গুনাহ ছেড়ে না দিয়ে শুধু গুনাহের প্রতি অনুশোচনা থাকলে নাজাত পাওয়া যাবে কি

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 6083
Questioner: Abdullah
Question Asked: 28 Sep 2026, 05:14 PM
Reviewed & Published: 28 Sep 2026, 05:21 PM
Views: 14
Tokens: 7,105
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমরা অনেক সময় কোন একটা গুনাহের কাজে লিপ্ত থাকি। জানি কাজটা গুনাহ এবং এই কাজ এর জন্য আল্লাহর শাস্তির বিধানও জানি। এবং গুনাহটা যে আমাদের দ্বারা হচ্ছে এই জন্য অনুতপ্তও থাকি। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আমরা অবহেলাবশত সেই গুনাহের কাজ থেকে বের হয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করিনা। কিন্তু আবার আল্লাহর কাছে দু'আ করি যেন আল্লাহ সেই গুনাহ থেকে বাচিয়ে রাখেন। নিজে কোনো রকম চেষ্টা না করে বা দুনিয়াবি কোন আসবাব গ্রহণ না করে শুধু আল্লাহর কাছে দু'আ করে যাওয়া এবং এই আশায় থাকা যে আল্লাহ এমনিই এমনিই এই গুনাহ ছাড়ার তৌফিক দান করবেন এইটাই কি সুন্নত তরীকা বা এইটাই কি তাওয়াক্কুল নাকি নিজে সর্বোচ্চ চেষ্টা করাই মূল সুন্নত??

আর কেউ যদি এভাবে দিনের পর দিন শুধু দু'আই করে গেলো, নিজে গুনাহ ছাড়ার কোন চেষ্টা করলো না, দুনিয়াবি কোন পদক্ষেপ নিলো না, আবার আশা করলো যে আল্লাহ ইনশাআল্লাহ নাজাত দিয়ে দিবেন বা আল্লাহ শাস্তি দিবেন না। এই ধরনের আকিদা পোষণ করা কি সহীহ?

যদি সহীহ না হয় তাহলে সহীহ আকীদা এবং সহীহ কর্মপন্থা কী??

Answer

গুনাহ ছাড়ার চেষ্টা না করে শুধু দু'আ করা এবং নাজাতের আশা করা — ইসলামী দৃষ্টিতে এর বিধান

ভূমিকা

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি তাওহীদ, তাওয়াক্কুল, তাওবা ও আসবাব গ্রহণের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে তাওয়াক্কুল মানে হলো আল্লাহর উপর ভরসা করা — তবে দুনিয়াবি আসবাব (উপায়-উপকরণ) গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং আসবাব গ্রহণ করা সুন্নত এবং আল্লাহর হুকুম।


১. তাওয়াক্কুলের সঠিক সংজ্ঞা

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "আর আল্লাহর উপরই ভরসা করো, যদি তোমরা মুমিন হও।" — (সূরা আল-মায়িদা: ২৩)

فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ "অতঃপর যখন তুমি সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করো।" — (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)

তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআনে (মুফতি মুহাম্মদ শাফী রহ.) উল্লেখ আছে: তাওয়াক্কুল মানে হলো — সর্বোচ্চ চেষ্টা ও উপায় অবলম্বন করার পর আল্লাহর উপর ভরসা করা। শুধু দু'আ করে বসে থাকা এবং কোনো উপায় না নেওয়া — এটি তাওয়াক্কুল নয়, বরং এটি তাওয়াক্কুলের অপব্যাখ্যা।


২. আসবাব গ্রহণ করা সুন্নত — হাদীসের দলীল

হাদীস ১: উট বাঁধার নির্দেশ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

اعْقِلْ وَتَوَكَّلْ "তোমার উট বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করো।" — (সুনানে তিরমিযী: ২৫১৭)

ইমাম তিরমিযী (রহ.) এই হাদীসটি হাসান বলেছেন। আল্লামা মুবারকপুরী (রহ.) "তুহফাতুল আহওয়াযী"তে বলেন: এই হাদীস প্রমাণ করে যে, উপায় অবলম্বন করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং তাওয়াক্কুলের শর্ত হলো উপায় অবলম্বন করা।

হাদীস ২: যুদ্ধের প্রস্তুতি

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ "তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যথাসাধ্য শক্তি প্রস্তুত করো।" — (সূরা আল-আনফাল: ৬০)

এখানে আল্লাহ নিজেই আসবাব গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।

হাদীস ৩: চিকিৎসার নির্দেশ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً "তোমরা চিকিৎসা করো; কারণ আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধক সৃষ্টি করেননি।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫)


৩. গুনাহ ছাড়ার জন্য চেষ্টা করা ফরজ

কুরআনের নির্দেশ

وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ "আল্লাহর পথে যথাযথভাবে জিহাদ করো।" — (সূরা আল-হাজ্জ: ৭৮)

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا "যারা আমার পথে সংগ্রাম করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথ দেখাবো।" — (সূরা আল-আনকাবূত: ৬৯)

মুফতি মুহাম্মদ শাফী (রহ.) "মা'আরিফুল কুরআন"-এ এই আয়াতের তাফসীরে বলেন: আল্লাহর সাহায্য ও হেদায়েত তাদের জন্য যারা নিজে চেষ্টা করে। শুধু দু'আ করে বসে থাকলে আল্লাহর সাহায্যের প্রতিশ্রুতি নেই।

হাদীস

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ — (সহীহ বুখারী: ৬০১৮)

আরও বলেছেন:

الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ "শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।" — (সহীহ মুসলিম: ২৬৬৪)


৪. তাওবা ও গুনাহ ছাড়ার সঠিক পদ্ধতি

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ (খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৪৭) তাওবার শর্ত উল্লেখ করেছেন:

তাওবা সহীহ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত:

  1. গুনাহ থেকে সাথে সাথে বিরত হওয়া
  2. গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া (অনুশোচনা)
  3. ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা

যদি গুনাহটি কোনো বান্দার হক সম্পর্কিত হয়, তবে চতুর্থ শর্ত হলো — তার হক ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়া।

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানী"-তে (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪০১) বলেন: শুধু মুখে দু'আ করা এবং অনুতপ্ত হওয়া যথেষ্ট নয়; বরং গুনাহের আসবাব ও পরিবেশ থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা ফরজ।


৫. আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর

প্রশ্ন ১: শুধু দু'আ করে গুনাহ ছাড়ার চেষ্টা না করা — এটি কি সুন্নত তরীকা বা তাওয়াক্কুল?

উত্তর: না, এটি সুন্নত তরীকা নয় এবং তাওয়াক্কুলও নয়। এটি তাওয়াক্কুলের ভুল ব্যাখ্যা এবং অলসতা। সুন্নত তরীকা হলো:

  • গুনাহ থেকে বের হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা
  • আসবাব গ্রহণ করা (যেমন: খারাপ সঙ্গী ত্যাগ করা, খারাপ পরিবেশ পরিবর্তন করা, গুনাহের দরজা বন্ধ করা)
  • দু'আ করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা

প্রশ্ন ২: শুধু দু'আ করে, কোনো চেষ্টা না করে, আশা করা যে আল্লাহ নাজাত দেবেন — এই আকীদা সহীহ?

উত্তর: না, এই আকীদা সহীহ নয়। এটি আকীদার বিকৃতি। কারণ:

  • আল্লাহ তা'আলা আসবাব (উপায়) তৈরি করেছেন এবং সেগুলো গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
  • শুধু দু'আ করে চেষ্টা না করা — এটি আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যতা।
  • আল্লাহর রহমতের আশা করা ঠিক আছে, কিন্তু চেষ্টা না করে রহমতের আশা করা — এটি আকীদার গলদ।

ইমাম গাযালী (রহ.) "ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন"-এ বলেন: তাওয়াক্কুলের তিনটি স্তর:

  1. তাওয়াক্কুল — আল্লাহর উপর ভরসা
  2. তাদবীর — উপায় অবলম্বন
  3. তাসলীম — আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা

শুধু তাওয়াক্কুল করে তাদবীর বাদ দেওয়া — এটি ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী।


৬. সহীহ আকীদা ও সহীহ কর্মপন্থা

সহীহ আকীদা:

  1. আল্লাহই সবকিছুর স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক — তিনি ছাড়া কারো ক্ষমতা নেই।
  2. আল্লাহ আসবাব তৈরি করেছেন — এবং আসবাব গ্রহণ করা আল্লাহর হুকুম।
  3. তাওয়াক্কুল মানে আসবাব ত্যাগ করা নয় — বরং আসবাব গ্রহণের পর আল্লাহর উপর ভরসা করা।
  4. আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার আশা করা — তবে চেষ্টা ও তাওবার সাথে।

সহীহ কর্মপন্থা:

| ধাপ | করণীয় | |-----|--------| | ১ | গুনাহ থেকে সাথে সাথে বিরত হওয়া | | ২ | আন্তরিক তাওবা করা (অনুশোচনা + ভবিষ্যতে না করার সংকল্প) | | ৩ | গুনাহের আসবাব দূর করা (খারাপ সঙ্গ, পরিবেশ, অভ্যাস) | | ৪ | বিকল্প ভালো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা | | ৫ | নিয়মিত দু'আ ও ইস্তিগফার করা | | ৬ | আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং তাঁর রহমতের আশা করা | | ৭ | প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া |


৭. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ "নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।" — (সূরা আর-রাদ: ১১)

এই আয়াত স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, নিজে পরিবর্তনের চেষ্টা করা আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার পূর্বশর্ত।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

الْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ "প্রকৃত মুজাহিদ সে-ই, যে নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।" — (সুনানে তিরমিযী: ১৬২১)


উপসংহার

শুধু দু'আ করে গুনাহ ছাড়ার চেষ্টা না করা — এটি সুন্নত তরীকা নয়, তাওয়াক্কুলও নয়; বরং এটি অলসতা ও আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যতা। সহীহ আকীদা হলো — আসবাব গ্রহণ করা আল্লাহর হুকুম, এবং তাওয়াক্কুল হলো আসবাব গ্রহণের পর আল্লাহর উপর ভরসা করা। গুনাহ ছাড়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা ফরজ, এবং দু'আ হলো সেই চেষ্টার একটি অংশ।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন এবং আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.