স্বামী প্রবাসী, স্ত্রীর সাথে নোংরা মশকরা করতে চায় — ইসলামে এতে কার গুনাহ?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: স্বামী প্রবাসী, মুখে স্ত্রী হিসেবে নোংরা মশকরা করতে চায় — এতে কার গুনাহ হবে? রিজিকের বরকত নষ্ট হবে কি?
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী):
সংক্ষিপ্ত উত্তর
১. নোংরা/অশ্লীল কথা বলা বা মশকরা করা — এটি ইসলামে নিষিদ্ধ (হারাম বা অন্তত মাকরুহে তাহরিমি)। এতে স্বামীর গুনাহ হবে, স্ত্রীর নয় — যদি স্ত্রী নিজে সেই নোংরা কথায় অংশ না নেয়।
২. স্ত্রী এড়িয়ে চললে বা মন খারাপ করলে তার কোনো গুনাহ নেই — বরং সে সওয়াব পাবে, কারণ সে গুনাহের কাজে সহযোগিতা করেনি।
৩. রিজিকের বরকত নষ্ট হওয়ার বিষয়টি — গুনাহ ও অবাধ্যতা রিজিকের বরকত নষ্ট করে; তবে সরাসরি "নোংরা মশকরার কারণে রিজিক বন্ধ হয়ে যাবে" — এমন সুনির্দিষ্ট দলিল নেই, বরং সাধারণভাবে গুনাহ বরকত নষ্ট করে।
বিস্তারিত দলিলসহ আলোচনা
১. নোংরা কথা ও অশ্লীল মশকরা ইসলামে নিষিদ্ধ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقُل لِّعِبَادِى يَقُولُوا الَّتِى هِىَ أَحْسَنُ ۚ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنزَغُ بَيْنَهُمْ "আর আমার বান্দাদের বলুন, তারা যেন উত্তম কথা বলে। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ৫৩)
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا "আর মানুষের সাথে উত্তম কথা বলো।" — (সূরা বাকারা: ৮৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের উপর ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে।" — (সহীহ বুখারী: ৬০১৮, সহীহ মুসলিম: ৪৭)
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلَا اللَّعَّانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ "মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীলতাকারী ও কটুভাষী হয় না।" — (সুনানে তিরমিজি: ১৯৭৭)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন, অশ্লীল ও নোংরা কথা মুমিনের শান নয়; এটি মুনাফিকি ও বেহায়াপনার লক্ষণ। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৪০০-এর কাছাকাছি)
২. স্ত্রীর গুনাহ হবে কি?
না, স্ত্রীর গুনাহ হবে না। কারণ:
- গুনাহের কাজে সহযোগিতা না করা বা এড়িয়ে চলা — এটি দ্বীনদারির পরিচায়ক।
- আল্লাহ বলেন: وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ — "পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
- স্ত্রী যদি নোংরা কথায় সাড়া না দেয়, বরং এড়িয়ে চলে — সে আমির বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার-এর অন্তর্ভুক্ত সওয়াব পাবে।
তবে সতর্কতা: স্ত্রী যদি অশ্লীল ভাষায় জবাব দেয় বা নোংরা মশকরায় অংশ নেয়, তাহলে সে-ও গুনাহগার হবে। এড়িয়ে চলা বা ভদ্রভাবে বোঝানোই কর্তব্য।
৩. স্বামীর গুনাহ হবে কি?
হ্যাঁ, স্বামীর গুনাহ হবে। কারণ:
- অশ্লীল কথা বলা ও নোংরা মশকরা করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
- স্ত্রীর সাথে সম্মানজনক ও ভদ্র আচরণ করা স্বামীর দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন: وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ — "তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯)
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ — "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে উল্লেখ করেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশ্লীলতা ও নোংরামি ইসলামি শিষ্টাচারবিরোধী; এটি পরিহার করা কর্তব্য। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩০-এর কাছাকাছি)
৪. রিজিকের বরকত নষ্ট হবে কি?
সাধারণ নীতি: গুনাহ ও অবাধ্যতা রিজিকের বরকত নষ্ট করে। আল্লাহ বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا ۞ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না।" — (সূরা তালাক: ২-৩)
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ "যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের উপর আসমান ও জমিনের বরকত খুলে দিতাম।" — (সূরা আ'রাফ: ৯৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ "নিশ্চয়ই বান্দা যে গুনাহ করে, তার কারণে তার রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।" — (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০২২, মুসনাদে আহমাদ)
সুতরাং: স্বামী যদি নোংরা মশকরা ও অশ্লীলতা অব্যাহত রাখে, তবে তার গুনাহের কারণে তার রিজিকে বরকত কমতে পারে। তবে এটা আল্লাহর হাতে; নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না যে "অমুক কাজ করলে রিজিক বন্ধ হবে"।
স্ত্রীর রিজিকের বরকত নষ্ট হবে না — কারণ সে গুনাহ করছে না, বরং এড়িয়ে চলছে।
করণীয় (স্ত্রীর জন্য পরামর্শ)
১. ধৈর্য ধারণ করুন — আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা রাখুন। ২. ভদ্রভাবে বোঝান — রাগ না করে ভালোবাসার সাথে বলুন, "এভাবে কথা বললে আমার মন খারাপ হয়, ইসলামেও এটা পছন্দনীয় নয়।" ৩. দুআ করুন — স্বামীর হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন। ৪. নোংরা মশকরায় অংশ নেবেন না — এড়িয়ে চলুন, কিন্তু সম্মান ও ভালোবাসা বজায় রাখুন। ৫. প্রয়োজনে দ্বীনদার আলেমের পরামর্শ নিন — স্বামীকে বোঝানোর জন্য। ৬. স্বামীর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করবেন না — ইসলামে স্বামীর আনুগত্য ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা কর্তব্য, তবে গুনাহের কাজে নয়।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | নোংরা মশকরা করা | নিষিদ্ধ (হারাম/মাকরুহে তাহরিমি) | | স্বামীর গুনাহ | হ্যাঁ, হবে | | স্ত্রীর গুনাহ (এড়িয়ে চললে) | না, হবে না; বরং সওয়াব | | স্ত্রীর গুনাহ (অংশ নিলে) | হ্যাঁ, হবে | | রিজিকের বরকত | গুনাহের কারণে বরকত কমতে পারে; স্ত্রীর নয়, স্বামীর |
মূল রেফারেন্স:
- আল-কুরআনুল কারীম (সূরা নিসা: ১৯, সূরা মায়িদা: ২, সূরা তালাক: ২-৩, সূরা আ'রাফ: ৯৬)
- সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে তিরমিজি, সুনানে ইবনে মাজাহ
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি)
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভি)
والله أعلم بالصواب