স্বপ্নে লাল চোখের প্রাণী ধাওয়া করা ও পানিতে ডুবে যাওয়ার ইসলামী ব্যাখ্যা।

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 6050
Questioner: Emon Hossain
Question Asked: 28 Sep 2026, 07:10 AM
Reviewed & Published: 28 Sep 2026, 07:31 AM
Views: 25
Tokens: 4,558
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার স্ত্রী ভোর ৪ টার দিকে আনুমানিক তার সপ্নে দেখে কিছু লাল রঙের চোখ অধিক সংখ্যক কিছু একটা তাকে ধাওয়া করছে। সে অনেক ভয় পেয়ে ঘুম থেকে উঠে অনেক কান্না করছিলো। আমি তাকে শান্ত করে ঘুম পারিয়ে দিয়ে তার কাছেই ছিলাম কিছু সময় পরে তাকে ডেকে তুলি সে আমাকে আবার বলে সে নাকি সপ্নে পানিতে ডুবে যাওয়া দেখছে। উল্লেখ : তার মাসিক চলছে।

Answer

স্বপ্নে লাল চোখের ভয় ও পানিতে ডুবে যাওয়ার দৃশ্য — ইসলামী দৃষ্টিকোণ

উত্তর:

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার, যিনি স্বপ্ন ও জাগরণের একমাত্র মালিক। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর উপর।

প্রথম কথা: স্বপ্নের প্রকারভেদ

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

الرُّؤْيَا ثَلَاثَةٌ: رُؤْيَا الصَّالِحَةُ بُشْرَى مِنَ اللَّهِ، وَرُؤْيَا تَحْزِينٌ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَرُؤْيَا مِمَّا يُحَدِّثُ الْمَرْءُ بِهِ نَفْسَهُ

"স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) সুসংবাদের সুস্বপ্ন যা আল্লাহর পক্ষ থেকে, (২) দুঃস্বপ্ন যা শয়তানের পক্ষ থেকে (দুশ্চিন্তা সৃষ্টির জন্য), (৩) এবং যা মানুষের নিজের মনের কল্পনা।"

— সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬৩; সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৯০

আপনার স্ত্রীর স্বপ্নটি দ্বিতীয় প্রকার — শয়তানি দুঃস্বপ্ন। এ ধরনের স্বপ্নের কোনো বাস্তব ব্যাখ্যা বা অশুভ পরিণতি নেই, ইনশাআল্লাহ।

দ্বিতীয় কথা: দুঃস্বপ্ন দেখলে করণীয়

রাসূলুল্লাহ (সা.) দুঃস্বপ্ন দেখার সময় নিম্নলিখিত আমল শিক্ষা দিয়েছেন:

إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يَكْرَهُهَا فَلْيَتْفُلْ عَنْ يَسَارِهِ ثَلَاثًا، وَلْيَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَلْيَتَحَوَّلْ عَنْ جَنْبِهِ الَّذِي كَانَ عَلَيْهِ

"যখন তোমাদের কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করে (শুষ্কভাবে), শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে, এবং যে কাত হয়ে ছিল তা পরিবর্তন করে।"

— সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬২

অন্য হাদীসে এসেছে:

وَلْيَقُمْ فَلْيُصَلِّ

"এবং সে যেন উঠে নামাজ পড়ে।"

— সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬৩

আমলসমূহ:

  1. বাম দিকে তিনবার শুষ্ক থুথু ফেলা
  2. أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ পড়া
  3. কাত পরিবর্তন করা
  4. সম্ভব হলে দুই রাকাত নামাজ পড়া
  5. কারও কাছে স্বপ্নের কথা না বলা (বিশেষত যারা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানে না)

وَلَا يُحَدِّثْ بِهَا أَحَدًا، فَإِنَّهَا لَنْ تَضُرَّهُ

"এবং সে যেন তা কাউকে না বলে; তাহলে তা তার কোনো ক্ষতি করবে না।"

— সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬৩

তৃতীয় কথা: মাসিক অবস্থায় স্বপ্ন দেখা

আপনার স্ত্রীর মাসিক চলছে — এটি স্বপ্নের ব্যাখ্যায় কোনো প্রভাব ফেলে না। হায়েজ অবস্থায় নারীর স্বপ্ন দেখা, কান্না করা বা ভয় পাওয়া — এসবের সাথে হায়েজের কোনো সম্পর্ক নেই। হায়েজ শুধু ইবাদত (নামাজ, রোজা, কুরআন স্পর্শ) সংক্রান্ত বিধান বহন করে, স্বপ্নের ব্যাখ্যার সাথে নয়।

তবে হায়েজ অবস্থায় দুঃস্বপ্ন দেখলে সে নিম্নলিখিত দুআ পড়তে পারবে (কুরআন তিলাওয়াত নয়, দুআ হিসেবে):

  • أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
  • اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ هَذَا الرُّؤْيَا

চতুর্থ কথা: লাল চোখ ও পানিতে ডুবে যাওয়ার ব্যাখ্যা

স্বপ্নের ব্যাখ্যা (তাবীর) একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র। সাধারণ মানুষ নিজে থেকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। ইমাম ইবন সীরীন (রহ.) বলেছেন, স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে হলে কুরআন, হাদীস, আরবি ভাষা ও সাহিত্যের গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

ইসলামী দৃষ্টিকোণে:

  • লাল চোখের প্রাণী ধাওয়া করা — এটি শয়তানি ওয়াসওয়াসা বা মনের ভয়ের প্রতিফলন। কোনো বাস্তব শত্রু বা অশুভ সংকেত নয়।
  • পানিতে ডুবে যাওয়া — অনেক সময় দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ বা পারিবারিক কোনো উদ্বেগের প্রতিফলন হয়ে থাকে। এটি মৃত্যু বা বিপদের পূর্বাভাস নয়।

ইমাম ইবন সীরীন (রহ.)-এর নীতি: দুঃস্বপ্নকে কখনো অশুভ লক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না; বরং তা শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় সৃষ্টির চেষ্টা।

পঞ্চম কথা: করণীয় ও বর্জনীয়

করণীয়:

  1. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়
  2. সকাল-সন্ধ্যা মাসনূন দুআ ও আয়াতুল কুরসি পড়া
  3. ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া
  4. بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا পড়ে ডান কাত হয়ে ঘুমানো
  5. স্ত্রীকে মানসিকভাবে শান্ত রাখা, দুশ্চিন্তা দূর করা

বর্জনীয়:

  1. স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো অশুভ ধারণা পোষণ করা
  2. স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য অজ্ঞ লোকের কাছে যাওয়া
  3. স্বপ্নকে কেন্দ্র করে পারিবারিক কলহ বা সন্দেহ সৃষ্টি করা
  4. স্বপ্নের কথা সবাইকে বলা

ষষ্ঠ কথা: ফিকহী দৃষ্টিকোণ (হানাফী মাযহাব)

ইমাম ইবন আবিদীন শামী (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে এবং তা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা সুন্নত। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৬০৪ — কিতাবুল রু'ইয়া)

মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানী-তে বলেন, দুঃস্বপ্নকে ভিত্তি করে কোনো অশুভ ভবিষ্যদ্বাণী করা বা কুফর-শিরকের দিকে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃ. ৩২৭)

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী জেওর-এ লিখেছেন, দুঃস্বপ্ন দেখলে বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে আউযুবিল্লাহ পড়বে এবং কাত পরিবর্তন করবে; এতে কোনো ক্ষতি হবে না। (বেহেশতী জেওর, স্বপ্ন সংক্রান্ত অধ্যায়)

সারসংক্ষেপ

আপনার স্ত্রীর স্বপ্নটি শয়তানি দুঃস্বপ্ন, কোনো বাস্তব অশুভ সংকেত নয়। মাসিক অবস্থার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। উপরে বর্ণিত সুন্নতি আমলগুলো করুন, নিয়মিত কুরআন-সুন্নাহর আমল বজায় রাখুন, এবং স্ত্রীকে আশ্বস্ত করুন যে ইনশাআল্লাহ কোনো ক্ষতি হবে না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

রেফারেন্স:

  • সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৯০
  • সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬২, ২২৬৩
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবন আবিদীন শামী), খণ্ড ৯
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানী), খণ্ড ১
  • বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
  • মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মাদ শাফী)

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.