জামাইকে ভালো খাবার দেওয়া ইসলামে জায়েয কি
Family Life · Hanafi
Question
দেওয়া হয় কিন্ত উনার বিশ্বাস হচ্ছে না যে একটা মুরগী শুধু একবারে খাওয়া হয় মুরগী ওজন ৩কেজি কম। আর আমার জামাইআমার মায়ের বাড়িতে এবার আসার সময় একটি মুরগী নিয়ে এসেছিল মুরগীটি রোস্ট করেছিলাম আমাদের বাড়িতে মোট সাতজন মানুষ মুরগির রোস্ট করলে স্বাভাবিক ৪ পিচ হয়। সেখানে ৭ পিস করেছিলাম। সবথেকে বড় পিছ তাকে দিয়েছিলাম। আর আমার ছোট ভাই যখন রান্না করি তখন আর একটা বড় পিছ দেখিয়ে। বলেছিল আমাকে এটা দিবা। সে দ্রুত প্রতিদিন ঘুমিয়ে যায় আর তার সন্ধ্যা লাগলেই ক্ষুধা পাই এজন্য মা ছোট ভাইকে ওই পিজটি দিয়েছিল। আমার হাজবেন্ডের কথা ও ছোট এত বড় পিচ কেন খাবে আর আর অন্যজন খেলে তো হতো। আরেকটি কথা বলেছে কথাটা হচ্ছে তোর ছোট হিসেবে ওর খাওয়া-দাওয়ার বেশি। এবারে আসার সময় চালতা নিয়ে আসছিল সেই চালতার আচার দিয়েছি আছার দেওয়ার পরে আমার হাজবেন্ডের জন্য বেশ খানিক দিয়েছি আমাদের এখানে রাখছি আর আমার নানির জন্য অল্প একটু রেখেছি তোমার হাজব্যান্ডকেই বেশি দিয়েছি। তারপরে আমার হাজব্যান্ড বললো যে যে ছয়টা চালতার এতোটুকু আচার হয়েছে আর আমি বললাম যে কোন জিনিসই কমে যায় রান্না করলে এটাও কমে গেছে তার মধ্যে আপনাকে বেশি দিয়েছি।
এই কথাগুলা নিয়ে তার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে আমি সবার লাস্টে বলেছি প্রতিদিন পর আমরা দেখতে দেখে বাসায় যাব আমার হাজব্যান্ড রংপুরে থাকে। সেই সুবাদে হাজবেন্ডের কাছে যাব সেজন্য বললাম আপনি খাবার নিয়ে এত হিসেব রাখেন তাহলে বাসায় যে আপনার সাথে আমার পূর্বে কিভাবে এজন্য বলছিলাম আমি বাসায় না যাই তার থেকে আমি বাবার বাসায় থাকি রাগ করে বলেছিলাম মনের কথা নয় মনের কথা নয় আমি এখানে কি এমন খারাপ কথা বললাম যে হাজবেন্ড আমাকেতার সাথে নাকি আমি খারাপ ।। আমি আর আমি যে কথাগুলো বলেছি আর সে যেই কথাগুলা বলেছে এগুলা ইসলামে কি বলে
Answer
স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক কথাকাটাকাটি: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নে বর্ণিত বিষয়গুলো মূলত পারিবারিক খাবারের হিসাব-নিকাশ, জামাইকে আপ্যায়ন, শ্বশুরবাড়িতে মুরগির মাংস বণ্টন, চালতার আচার বণ্টন ইত্যাদি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সৃষ্ট কথাকাটাকাটি সম্পর্কিত। জানতে চেয়েছেন—তাঁর ও তাঁর স্বামীর এসব কথাবার্তা ইসলামের দৃষ্টিতে কী?
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাধান
১. খাবারের হিসাব রাখা ও অভিযোগ করা
ইসলামে পারিবারিক জীবনে খাবারের ছোটখাটো হিসাব নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করা অনুচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের প্রতি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।" (তিরমিযী: ৩৮৯৫; ইবনে মাজাহ: ১৯৭৭)
সুতরাং স্বামীর উচিত নয়—শ্বশুরবাড়িতে আপ্যায়নের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অভিযোগ করা বা হিসাব চাওয়া। আর স্ত্রীরও উচিত নয়—রাগের বশে কঠোর কথা বলা বা "আমি বাবার বাড়িতে থাকি, তোমার বাড়িতে যাব না" ধরনের কথা বলা, যা সম্পর্কের অবনতি ঘটায়।
২. জামাইকে উত্তম আপ্যায়ন করা
শ্বশুরবাড়ির জন্য জামাইকে ভালো খাবার দেওয়া, ভালো টুকরা রাখা—এটি ইসলামসম্মত ও প্রশংসনীয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ মেহমানদারির প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। তবে এতে যদি পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতি অবিচার হয়, তবে ভারসাম্য রক্ষা করা কর্তব্য।
৩. মুরগির মাংস বণ্টন প্রসঙ্গে
৭ জনের মধ্যে ৭ টুকরা করা এবং সবচেয়ে বড় টুকরা জামাইকে দেওয়া—এটি আপ্যায়নের অন্তর্ভুক্ত, গুনাহ নয়। তবে ছোট ভাইয়ের জন্য রাখা টুকরা নিয়ে স্বামীর আপত্তি করা বা "ছোট কেন বড় টুকরা খাবে" বলা—এটি অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক। ইসলামে খাবারে সংকীর্ণতা বা হিসাব-নিকাশ পছন্দনীয় নয়।
৪. চালতার আচার বণ্টন
আচার বণ্টনে স্বামীকে বেশি দেওয়া, নানির জন্য অল্প রাখা—এটিও স্বাভাবিক পারিবারিক বিষয়। এ নিয়ে ঝগড়া করা বা "তোমার হাজব্যান্ডকেই বেশি দিয়েছি" বলে তর্ক করা—দুই পক্ষের জন্যই অনুচিত।
৫. রাগের বশে কঠোর কথা বলা
ইসলামে রাগ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا تَغْضَبْ "রাগ করো না।" (বুখারী: ৬১১৪)
স্ত্রী যদি রাগ করে বলেন—"আমি বাবার বাড়িতে থাকি, তোমার বাড়িতে যাব না"—এটি শরীয়তসম্মত নয়। কারণ স্ত্রীর জন্য স্বামীর ঘরই তার প্রধান ঠিকানা (যদি নিরাপত্তা ও দ্বীনি পরিবেশ থাকে)। তবে যদি স্বামী দ্বীনদার না হয় বা স্ত্রীর দ্বীনি ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে ভিন্ন বিধান আছে।
৬. "তুমি খারাপ" বলা
স্বামী যদি স্ত্রীকে "তুমি খারাপ" বলে গালি দেন বা অপমান করেন—এটি হারাম। মুসলিমকে গালি দেওয়া ফিসক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ "মুসলিমকে গালি দেওয়া ফিসক (পাপ)।" (বুখারী: ৬০৪৪)
তবে স্ত্রী যদি স্বামীকে "তুমি খারাপ" বলেন—সেটিও একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত।
৭. সমাধানের পথ
- উভয়ের উচিত আল্লাহর কাছে তাওবা করা এবং একে অপরের কাছে ক্ষমা চাওয়া।
- খাবারের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া বন্ধ করা।
- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমা রক্ষা করা—কেউ কাউকে অপমান না করা, গালি না দেওয়া।
- স্ত্রীর বাবার বাড়িতে যাওয়া শরীয়তসম্মত, তবে স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে। স্বামী যদি অন্যায়ভাবে বাধা দেয়, তবে ইসলামী শরীয়তে স্ত্রীর অভিভাবকত্ব ও অধিকার সংরক্ষিত।
- পারিবারিক বিষয়ে পরামর্শ—উভয়ের উচিত শান্তভাবে আলোচনা করা, রাগের সময় চুপ থাকা।
**মূল কথা:ঝগড়া-বিবাদ, অপমান, গালি ও রাগের বশে কঠোর কথা বলা—এসব পরিহার করা কর্তব্য। উভয়ের উচিত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে সম্পর্ক ঠিক করা এবং ভবিষ্যতে খাবারের ছোটখাটো বিষয়ে বিতর্ক না করা।
রেফারেন্স:
- সূরা আন-নিসা: ১৯
- সহীহ বুখারী: ৬০৪৪, ৬১১৪
- সহীহ তিরমিযী: ৩৮৯৫
- ইবনে মাজাহ: ১৯৭৭
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)