ছেলের বউ হিসেবে স্বামীকে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করা এবং শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সদাচরণ ও ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছানোর ইসলামী পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাই?
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
শ্বশুর শ্বাশুড়ির সাথে কি করলে আমার প্রতি তাদের ভালোবাসা বাড়বে ও তাদের কাছে ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছাতে পারবো??
Answer
ছেলের বউ হিসেবে স্বামীকে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করা এবং শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সদাচরণ
ভূমিকা
ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদের প্রতি "উফ" শব্দটিও বলতে নিষেধ করেছেন। একজন স্ত্রীর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যে সে তার স্বামীকে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করবে এবং উৎসাহিত করবে।
প্রথম অংশ: স্বামীকে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করার উপায়
১. কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দেওয়া
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আর তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের মধ্যে একজন বা উভয়ে তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে পৌঁছে গেলে তাদের সাথে 'উফ' শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।" — (সূরা আল-ইসরা: ২৩)
"আর তাদের প্রতি ভালোবাসার সাথে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বলো: 'হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করুন যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।'" — (সূরা আল-ইসরা: ২৪)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে।" — (তিরমিযী: ১৮৯৯, সহীহ)
"যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতার সেবা করে, তার জন্য জান্নাতের দরজা খোলা থাকে।" — (তিরমিযী, সহীহ)
২. স্ত্রী হিসেবে করণীয়
ক) সরাসরি নির্দেশ না দিয়ে ভালোবাসার সাথে বোঝানো:
- স্বামীকে কখনো পিতা-মাতার বিরুদ্ধে উসকানি দেবেন না
- তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করুন
- স্বামীকে বলুন: "আপনার আম্মু-আব্বুকে দেখতে যাবেন না? তারা আপনাকে মিস করছেন"
- তাদের জন্য উপহার কিনতে উৎসাহিত করুন
খ) নিজে উদাহরণ স্থাপন করা:
- নিজের পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করে দেখান
- স্বামীর পিতা-মাতার সেবায় নিজে এগিয়ে আসুন
- তাদের খোঁজ-খবর রাখুন, অসুস্থ হলে সেবা করুন
গ) পরিবারের পরিবেশ তৈরি করা:
- শ্বশুর-শাশুড়িকে ঘরে আমন্ত্রণ জানান
- তাদের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করুন
- স্বামীকে তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে উৎসাহিত করুন
ঘ) ধৈর্য ও হিকমাহ অবলম্বন:
- যদি শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে কোনো সমস্যা থাকে, সরাসরি অভিযোগ না করে ধৈর্য ধারণ করুন
- স্বামীর সাথে শান্তভাবে আলোচনা করুন, কখনো রাগ বা অভিমান নয়
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করা এবং তাদের খেদমত করা সর্বোত্তম ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।"
দ্বিতীয় অংশ: শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সদাচরণ ও দাওয়াত
১. শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি ইসলামের নির্দেশনা
ইসলামে শ্বশুর-শাশুড়ি হলেন স্ত্রীর জন্য "মাহরাম" নয়, বরং তারা সম্মানিত আত্মীয়। তাদের সাথে সদাচরণ করা ইসলামের আদেশ।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আর আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সদাচরণ করো..." — (সূরা আন-নিসা: ৩৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার আত্মীয়ের সাথে সদাচরণ করে।" — (বুখারী: ৫৯৮৫, মুসলিম: ৪৭)
২. শ্বশুর-শাশুড়ির ভালোবাসা বাড়ানোর উপায়
ক) সম্মান ও আদব রক্ষা করা:
- তাদের সাথে সবসময় নম্র ও ভদ্র ভাষায় কথা বলা
- তাদের সামনে উচ্চস্বরে কথা না বলা
- তাদের পরামর্শ ও উপদেশ মনোযোগ দিয়ে শোনা
- তাদের ডাকে সাড়া দেওয়া
খ) সেবা ও যত্ন:
- তাদের জন্য খাবার তৈরি করা বা পরিবেশন করা
- অসুস্থ হলে সেবা-শুশ্রূষা করা
- তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দেওয়া
- তাদের ঘর-বাড়ির কাজে সাহায্য করা
গ) উপহার ও ভালোবাসা:
- ছোট ছোট উপহার দেওয়া (হাদীয়া)
- তাদের পছন্দের জিনিস খেয়াল রাখা
- তাদের সাথে সময় কাটানো, গল্প করা
- তাদের প্রশংসা করা (সঠিকভাবে)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমরা পরস্পর উপহার বিনিময় করো, তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা বাড়বে।" — (আদাবুল মুফরাদ, হাসান)
ঘ) ধৈর্য ও ক্ষমা:
- তাদের কোনো ভুল হলে ক্ষমা করা
- কখনো তাদের সাথে তর্ক না করা
- তাদের সমালোচনা স্বামীর সামনে না করা
- তাদের জন্য দু'আ করা
৩. ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছানোর উপায়
ক) নিজের আচরণের মাধ্যমে দাওয়াত:
- নিজে ইসলামের বিধান মেনে চলুন
- নামায, রোযা, পর্দা ইত্যাদি সঠিকভাবে পালন করুন
- তাদের দেখুন আপনার মধ্যে ইসলামের সৌন্দর্য
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে হিকমাহ ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াত দাও এবং তাদের সাথে সর্বোত্তম পন্থায় বিতর্ক করো।" — (সূরা আন-নাহল: ১২৫)
খ) হিকমাহ ও নম্রতার সাথে:
- কখনো জোর করে কিছু চাপিয়ে দেবেন না
- ধীরে ধীরে ইসলামের শিক্ষা পৌঁছান
- তাদের প্রশ্নের উত্তর ধৈর্য ধরে দিন
- কুরআনের আয়াত ও হাদীস শেয়ার করুন
গ) ভালো কাজের মাধ্যমে:
- তাদের জন্য দু'আ করুন
- তাদের উপকার করুন
- তাদের সমস্যায় পাশে দাঁড়ান
- তাদের সন্তানদের (আপনার স্বামীকে) ভালো কাজে উৎসাহিত করুন
ঘ) পারিবারিক পরিবেশ:
- ঘরে ইসলামী পরিবেশ তৈরি করুন
- কুরআন তিলাওয়াত শোনান
- ইসলামী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান
- ভালো আলেমদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন
শাইখ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"দাওয়াতের সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো নিজের আমল ও চরিত্রের মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়া।"
বিশেষ পরামর্শ
১. স্বামীর সাথে সম্পর্ক: স্বামীর সাথে ভালো সম্পর্ক রাখুন। সে যদি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে সে তার পিতা-মাতার প্রতিও দায়িত্ব পালনে উৎসাহী হবে।
২. অভিযোগ নয়, সমাধান: শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে কখনো অভিযোগ করবেন না। বরং সমাধানের পথ খুঁজুন।
৩. ধৈর্য: সব সম্পর্কে সময় লাগে। ধৈর্য ধারণ করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
৪. দু'আ: আল্লাহর কাছে দু'আ করুন যেন তিনি সম্পর্কগুলোকে ভালো করে দেন।
"হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়াতে ও আখিরাতে কল্যাণ দান করুন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।" — (সূরা আল-বাকারা: ২০১)
উপসংহার
একজন মুসলিম স্ত্রীর জন্য সর্বোত্তম পথ হলো—স্বামীকে ভালোবাসা ও সম্মান করা, তার পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করা, শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সদাচরণ করা এবং নিজের আচরণ ও চরিত্রের মাধ্যমে ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছানো। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।