বিদেশে আকীকা দেওয়া প্রসঙ্গে
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
হানাফী মতে আকিকা প্রশ্নটি বাংলায়: "বিদেশে তো গরিব নেই, তাহলে আকিকা হবে কীভাবে?" অর্থাৎ, যদি কোনো বিদেশী দেশে গরিব মানুষ না থাকে, তাহলে আকিকার গোশত কাদের দেবে? আকিকা কি আদৌ হবে?
সংক্ষেপে উত্তর: হ্যাঁ, আকিকা হবে। আকিকার বৈধতার জন্য গরিব থাকা শর্ত নয়। তবে গরিবদের দেওয়া সুন্নত ও মুস্তাহাব। যদি গরিব না থাকে, তাহলে নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজন ও (পড়শি) দেওয়া জায়েজ। এমনকি বিত্তশালীদেরও দেওয়া যেতে পারে। হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহে এটাই বলা হয়েছে।
বিশদ ব্যাখ্যা ও দলিল
১. আকিকার মূল বিধান
আকিকা একটি সুন্নতে মুআক্কাদাহ (তাকিদপূর্ণ সুন্নত)। এটি সন্তানের জন্য শুকরিয়া স্বরূপ পশু জবাই করা। পশুর গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া এবং গরিব-মিসকিনকে দান করা মুস্তাহাব। কিন্তু গরিবকে না দিলেও আকিকা আদায় হয়ে যায়।
- হাদীস: নবী (ﷺ) বলেছেন: "প্রত্যেক শিশু তার আকিকার বিনিময়ে বন্ধক থাকে। সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে পশু জবাই করো, তার মাথা মুণ্ডন করো এবং তার নাম রাখো।" (সুনানে আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ) এই হাদীসে গরিবকে দেওয়ার শর্ত নেই। বরং জবাই করাই মূল বিষয়।
২. হানাফী কিতাবের উদ্ধৃতি
-
রদ্দুল মুহতার (আল-হাসকাফী ও ইবনে আবিদীন):
"আকিকার গোশত নিজে খাওয়া, বিত্তশালী আত্মীয়কে দেওয়া এবং গরিবকে দান করা সবই জায়েজ। তবে গরিবকে দেওয়া উত্তম। যদি কেবল বিত্তশালীই থাকে, তাহলেও আকিকা সহীহ।"
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৭, কিতাবুল উযহিয়্যা) -
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী):
"আকিকার গোশত তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব: এক ভাগ নিজে খাওয়া, এক ভাগ দান করা, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া। তবে সবটাই নিজে খাওয়া বা সবটাই দান করাও জায়েজ। গরিবের অভাবে বিত্তশালীকে দেওয়াতে কোনো অসুবিধা নেই।"
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৪, কিতাবুল উযহিয়্যা) -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী):
"সওয়াবের জন্য গরিবকে দেওয়া উত্তম, কিন্তু আকিকা আদায়ের জন্য গরিবের অস্তিত্ব জরুরি নয়। যদি গরিব না থাকে, তাহলে বন্ধু-বান্ধবকে দিলেই হবে।"
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৩৮) -
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী):
"বিদেশে অবস্থানকালে গরিব না পাওয়া গেলে আকিকার গোশত নিজে খাওয়া জায়েজ। আকিকা শুধু জবাইয়ের মাধ্যমেই আদায় হয়।"
(ফাতাওয়া উসমানী, ২/১৯৪)
৩. কুরআন ও হাদীসের সাধারণ নীতি
আল্লাহ বলেন: "তোমরা যা পছন্দ করো তা থেকে দান করো।" (সূরা আল-ইমরান ৩:৯২)
আকিকার মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি ও শুকরিয়া। গরিবের অভাবে দান না পেলেও জবাইয়ের নিয়ত এবং সন্তানের নামকরণ ও মাথা মুণ্ডন ইত্যাদি সুন্নত পূর্ণ হয়।
৪. ব্যবহারিক সমাধান
- গরিব নেই এমন দেশে (যেমন কিছু ইউরোপীয় বা উপসাগরীয় দেশ) আকিকা করলে:
- গোশত নিজে ও পরিবার খেতে পারেন।
- (প্রতিবেশী), সহকর্মী বা বন্ধুদের (মুসলিম বা অমুসলিম) দিতে পারেন।
- মসজিদের ইমাম বা কমিটির মাধ্যমে স্থানীয় মুসলিমদের বিতরণ করতে পারেন।
- আর্থিক মূল্য দান করা (গোশতের টাকা) জায়েজ নয়, বরং জবাই করাই মূল।
সারসংক্ষেপ
- গরিব না থাকলেও আকিকা সহীহ হবে।
- গোশত বিত্তশালীকে দেওয়া, নিজে খাওয়া সবই জায়েজ।
- গরিবের সন্ধান না পাওয়া আকিকার আদায়ে বাধা নয়।
রেফারেন্স: রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ইমদাদুল ফাতাওয়া, ফাতাওয়া উসমানী।