মজা করে "আমি মুসলিম না" বা "আমি অর্ধেক শয়তান" বললে ঈমান চলে যায় কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
সে কি মুরতাদ হয়ে যাবে ?
তার বউয়ের সাথে সম্পর্ক (বিবাহ) নষ্ট হয়ে যাবে ?
আর করণীয় কি ?
বউ যদি ইদ্দত পালন না করে,স্বামী শুধু কলিমা পড়ে নেয় তাহলে কি বিবাহ সম্পর্ক ঠিক থাকবে ?
Answer
মজা করে কুফরি কথা বলা এবং ইদ্দত সম্পর্কিত মাসআলা
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
আপনার জিজ্ঞাসিত প্রশ্নগুলোর ফিকহী ফায়সালা ফিকহে হানাফীর নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের (যেমন: ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ও ফাতাওয়া মাহমুদিয়া) আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ নিচে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পেশ করা হলো:
১. মজা করে "আমি মুসলিম না, আমি অর্ধেক শয়তান" বললে ঈমান যাওয়ার ও মুরতাদ হওয়ার হুকুম:
- শরয়ী ফায়সালা: কোনো ব্যক্তি যদি কৌতুকবশত, পরিহাস করে বা মজা করেও বলে "আমি মুসলিম না" বা নিজেকে ইসলাম থেকে খারিজ দাবি করে, তবে শরীয়তের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার ঈমান চলে যায় এবং সে কাফের ও মুরতাদ হিসেবে গণ্য হয় [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৫৮–৫৯; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২০, ১৩০]।
- শরয়ী ব্যাখ্যা: ইসলামি আকীদা ও ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, কুফরী বাক্য (কালিমাহ-এ-কুফর) মুখে উচ্চারণ করার ক্ষেত্রে পরিহাস বা ঠাট্টাকে কোনো অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। অন্তরে যাই থাক, মুখে "আমি মুসলিম নই" বললে শরীআতের বাতেনী ও জাহেরী ফতোয়া অনুযায়ী লোকটির ঈমান নষ্ট হয়ে যায় [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২০]।
২. বউয়ের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক (নিকাহ) নষ্ট হওয়ার হুকুম:
- শরয়ী ফায়সালা: স্বামী বা স্ত্রীর মধ্য থেকে কেউ মুরতাদ হয়ে গেলে তাদের পূর্বের আকদে নিকাহ (বৈবাহিক সম্পর্ক) সাথে সাথেই ফাসখ বা বাতিল হয়ে যায় [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৭; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২১৪]।
- সম্পর্কের হুকুম: নিকাহ বাতিল হয়ে যাওয়ার পর উক্ত স্ত্রীর সাথে স্বামী-স্ত্রী সুলভ বসবাস বা মেলামেশা করা সম্পূর্ণ হারাম ও ব্যভিচার (যিনা) সমতুল্য কবিরা গুনাহ [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩০]।
৩. করণীয় এবং "শুধু কালিমা পড়লে বিবাহ ঠিক হবে কিনা" ও "ইদ্দত" সংক্রান্ত মাসআলা:
ক) শুধু কালিমা পড়লে কি বিবাহ ঠিক থাকবে?
না, শুধুমাত্র কালিমা পড়লে বৈবাহিক সম্পর্ক ঠিক হবে না বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসবে না [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২০, ১৩০]।
- পার্থক্য: তওবা করে কালিমা পাঠ করার দ্বারা কেবল লোকটির ঈমান নবায়ন (তাজদীদে ঈমান) হবে এবং সে পুনর্জন্ম লাভ করে মুসলমান হবে। কিন্তু স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বৈধ করার জন্য পৃথকভাবে 'তাজদীদে নিকাহ' (পুনর্বিবাহ) করা বাধ্যতামূলক [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২০]।
খ) বউয়ের ইদ্দত পালন করা লাগবে কি?
- একই স্বামীর সাথে পুনর্নিবন্ধনের ক্ষেত্রে: স্বামী তওবা করে পুনরার ইসলামে ফিরে আসার পর নিজের স্ত্রীর সাথে পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ (তাজদীদে নিকাহ) হতে চাইলে স্ত্রীকে ইদ্দত পার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৮–১৩৯; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২১৪]। তওবা ও ঈমান নবায়নের পর সাথে সাথেই নতুন করে নিকাহ পড়ে নেওয়া যায়।
গ) সঠিক ও সুনির্দিষ্ট শরয়ী করণীয়:
১. তাজদীদে ঈমান (ঈমান নবায়ন): উক্ত ব্যক্তিকে অনতিবিলম্বে নিজ ভুলের জন্য আল্লাহর দরবারে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে ইস্তিগফার করতে হবে এবং কালিমা (আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রসূলুহু) মুখে উচ্চারণ ও অন্তরে বিশ্বাস করে পুনরায় ইসলামে প্রবেশ করতে হবে [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২০]।
২. তাজদীদে নিকাহ (পুনর্বিবাহ): ঈমান নবায়নের পর দুইজন বালেগ মুসলিম পুরুষ সাক্ষী (অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী)-এর উপস্থিতিতে নতুন করে দেনমোহর ধার্য করে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরায় আকদে নিকাহ (বিবাহ) পড়াতে হবে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২০–২১; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩০]।
নতুন করে নিকাহ না পড়া পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে কোনো প্রকার স্বামী-স্ত্রী সুলভ মেলামেশা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৫৮–৫৯: (অধ্যায়: কিতাবুল জিহাদ, ৯ম পরিচ্ছেদ: أحكام المرتدين — কৌতুক বা ঠাট্টাচ্ছলে 'আমি মুসলিম নই' বললে কাফের ও মুরতাদ হওয়ার মাসআলা) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খন্ড), পৃষ্ঠা: ৫৮, ৫৯]।
২. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১২০ & ১৩০: (অধ্যায়: কিতাবুল আকাইদ, মা ইয়াতায়াল্লাকু বি-আলফাজিল কুফর — মুখ দিয়ে কুফরী বাক্য বের হলে তাজদীদে ঈমান ও তাজদীদে নিকাহ ওয়াজিব হওয়া এবং শুধু কালিমা পড়লে নিকাহ না ফেরার ফতোয়া) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২০, ১৩০]।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১১৭: (অধ্যায়: কিতাবুল আকাইদ, মা ইয়াতায়াল্লাকু বিল মুরতাদীন — স্বামী বা স্ত্রী মুরতাদ হওয়ার সাথে সাথে নিকাহ ফাসখ হওয়ার বিবরণ) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৭]।
৪. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২০–২১: (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ, ১ম পরিচ্ছেদ: নিকাহের শর্তাবলী — বালেগ মুসলিম সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব-কবুলের বাধ্যবাধকতা) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২০, ২১]।
- পৃষ্ঠা: ২১৪: (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ, ৫ম পরিচ্ছেদ — মুরতাদ হওয়ার পর একই স্বামীর সাথে পুনরায় নিকাহ করার ক্ষেত্রে স্ত্রীর ইদ্দত লাগা না লাগার মাসআলা) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২১৪]।
৫. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৫০ & ১৩৮–১৩৯: (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ, বাবুল ফাসাদ — তাজদীদে নিকাহ করার সঠিক পদ্ধতি ও রূপরেখা) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৫০, ১৩৮, ১৩৯]।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈমানের সাথে জীবনযাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।