জীন-শয়তান ও কারীন জীনের অনিষ্ট থেকে মুক্তির কুরআন-হাদীসভিত্তিক আমল সম্পর্কে জানতে চাই?

Waswasa-OCD · Hanafi

Question No: 6033
Questioner: Md Polash Islam
Question Asked: 27 Sep 2026, 09:27 PM
Reviewed & Published: 27 Sep 2026, 09:42 PM
Views: 16
Tokens: 5,251
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম হুজুর,,,
মানুষের জন্মলগ্নো থেকেই সবার সাথে একটি করে কারীন জীন থাকে যা আমাদের সবসময় খারাপ কাজের ওয়াসঅয়াসা দিতে থাকে এবং আমাদের সঙ্গী হিসেবে আমাদের অতীতএর খবর জানে।
কবিরাজ, তান্ত্রিক অথবা যেকোনো জীন শীর্ক এর মাধ্যমে আমাদের কারীন জীন এর সাথে যোগাযোগ করতে পারে। এমন কি কোনো আমল আছে যা দ্বারা কেউ(মানুষ বা জীন) কখনো আমার সাথে থাকা কারীন জীন এর সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না অথবা আমার তথ্য তাদের কাছে যাবে না?

Answer

জীন-শয়তান থেকে মুক্তির উপায় এবং কারীন জীনের সাথে যোগাযোগ রোধের বিধান

উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন

প্রশ্নে উল্লেখিত ধারণাটি—"প্রত্যেক মানুষের সাথে একটি কারীন জীন থাকে এবং কবিরাজ/তান্ত্রিক তার মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে"—এটি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। বরং ইসলামী আকীদা অনুযায়ী বিষয়টি নিম্নরূপ:

১. কারীন জীনের অস্তিত্ব

হাদীসে কারীন জীনের অস্তিত্ব প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ وُكِّلَ بِهِ قَرِينُهُ مِنَ الْجِنِّ» "তোমাদের প্রত্যেকের সাথেই জীনদের মধ্য থেকে একজন কারীন (সঙ্গী) নিযুক্ত আছে।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮১৪

তবে কারীন জীন মানুষের গোপন তথ্য জানে না। সে শুধু ওয়াসওয়াসা দেয় এবং বাহ্যিকভাবে যা দেখে তা জানে। মানুষের অন্তরের গোপন কথা, অতীতের বিস্তারিত খবর—এসব সে জানে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:

«إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ» "নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও জমিনের গোপন বিষয় জানেন।" — সূরা ফাতির: ৩৮

২. কবিরাজ/তান্ত্রিকের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা

কবিরাজ, তান্ত্রিক বা জীন-শিরকের মাধ্যমে কারীন জীনের সাথে যোগাযোগের ধাবী শিরক ও হারাম। ইসলামে জীনদের কাছে সাহায্য চাওয়া, তাদের মাধ্যমে গোপন তথ্য জানার চেষ্টা—এসব সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন:

«وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِنَ الْإِنْسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا» "মানুষের মধ্যে কিছু লোক জীনদের কিছু লোকের কাছে আশ্রয় চাইত, ফলে তারা তাদের অহংকার বাড়িয়ে দিত।" — সূরা জিন: ৬

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে: "জীনদের কাছে সাহায্য চাওয়া, তাদের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বা গোপন তথ্য জানার চেষ্টা করা—এটি কুফর ও শিরক।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫২)

কারীন জীন ও শয়তানের অনিষ্ট থেকে বাঁচার আমল

নিম্নলিখিত আমলগুলো করলে ইনশাআল্লাহ কারীন জীন ও শয়তানের অনিষ্ট থেকে হেফাজত থাকবেন এবং কোনো জীন বা মানুষ আপনার গোপন তথ্য জানতে পারবে না:

১. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ قَرَأَ آيَةَ الْكُرْسِيِّ حِينَ يَأْوِي إِلَى فِرَاشِهِ لَمْ يَزَلْ عَلَيْهِ مِنَ اللَّهِ حَافِظٌ وَلَمْ يَقْرَبْهُ شَيْطَانٌ حَتَّى يُصْبِحَ» "যে ব্যক্তি রাতে শোবার সময় আয়াতুল কুরসি পড়বে, আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন হেফাজতকারী তার উপর নিযুক্ত থাকবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসতে পারবে না।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৩১১

২. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত

«مَنْ قَرَأَ بِالْآيَتَيْنِ مِنْ آخِرِ سُورَةِ الْبَقَرَةِ فِي لَيْلَةٍ كَفَتَاهُ» "যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়বে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫০০৯

৩. সকাল-সন্ধ্যা তিনবার মু'আওবিযাত (সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস) পড়া

«قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ... قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ... قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ» — সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস

হাদীসে এসেছে: "সকাল-সন্ধ্যা তিনবার এ সূরাগুলো পড়লে সব কিছু থেকে হেফাজতের জন্য যথেষ্ট হবে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৫০৮২)

৪. নিম্নোক্ত দুআ পাঠ করা

«أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ» "আমি আল্লাহর পূর্ণ কালেমাসমূহের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।"

«بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ» "আল্লাহর নামে, যাঁর নামের বরকতে জমিনে ও আসমানে কোনো কিছু ক্ষতি করতে পারে না, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।"

সকাল-সন্ধ্যা তিনবার পড়লে কোনো বিষাক্ত প্রাণী বা শয়তান ক্ষতি করতে পারবে না। (সুনানে তিরমিজি, হাদীস নং ৩৩৮৮)

৫. ঘরে সূরা বাকারা পাঠ করা

«لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ» "তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থান বানিও না। নিশ্চয়ই যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, শয়তান সে ঘর থেকে পালিয়ে যায়।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৮০

৬. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও যিকির

আল্লাহর যিকিরই শয়তানের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধক। আল্লাহ বলেন:

«إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا» "নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, সুতরাং তোমরা তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করো।" — সূরা ফাতির: ৬

৭. ঘরে প্রবেশের সময় ও খাবারের সময় বিসমিল্লাহ বলা

«إِذَا دَخَلَ الرَّجُلُ بَيْتَهُ فَذَكَرَ اللَّهَ عِنْدَ دُخُولِهِ وَعِنْدَ طَعَامِهِ، قَالَ الشَّيْطَانُ: لَا مَبِيتَ لَكُمْ وَلَا عَشَاءَ» "যখন কোনো ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করে এবং খাবারের সময় আল্লাহর নাম নেয়, শয়তান বলে: তোমাদের জন্য এখানে রাত্রি যাপন ও খাবার নেই।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০১৮

বিশেষভাবে আপনার প্রশ্নের উত্তর

প্রশ্ন: এমন কোনো আমল আছে যা দ্বারা কেউ (মানুষ বা জীন) আমার কারীন জীনের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না বা আমার তথ্য তাদের কাছে যাবে না?

উত্তর:

১. আপনার গোপন তথ্য কারীন জীন জানে না—এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। কারীন জীন শুধু ওয়াসওয়াসা দেয়, আপনার অন্তরের গোপন কথা বা বিস্তারিত অতীত সে জানে না। সুতরাং কবিরাজ আপনার তথ্য কারীন জীনের মাধ্যমে জানবে—এটি অসম্ভব।

২. কবিরাজ/তান্ত্রিকের কাছে যাওয়া সম্পূর্ণ হারাম ও কুফরি। তারা যা করে তা শিরক। তাদের কাছে যাওয়া, তাদের কথা বিশ্বাস করা—এসব ঈমান ধ্বংসকারী। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً» "যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করে, তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হয় না।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৩০

৩. হেফাজতের সর্বোত্তম আমল: উপরোক্ত আমলগুলো নিয়মিত করলে ইনশাআল্লাহ আপনি সম্পূর্ণ হেফাজতে থাকবেন। বিশেষভাবে:

  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায়
  • সকাল-সন্ধ্যা আয়াতুল কুরসি, মু'আওবিযাত ও দুআগুলো পড়া
  • ঘরে নিয়মিত সূরা বাকারা পাঠ
  • সব কাজে বিসমিল্লাহ বলা
  • ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি ও শেষ দুই আয়াত পড়া

৪. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) রাখা। আল্লাহ বলেন:

«وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ» "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" — সূরা তালাক: ৩

সতর্কতা

  • কবিরাজ, তান্ত্রিক, জীন-শীর্ক, তাবিজ-কবজ, জীনের কাছে সাহায্য চাওয়া—সবই শিরক ও হারাম। এগুলো থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
  • কেউ যদি বলে "আমি আপনার কারীন জীনের সাথে যোগাযোগ করেছি"—এটি মিথ্যা ও প্রতারণা। বিশ্বাস করবেন না।
  • ওয়াসওয়াসা বেশি হলে ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখিত পদ্ধতিতে চিকিৎসা নিন এবং আল্লাহর যিকির বাড়ান।

সারসংক্ষেপ

আপনার তথ্য কারীন জীনের কাছে যাওয়ার বিষয়টি ভিত্তিহীন। কবিরাজ/তান্ত্রিকের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও শিরক। উপরোক্ত কুরআন-হাদীসভিত্তিক আমলগুলো নিয়মিত করলে ইনশাআল্লাহ আপনি জীন-শয়তানের সব অনিষ্ট থেকে হেফাজতে থাকবেন। আল্লাহই সর্বোত্তম হেফাজতকারী।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.