মজা করে কুফরি বাক্য বললে ঈমান চলে যায় কি? "আমি মুসলিম না" বা "আমি অর্ধেক শয়তান" বললে কি মুরতাদ হয়? বিবাহ বন্ধন কি ভেঙে যায়? আহলে হাদীস মতানুসারে জানতে চাই?
Faith and Belief · Ahle Hadith / Salafi
Question
সে কি মুরতাদ হয়ে যাবে ?
তার বউয়ের সাথে সম্পর্ক (বিবাহ) নষ্ট হয়ে যাবে ?
Answer
মজা করে কুফরি বাক্য বলা এবং তার বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
কেউ যদি মজা করে বলে "আমি মুসলিম না" বা "আমি অর্ধেক শয়তান" — তাহলে কি তার ঈমান চলে যাবে? সে কি মুরতাদ হবে? তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ বন্ধন কি ভেঙে যাবে?
১. কুফরি বাক্য মজা করে বললেও ঈমান ভঙ্গ হয়
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ﴿٦٥﴾ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
"আর আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, তারা অবশ্যই বলবে: 'আমরা তো শুধু আলাপ-আলোচনা ও খেল-তামাশা করছিলাম।' বলুন: 'তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিলে? ওজর পেশ করো না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরি করে ফেলেছ।'"
— (সূরা আত-তাওবাহ: ৬৫-৬৬)
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: এই আয়াত প্রমাণ করে যে, কুফরি বাক্য মজা করে বা ঠাট্টা করে বললেও কুফরি হয় এবং ঈমান ভঙ্গ হয়। কারণ ঈমানের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও রাসূলের প্রতি সম্মান ও মহব্বত। (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৭/২৭৩)
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহ বা তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, সে কাফির — যদিও সে মজা করে বলে।" (মাদারিজুস সালিকীন)
২. "আমি মুসলিম না" বলা
এটি সরাসরি কুফরি বাক্য। কেননা এতে ইসলাম থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করা হয়। মজা করে বললেও এর বিধান একই — ঈমান ভঙ্গ হয়ে যায় এবং সে মুরতাদ হয়ে যায়।
শাইখ ইবনু বায (রহ.) বলেন: "যে ব্যক্তি মজা করে বা ঠাট্টা করে কুফরি বাক্য বলে, সে কাফির হয়ে যায়। কারণ ঈমানের ভিত্তি হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি সম্মান।" (ফাতাওয়া ইবনু বায)
৩. "আমি অর্ধেক শয়তান" বলা
এই বাক্যটির বিধান নির্ভর করে নিয়ত ও অর্থের উপর:
- যদি সে বিশ্বাস করে যে সে সত্যিই শয়তানের অংশ বা শয়তান তার মধ্যে বাস করে — এটি কুফরি।
- যদি সে শুধু মজা করে বলে যে "আমি খারাপ কাজ করি" বা "আমি শয়তানের মতো কাজ করি" — তবে এটি কুফরি নয়, বরং এটি গুনাহের স্বীকৃতি। তবে এমন কথা বলা উচিত নয়, কারণ এতে শয়তানের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করা হয়।
শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেন: "মানুষের কথার বিধান তার নিয়ত ও অর্থের উপর নির্ভর করে। যদি কেউ বিশ্বাস করে যে সে শয়তানের অংশ, তবে তা কুফরি। আর যদি শুধু মজা করে বলে, তবে তা কুফরি নয়, কিন্তু এমন কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত।" (শারহুল মুমতি')
৪. মুরতাদ হলে বিবাহ বন্ধনের বিধান
জমহুর ফুকাহাদের মত: যদি কোনো ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যায় (ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়), তাহলে তার বিবাহ বন্ধন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যায়।
দলিল:
وَلَا تُمْسِكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ
"আর তোমরা কাফির নারীদেরকে (বিবাহের) বন্ধনে ধরে রাখো না।"
— (সূরা আল-মুমতাহিনাহ: ১০)
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "মুরতাদ ব্যক্তির বিবাহ বন্ধন ভেঙে যায়, কারণ কাফিরের সাথে মুসলিমের বিবাহ বৈধ নয়।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩২/১৮৫)
শাইখ ইবনু বায (রহ.) বলেন: "যদি কোনো ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যায়, তাহলে তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ বন্ধন ভেঙে যায়। স্ত্রী ইদ্দত পালন করবে।" (ফাতাওয়া ইবনু বায)
তবে শর্ত হলো: মুরতাদ হওয়া প্রমাণিত হতে হবে — অর্থাৎ সে সচেতনভাবে, স্বেচ্ছায় কুফরি বাক্য বলেছে বা কুফরি বিশ্বাস পোষণ করেছে। শুধু সন্দেহ বা অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে মুরতাদ বলা যাবে না।
৫. তাওবার বিধান
যদি কেউ মজা করে বা ভুলে এমন কুফরি বাক্য বলে ফেলে, তাহলে তার উচিত:
- অবিলম্বে তাওবা করা — আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ঈমানের সাক্ষ্য (কালিমা) পুনরায় উচ্চারণ করা।
- ভবিষ্যতে এমন কথা না বলা — মুখকে কুফরি বাক্য থেকে হেফাজত করা।
- নেক আমল করা — তাওবার পর নেক আমল করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন।
إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَاعْتَصَمُوا بِاللَّهِ وَأَخْلَصُوا دِينَهُمْ لِلَّهِ فَأُولَٰئِكَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ
"তবে যারা তাওবা করে, সংশোধন করে, আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং আল্লাহর জন্য নিজেদের দ্বীনকে খাঁটি করে — তারা মুমিনদের সাথে থাকবে।"
— (সূরা আন-নিসা: ১৪৬)
শাইখ আল-আলবানী (রহ.) বলেন: "মুরতাদ যদি তাওবা করে, তবে তার ঈমান ফিরে আসে। কিন্তু বিবাহ বন্ধন পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে নতুন বিবাহ চুক্তি (নিকাহ) করতে হবে।" (সিলসিলাহ সহীহাহ)
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|------| | মজা করে "আমি মুসলিম না" বলা | কুফরি — ঈমান ভঙ্গ, মুরতাদ | | মজা করে "আমি অর্ধেক শয়তান" বলা | নিয়ত ও অর্থের উপর নির্ভরশীল; বিশ্বাস করলে কুফরি, শুধু মজা হলে কুফরি নয় | | মুরতাদ হলে বিবাহ | বন্ধন ভেঙে যায় | | তাওবা করলে | ঈমান ফিরে আসে, তবে নতুন নিকাহ করতে হবে |
সতর্কতা: কাউকে মুরতাদ বলা বা তার বিবাহ ভেঙে গেছে বলা প্রমাণ ছাড়া জায়েয নয়। শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে নয়। তবে যদি কেউ সচেতনভাবে কুফরি বাক্য বলে, তাহলে তার উচিত দ্রুত তাওবা করা এবং আলেমের পরামর্শ নেওয়া।