ঘরে নন মাহরাম থাকলে একজন মুমিন নারীর পর্দার বিধান কেমন?

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 6054
Questioner: kazi asma sabiha
Question Asked: 28 Sep 2026, 08:17 AM
Reviewed & Published: 28 Sep 2026, 11:41 AM
Views: 13
Tokens: 6,815
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একজন অবিবাহিত মেয়ে। আমার বড় বোন তার বিয়ের পর থেকে আমাদের বাড়িতে আসলে তার স্বামি অর্থাৎ আমার দুলাভাই আমাদের বাড়িতে থাকেন। আমি পরিপূর্ণ পর্দা করি। ঘরে বিভিন্ন কাজের সময় আমি রান্নাঘরে গেলেও বড় খিমার এবং নিকাব পড়ে যাই। কিন্তু প্রতিবারই দুলাভাই আসলে উনি এক রুম থেকে অন্য রুমে যাওয়ার সময় কোনো আওয়াজ শব্দ ছাড়াই হুট করে চলে আসেন। এই কারনে।আমি প্রত্যকবার অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ি। আমি যখন যেই রুমে বসি আমি চাই দরজা লাগিয়ে রাখতে কিন্তু আমার মা বোন তা করতে দেয় না। আমার বোন বলে তার স্বামী নাকি কখনও আমার দিকে তাকায় না তাই আমি এভাবে দরজা লাগানো মানে আমি বাড়াবাড়ি করছি। আমি দুলাভাই এর সাথে কথা বলতে চাইনা সেটা নিয়েও আমার সাথে জোরাজোরি করা হয়। উনি আসলেই অবশ্যই উনাকে সামনে গিয়ে সালাম দিতে হবে। এসব কি উচিত?

Answer

ঘরে নন-মাহরাম থাকলে মুমিন নারীর পর্দার বিধান

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার অবস্থানে আপনি সঠিক পথেই আছেন। ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী আপনার করণীয় হলো:

১. নন-মাহরাম (দুলাভাই) থেকে পূর্ণ পর্দা করা — এটি আপনার উপর ফরজ। ২. তার সাথে কথা না বলা, দেখা না দেওয়া — এটি আপনার হক, বরং কর্তব্য। ৩. দরজা বন্ধ রাখা — এতে বাড়াবাড়ি নেই; বরং এটাই শরীয়তসম্মত। ৪. সালাম দেওয়ার জন্য সামনে যাওয়া — নন-মাহরামের সাথে এভাবে দেখা করা জায়েজ নয়।


বিস্তারিত দলিলসহ আলোচনা

১. নন-মাহরাম থেকে পর্দার বিধান কুরআনে

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَىٰ عَوْرَاتِ النِّسَاءِ ۖ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ ۚ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে; আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, except যা প্রকাশ্য; আর তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের পুত্র, বোনের পুত্র, তাদের নারীগণ, তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে, এমন পুরুষ যারা কামনা-বাসনাহীন, অথবা এমন শিশু যারা নারীর গোপনীয়তা সম্পর্কে অবগত নয় — এদের ছাড়া।"

(সূরা আন-নূর: ৩১)

দলিল: এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন কারা মাহরাম — যাদের সামনে পর্দা করা লাগবে না। দুলাভাই (বোনের স্বামী) এই তালিকায় নেই। সুতরাং তিনি নন-মাহরাম, এবং তার থেকে পর্দা করা আপনার উপর ফরজ।


২. হাদিসে নন-মাহরাম সম্পর্কে সতর্কতা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ

"নারীদের কাছে (নিরিবিলি) প্রবেশ করা থেকে সাবধান থাকো।"

(সহীহ বুখারী: ৫২৩২, সহীহ মুসলিম: ২১৭২)

একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন: "হে আল্লাহর রাসূল! শ্বশুর (দুলাভাই/নন-মাহরাম আত্মীয়) সম্পর্কে কী বলবেন?" রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:

الْحَمْوُ الْمَوْتُ

"শ্বশুর/নন-মাহরাম আত্মীয় হলো মৃত্যু (স্বরূপ বিপদ)।"

(সহীহ বুখারী: ৫২৩২, সহীহ মুসলিম: ২১৭২)

ব্যাখ্যা: ইমাম নববী রহ. বলেন, "আল-হামু" (الْحَمْوُ) বলতে স্বামীর আত্মীয়দের বোঝানো হয়েছে, যেমন ভাই, চাচা, চাচাতো ভাই ইত্যাদি। এদেরকে "মৃত্যু" বলা হয়েছে কারণ এদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ সহজে হয় এবং ফিতনার আশঙ্কা বেশি। (শারহু সহীহ মুসলিম: ১৪/১৫৪)

শাইখ ইবন উসাইমীন রহ. বলেন: "নন-মাহরাম আত্মীয়দের থেকে পর্দা করা ওয়াজিব, কারণ ফিতনা তাদের মাধ্যমেই বেশি ঘটে।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব: ১২/৮৭)


৩. দুলাভাই কি মাহরাম?

উত্তর: না, কখনোই না।

দুলাভাই (বোনের স্বামী) কখনোই মাহরাম নন। তিনি আপনার জন্য চিরকাল নন-মাহরাম থাকবেন। এমনকি বোনের তালাক হলেও তিনি নন-মাহরামই থাকবেন।

শাইখ ইবন বায রহ. বলেন: "বোনের স্বামী, খালার স্বামী, ফুফুর স্বামী — এরা সবাই নন-মাহরাম। এদের থেকে পর্দা করা ওয়াজিব।" (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবন বায: ২১/৪২৩)


৪. আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর

(ক) দরজা বন্ধ রাখা কি বাড়াবাড়ি?

উত্তর: না, এটি বাড়াবাড়ি নয়; বরং এটি শরীয়তসম্মত ও কর্তব্য।

আপনার মা-বোনের বলা "সে তাকায় না তাই দরজা লাগানোর দরকার নেই" — এটি ভুল ধারণা। কারণ:

  • দৃষ্টি সংযত করার দায়িত্ব শুধু পুরুষের নয়, নারীরও। আল্লাহ বলেন: "মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
  • ফিতনার আশঙ্কা থাকলেই সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। শাইখ ইবন তাইমিয়yah রহ. বলেন: "যে বিষয় ফিতনার দিকে নিয়ে যায় তা বন্ধ করা ওয়াজিব।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৫/৪১৯)
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নারী ও পুরুষের মধ্যে শয়তান তৃতীয়।" (তিরমিযী: ২১৬৫, সহীহ)

সুতরাং দরজা বন্ধ রাখা আপনার অধিকার, বরং আপনার নিরাপত্তার জন্য কর্তব্য।

(খ) দুলাভাইয়ের সাথে কথা না বলা কি ঠিক?

উত্তর: হ্যাঁ, এটি সম্পূর্ণ ঠিক।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ۚ ذَٰلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ

"আর যখন তোমরা তাদের কাছে কোনো কিছু চাও, তবে পর্দার আড়াল থেকে চাও। এটাই তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্র।"

(সূরা আল-আহযাব: ৫৩)

শাইখ ইবন কাসীর রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: "এটি প্রমাণ করে যে, নারীর সাথে নন-মাহরাম পুরুষের দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলা নিষিদ্ধ, যদি না প্রয়োজন হয়।" (তাফসীর ইবন কাসীর: ৬/৪৮১)

শাইখ আল-আলবানী রহ. বলেন: "নন-মাহরামের সাথে নারীর কথা বলা জায়েজ নয়, যদি না শরীয়তসম্মত প্রয়োজন হয় এবং পর্দার সাথে হয়।" (সিলসিলা সহীহা: ১/৮০৫)

(গ) সালাম দেওয়ার জন্য সামনে যাওয়া কি জরুরি?

উত্তর: না, এটি জরুরি নয়; বরং এটি পরিহার করা উচিত।

  • সালাম দেওয়া সুন্নত, কিন্তু নন-মাহরামের সামনে যাওয়া ও দেখা করা জায়েজ নয়।
  • শাইখ ইবন উসাইমীন রহ. বলেন: "নন-মাহরামকে সালাম দেওয়া জায়েজ, তবে পর্দার আড়াল থেকে, এবং ফিতনার আশঙ্কা না থাকলে। আর যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে তবে পরিহার করা ওয়াজিব।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব: ১২/৯০)

আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, সেহেতু আপনি সালাম দেওয়ার জন্য সামনে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন। আপনার পরিবারকে জোর করা আপনার উপর জুলুম।


৫. আপনার পরিবারের প্রতি আপনার করণীয়

১. সুন্দরভাবে বুঝান: আপনার মা-বোনকে বলুন, "আমি শরীয়তের বিধান পালন করছি। দুলাভাই নন-মাহরাম, তাই তার থেকে পর্দা করা আমার উপর ফরজ।"

২. দৃঢ় থাকুন: আপনি আপনার ঘরে দরজা বন্ধ রাখার অধিকার রাখেন। এটি আপনার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও শরীয়তসম্মত অধিকার।

৩. সালামের বিকল্প: আপনি দুলাভাইকে সালাম দিতে চাইলে পর্দার আড়াল থেকে দিতে পারেন, অথবা সালাম দেওয়া ছাড়াও থাকতে পারেন — এতে কোনো গুনাহ নেই।

৪. ঘরে থাকার সময়: আপনি যখন রান্নাঘরে যান, তখন আগে দেখে নিন দুলাভাই কোথায় আছেন। সম্ভব হলে এমন সময়ে যান যখন তিনি অন্য রুমে থাকেন।

৫. আল্লাহর উপর ভরসা: আল্লাহ তা'আলা বলেন: "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)


৬. বিশেষ সতর্কতা

শাইখ সালিহ আল-ফাওযান হাফিযাহুল্লাহ বলেন: "নারীদের জন্য নন-মাহরাম আত্মীয়দের থেকে পর্দা করা ওয়াজিব। এই বিধানে কোনো ছাড় নেই, তা সে যত নিকট আত্মীয়ই হোক।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান: ৩/২৪৫)

শাইখ ইবন তাইমিয়yah রহ. বলেন: "নারীদের জন্য নন-মাহরামের সাথে মিশে যাওয়া হারাম, কারণ এটি ফিতনার দিকে নিয়ে যায়।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৫/৪১৯)


উপসংহার

| বিষয় | বিধান | |------|------| | দুলাভাই থেকে পর্দা করা | ফরজ | | দরজা বন্ধ রাখা | জায়েজ, বরং কর্তব্য | | তার সাথে কথা না বলা | জায়েজ, বরং উত্তম | | সালামের জন্য সামনে যাওয়া | পরিহার করা উচিত | | পরিবারের জোর করা | ভুল ও জুলুম |

আপনি সঠিক পথে আছেন। আপনার পরিবারকে সুন্দরভাবে বুঝান, প্রয়োজনে পারিবারিক মুরব্বিদের মাধ্যমে বা মসজিদের ইমাম সাহেবের মাধ্যমে বুঝানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে, আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। আল্লাহ তা'আলা আপনার হেফাজত করুন।


রেফারেন্স

  • সূরা আন-নূর: ৩১
  • সূরা আল-আহযাব: ৫৩
  • সহীহ বুখারী: ৫২৩২
  • সহীহ মুসলিম: ২১৭২
  • তিরমিযী: ২১৬৫
  • মাজমুউল ফাতাওয়া ইবন তাইমিয়yah: ১৫/৪১৯
  • মাজমুউ ফাতাওয়া ইবন বায: ২১/৪২৩
  • ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব: ১২/৮৭-৯০
  • আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান: ৩/২৪৫
  • তাফসীর ইবন কাসীর: ৬/৪৮১
  • শারহু সহীহ মুসলিম: ১৪/১৫৪

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.