পিতা মারা যাওয়ার পর বড় ছেলে মারা গেলে এবং তার স্ত্রী পুনরায় বিবাহ করলে সে সম্পত্তির কোনো অংশ পাবে কি না?
Family Life · Hanafi
Question
এখন প্রশ্ন হলো :
বড় ভাই তো মৃত, এবং তার বউও তো আবার বিয়ে করে নিছে। বড় ভাইয়ের কোনো ছেলে-মেয়েও নাই। এক্ষেত্রে তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী কি এই সম্পদের কোনো কিছু পাবে?
Answer
উত্তর: বড় ভাইয়ের স্ত্রী কি সম্পত্তির কোনো অংশ পাবে?
সংক্ষিপ্ত শরয়ী ফায়সালা:
হ্যাঁ, বড় ভাইয়ের স্ত্রী অবশ্যই তার মৃত স্বামীর অংশের সম্পত্তি থেকে তার শরয়ী হিস্যা (১/৪ অংশ) পাবেন [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ১৮, ৮০; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫২–১৫৪]।
পরবর্তীতে তিনি অন্যত্র বিবাহ আবদ্ধ হলেও ১ম স্বামীর মৃত্যুর সময় প্রাপ্ত মিরাস বা সম্পদের ওপর তার যে শরয়ী মালিকানা তৈরি হয়েছিল, তা কোনোভাবেই বাতিল বা খর্ব হয় না [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ১৮]। বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে বঞ্চিত করে সম্পূর্ণ সম্পত্তি কেবল ছোট ভাই ও মায়ের নামে নামজারি বা রেজিস্ট্রি করা শরীয়তের দৃষ্টিতে কঠিন কবিরা গুনাহ ও অন্যায্যভাবে অন্যের হক আত্মসাৎ (গসব) হিসেবে গণ্য হবে [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫০]।
বিস্তারিত শরয়ী বিশ্লেষণ ও বন্টননামা:
১. পিতার মৃত্যুর সময় মালিকানা বন্টন (২০২১ সাল):
ইসলামি শরীআতের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মারা গেলে সাথে সাথেই তার ত্যাজ্য সম্পত্তি জীবিত ওয়ারিশদের মাঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকানা হিসেবে ভাগ হয়ে যায় [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫০]। ২০২১ সালে পিতা মারা যাওয়ার সময় তার জীবিত ওয়ারিশ ছিলেন: ১. স্ত্রী (মা), ২. বড় ছেলে এবং ৩. ছোট ছেলে।
- তখন পিতার মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ (আট ভাগের এক ভাগ) পেয়েছেন স্ত্রী (মা), আর বাকি ৭/৮ অংশ দুই ভাইয়ের মাঝে সমান ভাগে (প্রতিজন ৭/১৬ অংশ করে) বন্টন হয়ে যায় [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ১৮, ২১]।
- ফলে বড় ভাই তার পিতার মৃত্যুর সাথে সাথেই পিতার মোট সম্পত্তির ৭/১৬ অংশের (প্রায় ৪৩.৭৫%) পূর্ণ শরয়ী মালিক হয়ে গিয়েছিলেন [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ১৮]।
২. বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির বন্টন (২০২২ সাল):
২০২২ সালে বড় ভাই যখন মারা যান, তখন তিনি সন্তানহীন ছিলেন। শরীয়তের দৃষ্টিতে তার ত্যাজ্য সম্পত্তি (যার মধ্যে তার অর্জিত পিতার ৭/১৬ অংশের মালিকানাও শামিল) তার জীবিত ওয়ারিশদের মাঝে বন্টন হবে [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ৮০]। তখন তার ওয়ারিশ ছিলেন: ১. স্ত্রী, ২. মা, এবং ৩. ছোট ভাই (সহোদর ভাই)।
- স্ত্রী পাবেন: ১/৪ অংশ (যেহেতু বড় ভাইয়ের কোনো সন্তান ছিল না) [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ১৮]।
- মা পাবেন: ১/৩ অংশ (তিন ভাগের এক ভাগ) [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ২৯]।
- ছোট ভাই (সহোদর ভাই) পাবেন: বাকি অংশ 'আসাবা' (عصبة) হিসেবে [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ৩৫]।
৩. স্ত্রীর পুনঃবিবাহের শরয়ী হুকুম (২০২৫ সাল):
স্বামী মারা যাওয়ার পর স্ত্রী যদি ইদ্দত শেষে অন্যত্র পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, তবে শরীআতের ফায়সালা অনুযায়ী প্রথম স্বামীর ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে তিনি যে ১/৪ অংশ পেয়েছিলেন, তার মালিকানা চিরস্থায়ী থাকে। পুনঃবিবাহ করার কারণে পূর্বের অর্জিত মিরাস বা সম্পত্তির মালিকানা কখনোই বাতিল হয় না [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ১৮]।
পিতার মূল সম্পত্তির চূড়ান্ত হিসাব (১৯২ ভাগের হিসাব):
পিতার রেখে যাওয়া সর্বমোট সম্পত্তিকে যদি ১৯২ ভাগ করা হয়, তবে শরয়ী হিসাব (মুনাসাখা) অনুযায়ী বন্টন হবে নিম্নরূপ:
১. ছোট ভাই পাবেন: ১১৯ ভাগ (পিতার মূল সম্পদ থেকে সরাসরি প্রাপ্ত ৮৪ ভাগ + বড় ভাইয়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত ৩৫ ভাগ) = প্রায় ৬১.৯৮%। ২. পিতার স্ত্রী (মা) পাবেন: ৫২ ভাগ (পিতার মূল সম্পদ থেকে সরাসরি প্রাপ্ত ২৪ ভাগ + বড় ভাইয়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত ২৮ ভাগ) = প্রায় ২৭.০৮%। ৩. বড় ভাইয়ের স্ত্রী পাবেন: ২১ ভাগ (বড় ভাইয়ের প্রাপ্য অংশের ১/৪ ভাগ) = প্রায় ১০.৯৪%।
(অর্থাৎ পিতার মোট সম্পত্তি থেকে বড় ভাইয়ের স্ত্রী স্পষ্টতঃ ২১/১৯২ অংশ বা প্রায় ১০.৯৪% এর পূর্ণ শরয়ী মালিক) [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ১৮, ৮০]।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. সিরাজী ফিল মিরাস (সিরাজী ফিল মীরাছ):
- পৃষ্ঠা: ১৮: (অধ্যায়: أحوال الزوجات — সন্তানহীন অবস্থায় স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর ১/৪ (এক-চতুর্থাংশ) মিরাস প্রাপ্তির বিবরণ) [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ১৮]।
- পৃষ্ঠা: ৩৫: (অধ্যায়: باب العصبات — ভাই আসাবা হিসেবে অবশিষ্ট সম্পত্তি পাওয়ার বিধান) [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ৩৫]।
- পৃষ্ঠা: ৮০–৮৩: (অধ্যায়: باب المناسخة — ওয়ারিশদের বন্টনের পূর্বে মৃত্যু হলে 'মুনাসাখা'র ফিকহী গাণিতিক নিয়মাবলী) [সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা: ৮০, ৮১, ৮২, ৮৩]।
২. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৫০: (অধ্যায়: কিতাবুল ফারায়িজ — পিতা বা মূল মালিকের মৃত্যুর সাথে সাথে ওয়ারিশদের মালিকানা সুনির্দিষ্ট হওয়া) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫০]।
- পৃষ্ঠা: ১৫২–১৫৪: (অধ্যায়: কিতাবুল ফারায়িজ — মৃত ভাইয়ের ত্যাজ্য সম্পদে তার স্ত্রীর শরয়ী অংশ ও পুনঃবিবাহের হুকুম) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫২, ১৫৩, ১৫৪]।
৩. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৬ষ্ঠ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৪৪৮–৪৫০: (অধ্যায়: কিতাবুল ফারায়িজ — ওয়ারিশদের মিরাছ বন্টন এবং গসব ও অন্যের হক না দেওয়ার ওপর কঠোর হুশিয়ারি) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৬ষ্ঠ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৪৪৮, ৪৪৯, ৪৫০]।
রেফারেন্স:
- সূরা আন-নিসা (৪:১১-১২)
- আল-হিদায়া, কিতাবুল ফারাইদ
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৭৬৮-৭৭২
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ৬, পৃ. ৪৫০
- ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩০-৩৩২
- আহকামুল কুরআন, খণ্ড ২, পৃ. ২৩০
- বাহিশতী জেওর, ওয়ারিশ অধ্যায়