ছেলের বউ হিসেবে স্বামীকে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করা এবং শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সদাচরণ ও ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছানোর ইসলামী পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাই?

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 6019
Questioner: Ayesha Humayra (222)
Question Asked: 27 Sep 2026, 05:48 PM
Reviewed & Published: 27 Sep 2026, 06:49 PM
Views: 14
Tokens: 4,195
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ছেলের বউ হিসেবে স্বামীকে পিতা মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে কিভাবে উদ্ভুদ্ধ করবো??
শ্বশুর শ্বাশুড়ির সাথে কি করলে আমার প্রতি তাদের ভালোবাসা বাড়বে ও তাদের কাছে ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছাতে পারবো??

Answer

ছেলের বউ হিসেবে স্বামীকে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করা এবং শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সদাচরণ

ভূমিকা

ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদের প্রতি "উফ" শব্দটিও বলতে নিষেধ করেছেন। একজন স্ত্রীর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যে সে তার স্বামীকে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করবে এবং উৎসাহিত করবে।


প্রথম অংশ: স্বামীকে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করার উপায়

১. কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দেওয়া

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"আর তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের মধ্যে একজন বা উভয়ে তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে পৌঁছে গেলে তাদের সাথে 'উফ' শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।" — (সূরা আল-ইসরা: ২৩)

"আর তাদের প্রতি ভালোবাসার সাথে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বলো: 'হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করুন যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।'" — (সূরা আল-ইসরা: ২৪)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে।" — (তিরমিযী: ১৮৯৯, সহীহ)

"যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতার সেবা করে, তার জন্য জান্নাতের দরজা খোলা থাকে।" — (তিরমিযী, সহীহ)

২. স্ত্রী হিসেবে করণীয়

ক) সরাসরি নির্দেশ না দিয়ে ভালোবাসার সাথে বোঝানো:

  • স্বামীকে কখনো পিতা-মাতার বিরুদ্ধে উসকানি দেবেন না
  • তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করুন
  • স্বামীকে বলুন: "আপনার আম্মু-আব্বুকে দেখতে যাবেন না? তারা আপনাকে মিস করছেন"
  • তাদের জন্য উপহার কিনতে উৎসাহিত করুন

খ) নিজে উদাহরণ স্থাপন করা:

  • নিজের পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করে দেখান
  • স্বামীর পিতা-মাতার সেবায় নিজে এগিয়ে আসুন
  • তাদের খোঁজ-খবর রাখুন, অসুস্থ হলে সেবা করুন

গ) পরিবারের পরিবেশ তৈরি করা:

  • শ্বশুর-শাশুড়িকে ঘরে আমন্ত্রণ জানান
  • তাদের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করুন
  • স্বামীকে তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে উৎসাহিত করুন

ঘ) ধৈর্য ও হিকমাহ অবলম্বন:

  • যদি শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে কোনো সমস্যা থাকে, সরাসরি অভিযোগ না করে ধৈর্য ধারণ করুন
  • স্বামীর সাথে শান্তভাবে আলোচনা করুন, কখনো রাগ বা অভিমান নয়

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করা এবং তাদের খেদমত করা সর্বোত্তম ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।"


দ্বিতীয় অংশ: শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সদাচরণ ও দাওয়াত

১. শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি ইসলামের নির্দেশনা

ইসলামে শ্বশুর-শাশুড়ি হলেন স্ত্রীর জন্য "মাহরাম" নয়, বরং তারা সম্মানিত আত্মীয়। তাদের সাথে সদাচরণ করা ইসলামের আদেশ।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"আর আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সদাচরণ করো..." — (সূরা আন-নিসা: ৩৬)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার আত্মীয়ের সাথে সদাচরণ করে।" — (বুখারী: ৫৯৮৫, মুসলিম: ৪৭)

২. শ্বশুর-শাশুড়ির ভালোবাসা বাড়ানোর উপায়

ক) সম্মান ও আদব রক্ষা করা:

  • তাদের সাথে সবসময় নম্র ও ভদ্র ভাষায় কথা বলা
  • তাদের সামনে উচ্চস্বরে কথা না বলা
  • তাদের পরামর্শ ও উপদেশ মনোযোগ দিয়ে শোনা
  • তাদের ডাকে সাড়া দেওয়া

খ) সেবা ও যত্ন:

  • তাদের জন্য খাবার তৈরি করা বা পরিবেশন করা
  • অসুস্থ হলে সেবা-শুশ্রূষা করা
  • তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দেওয়া
  • তাদের ঘর-বাড়ির কাজে সাহায্য করা

গ) উপহার ও ভালোবাসা:

  • ছোট ছোট উপহার দেওয়া (হাদীয়া)
  • তাদের পছন্দের জিনিস খেয়াল রাখা
  • তাদের সাথে সময় কাটানো, গল্প করা
  • তাদের প্রশংসা করা (সঠিকভাবে)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমরা পরস্পর উপহার বিনিময় করো, তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা বাড়বে।" — (আদাবুল মুফরাদ, হাসান)

ঘ) ধৈর্য ও ক্ষমা:

  • তাদের কোনো ভুল হলে ক্ষমা করা
  • কখনো তাদের সাথে তর্ক না করা
  • তাদের সমালোচনা স্বামীর সামনে না করা
  • তাদের জন্য দু'আ করা

৩. ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছানোর উপায়

ক) নিজের আচরণের মাধ্যমে দাওয়াত:

  • নিজে ইসলামের বিধান মেনে চলুন
  • নামায, রোযা, পর্দা ইত্যাদি সঠিকভাবে পালন করুন
  • তাদের দেখুন আপনার মধ্যে ইসলামের সৌন্দর্য

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে হিকমাহ ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াত দাও এবং তাদের সাথে সর্বোত্তম পন্থায় বিতর্ক করো।" — (সূরা আন-নাহল: ১২৫)

খ) হিকমাহ ও নম্রতার সাথে:

  • কখনো জোর করে কিছু চাপিয়ে দেবেন না
  • ধীরে ধীরে ইসলামের শিক্ষা পৌঁছান
  • তাদের প্রশ্নের উত্তর ধৈর্য ধরে দিন
  • কুরআনের আয়াত ও হাদীস শেয়ার করুন

গ) ভালো কাজের মাধ্যমে:

  • তাদের জন্য দু'আ করুন
  • তাদের উপকার করুন
  • তাদের সমস্যায় পাশে দাঁড়ান
  • তাদের সন্তানদের (আপনার স্বামীকে) ভালো কাজে উৎসাহিত করুন

ঘ) পারিবারিক পরিবেশ:

  • ঘরে ইসলামী পরিবেশ তৈরি করুন
  • কুরআন তিলাওয়াত শোনান
  • ইসলামী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান
  • ভালো আলেমদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন

শাইখ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"দাওয়াতের সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো নিজের আমল ও চরিত্রের মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়া।"


বিশেষ পরামর্শ

১. স্বামীর সাথে সম্পর্ক: স্বামীর সাথে ভালো সম্পর্ক রাখুন। সে যদি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে সে তার পিতা-মাতার প্রতিও দায়িত্ব পালনে উৎসাহী হবে।

২. অভিযোগ নয়, সমাধান: শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে কখনো অভিযোগ করবেন না। বরং সমাধানের পথ খুঁজুন।

৩. ধৈর্য: সব সম্পর্কে সময় লাগে। ধৈর্য ধারণ করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।

৪. দু'আ: আল্লাহর কাছে দু'আ করুন যেন তিনি সম্পর্কগুলোকে ভালো করে দেন।

"হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়াতে ও আখিরাতে কল্যাণ দান করুন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।" — (সূরা আল-বাকারা: ২০১)


উপসংহার

একজন মুসলিম স্ত্রীর জন্য সর্বোত্তম পথ হলো—স্বামীকে ভালোবাসা ও সম্মান করা, তার পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করা, শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সদাচরণ করা এবং নিজের আচরণ ও চরিত্রের মাধ্যমে ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছানো। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.