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ "তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন: আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।" (সূরা গাফির: ৬০)
এই আয়াতে কোনো নির্দিষ্ট ভাষার শর্ত নেই। যে কোনো ভাষায় আল্লাহকে ডাকা যায়।
খ) ফরয নামাজের বাইরে নিজের ভাষায় দুআ করা সর্বসম্মতভাবে জায়েয
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:
"নামাজের বাইরে নিজের ভাষায় দুআ করা জায়েয, বরং তা উত্তম, কারণ তাতে বান্দার হৃদয়ের আকুতি ও বিনয় প্রকাশ পায়।" (২/২৬৫)
গ) মাসনুন দুআর ক্ষেত্রে আরবি না জানলে কী করবে?
ইমাম আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি (রহ.) বলেন:
"মাসনুন দুআর আরবি শব্দগুলো মুখস্থ করা সম্ভব না হলে, অন্তত অর্থ বুঝে পড়া উচিত। আর যদি তা-ও সম্ভব না হয়, তবে নিজের ভাষায় দুআ করা যাবে, কিন্তু মাসনুন দুআর ছওয়াব ও ফজিলত হুবহু পাওয়া যাবে না।" (ফয়যুল বারী, ২/৩৮৯)
৩. আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্ন: বের হওয়ার সময় বাংলায় বললে কী হবে?
প্রশ্ন: "আমি আল্লাহর উপরে ভরসা করে বের হলাম" — এভাবে বাংলায় বললে কি হবে না?
উত্তর:
ক) মাসনুন দুআটি হলো:
بِسْمِ اللَّهِ، تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ "আল্লাহর নামে, আমি আল্লাহর উপর ভরসা করলাম, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই।"
(তিরমিজি: ৩৪২৬, আবু দাউদ: ৫০৯৫)
খ) বাংলায় বললে দুআ কবুল হবে কি?
হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ কবুল হবে। কারণ:
- দুআর মূল হলো আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ও ভরসা।
- আপনি আল্লাহর উপর ভরসা করছেন—এটি তাওয়াক্কুলের মূল কথা।
- আল্লাহ ভাষা দেখেন না, দেখেন অন্তরের অবস্থা।
আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে দেখেন না, বরং তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে দেখেন।" (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)
গ) তবে বিশেষত্ব ও ফজিলতের পার্থক্য:
| বিষয় | আরবিতে মাসনুন দুআ | বাংলায় দুআ | |------|-------------------|-------------| | সুন্নতের অনুসরণ | পূর্ণ | আংশিক | | ছওয়াব | সর্বোচ্চ | কম | | হাদিসে বর্ণিত ফজিলত | প্রাপ্ত | প্রাপ্ত নয় | | দুআ কবুল | ইনশাআল্লাহ | ইনশাআল্লাহ | | শয়তানের প্রভাব থেকে হেফাজত | বিশেষ হেফাজত | সাধারণ হেফাজত |
ঘ) মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর ফতোয়া:
"মাসনুন দুআর আরবি শব্দগুলো মুখস্থ করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। যদি কেউ আরবি না জানে, তবে সে নিজের ভাষায় দুআ করবে, কিন্তু মাসনুন দুআর ফজিলত ও বরকত হুবহু পাবে না।" (ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩৮৯)
৪. সমাধান ও করণীয়
১. আরবি শেখা: মাসনুন দুআগুলো আরবিতে মুখস্থ করুন। প্রতিদিন একটি করে শিখলে অল্প দিনেই সব মুখস্থ হয়ে যাবে।
২. অর্থ জানা: আরবি না জানলেও অর্থ বাংলায় পড়ে নিন, যাতে দুআর মর্ম হৃদয়ে গেঁথে যায়।
৩. উভয়ের সমন্বয়: আরবিতে মাসনুন দুআ পড়ুন, তারপর বাংলায় নিজের ভাষায় মন খুলে দুআ করুন। এটাই সর্বোত্তম পদ্ধতি।
৪. বাংলায় পড়লে: যদি আরবি না জানেন, তবে বাংলায় দুআ করুন—আল্লাহ কবুল করবেন, ইনশাআল্লাহ। তবে চেষ্টা করুন আরবি শেখার।
৫. বিশেষভাবে বের হওয়ার সময়:
- সম্ভব হলে আরবিতে বলুন: بِسْمِ اللَّهِ، تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
- না পারলে বাংলায় বলুন: "আল্লাহর নামে, আমি আল্লাহর উপর ভরসা করলাম, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই।"
- এরপর নিজের ভাষায়ও দুআ করতে পারেন।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | আরবিতে মাসনুন দুআ কেন? | এটি সুন্নত, সর্বোচ্চ ছওয়াব ও ফজিলতের অধিকারী | | বাংলায় বললে কি হবে? | জায়েয, দুআ কবুল হবে ইনশাআল্লাহ, তবে মাসনুনের পূর্ণ ফজিলত পাবে না | | আরবি না বললে? | দুআ কবুল হবে, কিন্তু সুন্নতের অনুসরণ ও বিশেষ বরকত থেকে বঞ্চিত হবে | | করণীয় | আরবি শেখা কর্তব্য; না পারলে বাংলায় দুআ করুন, তবে চেষ্টা চালিয়ে যান |
মূল কথা: আল্লাহ ভাষা দেখেন না, অন্তর দেখেন। তবে রাসূল ﷺ-এর শেখানো শব্দে দুআ করা সর্বোত্তম, কারণ তাতে সুন্নতের অনুসরণ, বিশেষ ছওয়াব ও শয়তান থেকে হেফাজত রয়েছে।
والله أعلم بالصواب