আহলিতে বায়োডাটা দেওয়ার পর কারো বায়োডাটা পছন্দ হলে সরাসরি নক দেওয়া কি শরিয়তসম্মত?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আহলিতে আমার বায়োডাটা দেওয়া আছে সে ক্ষেত্রে যদি কারো বায়োডাটা দেখে আমার পছন্দ হয় সে ক্ষেত্রে কি আমি উনার বায়োডাটা ক্রয় করার পর আমি নিজে নক দিতে পারবো কি না ? এটা শযরিয়ত সম্মত কি না ?
আমার অনেক বিষয় জানার বা প্রশ্ন করার থাকে সে ক্ষেত্রে আমি চাই যে এই বিষয় গুলো যদি মিলে যায় তারপর পরিবার কে শুনাতে ।
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের সারমর্ম এই যে, আহলিতে (বা কোনো ম্যাট্রিমনিয়াল সাইট/সার্ভিসে) নিজের বায়োডাটা দেওয়া আছে। সেখানে কারো বায়োডাটা দেখে পছন্দ হলে, তার বায়োডাটা ক্রয়/আনলক করার পর নিজে সরাসরি যোগাযোগ (নক) করা কি শরিয়তসম্মত? আর কিছু বিষয় জেনে-বুঝে মিলে গেলে তারপর পরিবারকে জানানো যাবে কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
শরিয়তের দৃষ্টিতে বিবাহের প্রস্তাব বা পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের জন্য যোগাযোগ করা নিষিদ্ধ নয়; বরং শরিয়ত বিবাহকে সহজ করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে এতে অবশ্যই পর্দা, শালীনতা, শরিয়তের সীমা এবং অভিভাবকের ভূমিকা রক্ষা করতে হবে। সরাসরি পাত্র-পাত্রীর মধ্যে দীর্ঘ, ঘনিষ্ঠ, প্রেম-প্রণয়মূলক বা একান্তে যোগাযোগ শরিয়তসম্মত নয়। আর শুধু বায়োডাটা ক্রয় করে নক দেওয়া—যদি তা শরিয়তের গণ্ডির মধ্যে থাকে, অভিভাবককে জানানো হয় এবং উদ্দেশ্য বিবাহের সঠিক প্রস্তাব হয়—তবে তা নীতিগতভাবে জায়েয। তবে উত্তম ও নিরাপদ পদ্ধতি হলো, প্রথমে পরিবার/অভিভাবকের মাধ্যমে যোগাযোগ করা।
১. বিবাহের প্রস্তাব ও পাত্র-পাত্রী দেখা/জানা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمْ الْمَرْأَةَ، فَإِنْ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحِهَا فَلْيَفْعَلْ» — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২০৮২; মুসনাদে আহমাদ; তিরমিজি
অর্থ: “তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীর কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, তখন যদি সে তার দিকে এমনভাবে দেখতে পারে যা তাকে বিবাহে আগ্রহী করে, তবে সে যেন তা করে।”
আরেক হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«انْظُرْ إِلَيْهَا، فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا» — তিরমিজি, হাদিস ১০৮৭; নাসাঈ, হাদিস ৩২৩৫
অর্থ: “তার দিকে দেখো, কারণ এতে তোমাদের উভয়ের মধ্যে প্রেম-সৌহার্দ্য স্থাপনে সহায়ক হবে।”
ফিকহি দৃষ্টিকোণ:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী, বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার আগে পাত্র-পাত্রীর জন্য একে অপরকে দেখা জায়েয, যদি উদ্দেশ্য বিবাহ হয় এবং কামনা-বাসনার সাথে না মিশে যায়। তবে একান্তে (খালওয়া) বৈঠক করা, দীর্ঘ সময় কথা বলা, প্রেম-প্রণয় করা নিষিদ্ধ।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৫, পৃ. ২৩৭ — “বিবাহের প্রস্তাবকারীর জন্য পাত্রীকে দেখা মুস্তাহাব।”
- আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ — “বিবাহের প্রস্তাবের সময় দেখা জায়েয।”
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩০০-৩০৫ — আধুনিক প্রেক্ষাপটে পাত্র-পাত্রী দেখা ও যোগাযোগের শরিয়তসম্মত পদ্ধতি।
২. বায়োডাটা ক্রয় করে সরাসরি নক দেওয়া
আপনি যদি আহলিতে কারো বায়োডাটা দেখে পছন্দ করেন এবং বায়োডাটা ক্রয়/আনলক করে সরাসরি যোগাযোগ করেন, তবে এর হুকুম নির্ভর করে যোগাযোগের ধরন ও উদ্দেশ্যের উপর:
(ক) জায়েয হবে যদি:
- উদ্দেশ্য হয় শুধু বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া বা প্রাথমিক তথ্য যাচাই করা।
- কথা বলার সময় পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করা হয়; অশ্লীল, প্রেমমূলক বা উত্তেজনামূলক কথা না হয়।
- একান্তে (খালওয়া) না হয়; অর্থাৎ ফোন/মেসেজে হলেও তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি বা অভিভাবকের জ্ঞান থাকা উত্তম।
- অভিভাবককে জানানো হয় বা জানানোর নিয়ত থাকে।
- মিথ্যা, প্রতারণা, বা কারো সম্মানহানি না হয়।
(খ) নাজায়েয হবে যদি:
- পাত্র-পাত্রীর মধ্যে গোপন প্রেম-প্রণয়, দীর্ঘ সময় একান্তে কথা বলা, বা কামনা-বাসনার সাথে মিশ্রিত যোগাযোগ হয়।
- অভিভাবককে সম্পূর্ণ গোপন রেখে চলা হয়।
- উদ্দেশ্য শুধু সময় কাটানো, ফ্লার্ট করা, বা বিবাহ ছাড়া অন্য কিছু হয়।
- ছবি, ভিডিও, বা ব্যক্তিগত তথ্য বিনিময় করে অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে।
শরিয়তের মূলনীতি:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
«وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا» — সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩২
«فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ» — সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৩২
অর্থ: “তোমরা কোমল স্বরে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে রোগ আছে সে লোভ না করে।”
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৩৭-২৩৮ — “বেগানা নারীর সাথে একান্তে কথা বলা নিষিদ্ধ।”
- ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ — “নারী-পুরুষের মধ্যে অবৈধ সম্পর্কের দরজা বন্ধ করা।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৬০ — “বিবাহের উদ্দেশ্যে যোগাযোগে পর্দা রক্ষা করা আবশ্যক।”
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩০২ — “ম্যাট্রিমনিয়াল সাইটে যোগাযোগে অভিভাবকের সম্পৃক্ততা জরুরি।”
৩. পরিবারকে পরে জানানো
আপনি চান, কিছু বিষয় মিলে গেলে তারপর পরিবারকে জানাবেন। এটা নীতিগতভাবে জায়েয, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে উত্তম হলো প্রথম থেকেই পরিবারকে জানানো বা অভিভাবকের মাধ্যমে যোগাযোগ করা। কারণ:
- অভিভাবকের সম্পৃক্ততা থাকলে ভুল বোঝাবুঝি, প্রতারণা, ও অপবাদের আশঙ্কা কমে।
- শরিয়ত বিবাহের বিষয়ে অভিভাবকের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়েছে।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ» — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২০৮৫; তিরমিজি, হাদিস ১১০১
অর্থ: “অভিভাবক ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।”
যদিও এটি মূলত বিবাহ চুক্তির বৈধতার সাথে সম্পর্কিত, তবে এর روح হলো—বিবাহের বিষয়ে অভিভাবকের সম্পৃক্ততা রাখা।
তাই উত্তম পদ্ধতি:
- প্রথমে বায়োডাটা দেখে প্রাথমিক পছন্দ করুন।
- তারপর পরিবার/অভিভাবককে জানান।
- অভিভাবকের মাধ্যমে যোগাযোগ করুন বা অন্তত তাদের উপস্থিতিতে/জ্ঞানে যোগাযোগ করুন।
- কিছু বিষয় যাচাই করার প্রয়োজন হলে, অভিভাবকের মাধ্যমে বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যাচাই করুন।
- সবকিছু মিলে গেলে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে বিবাহের প্রস্তাব দিন।
৪. সারসংক্ষেপ ও ফতোয়া
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | বায়োডাটা দেখা ও পছন্দ করা | জায়েয, যদি উদ্দেশ্য বিবাহ হয় | | বায়োডাটা ক্রয় করে যোগাযোগ | নীতিগতভাবে জায়েয, তবে শর্তসাপেক্ষে | | সরাসরি নক দেওয়া | জায়েয, যদি পর্দা, শালীনতা ও অভিভাবকের জ্ঞান থাকে | | একান্তে দীর্ঘ কথা বলা | নাজায়েয | | প্রেম-প্রণয়মূলক যোগাযোগ | নাজায়েয | | অভিভাবককে গোপন রাখা | নাজায়েয/মাকরূহ | | পরিবারকে পরে জানানো | জায়েয, তবে প্রথম থেকেই জানানো উত্তম | | অভিভাবকের মাধ্যমে যোগাযোগ | সর্বোত্তম ও নিরাপদ |
চূড়ান্ত ফতোয়া:
আপনি যদি আহলিতে বায়োডাটা ক্রয় করে সরাসরি যোগাযোগ করেন, তবে তা শরিয়তসম্মত হওয়ার জন্য শর্ত হলো—উদ্দেশ্য হবে শুধু বিবাহের প্রস্তাব ও তথ্য যাচাই; কথা বলায় পর্দা ও শালীনতা রক্ষা হবে; একান্তে দীর্ঘ কথাবার্তা বা প্রেম-প্রণয় হবে না; এবং অভিভাবককে জানানো হবে বা জানানোর নিয়ত থাকবে। তবে সর্বোত্তম ও নিরাপদ পদ্ধতি হলো অভিভাবকের মাধ্যমে যোগাযোগ করা। আর কিছু বিষয় মিলে গেলে পরিবারকে জানানো—এটা জায়েয, তবে প্রথম থেকেই পরিবারকে সম্পৃক্ত করা উত্তম।
উপদেশ:
শরিয়তের দৃষ্টিতে বিবাহ একটি পবিত্র ইবাদত। তাই এতে শালীনতা, পর্দা, সততা ও অভিভাবকের সম্পৃক্ততা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। আপনি যদি সরাসরি যোগাযোগ করেন, তবে তা যেন শরিয়তের সীমা অতিক্রম না করে এবং অভিভাবককে জানানো হয়—এ বিষয়ে সচেতন থাকুন। আর সম্ভব হলে প্রথম থেকেই অভিভাবকের মাধ্যমে যোগাযোগ করুন; এটাই সর্বোত্তম ও নিরাপদ পথ।
والله أعلم بالصواب
والسلام علیکم ورحمة الله وبركاته