কুরআন ও সুন্নাহের ভিত্তিতে মা বাবার মর্যাদা ও গুরুত্ব জানতে চাই?

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 6017
Questioner: Ayesha Humayra (222)
Question Asked: 27 Sep 2026, 05:32 PM
Reviewed & Published: 27 Sep 2026, 05:40 PM
Views: 9
Tokens: 3,376
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কুরআন ও সুন্নাহের ভিত্তিতে মা বাবার মর্যাদা ও গুরুত্ব জানতে চাই?

Answer

কুরআন ও সুন্নাহের ভিত্তিতে মা-বাবার মর্যাদা ও গুরুত্ব

উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার, যিনি পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারকে তাঁর ইবাদতের পরেই স্থান দিয়েছেন। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপর।

মা-বাবার মর্যাদা ইসলামে অত্যন্ত সুউচ্চ। কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর অসংখ্য দলীল দ্বারা তা প্রমাণিত। নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:


১. কুরআনে মা-বাবার মর্যাদা

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়ে তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে পৌঁছলে তাদেরকে 'উফ' পর্যন্ত বলো না, তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।" (সূরা আল-ইসরা: ২৩)

"আর তাদের প্রতি মমতাবশত নিজেকে বিনয়ী করে রাখো এবং বলো: 'হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।'" (সূরা আল-ইসরা: ২৪)

"আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।" (সূরা আল-আনকাবূত: ৮)

"আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি; তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছেন..." (সূরা আল-আহকাফ: ১৫)

লক্ষণীয়: আল্লাহ তা'আলা এখানে তাওহীদ ও ইবাদতের নির্দেশের সাথে সাথেই পিতা-মাতার সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন — যা তাদের মর্যাদার সর্বোচ্চ প্রমাণ।


২. হাদীসে মা-বাবার মর্যাদা

(ক) মায়ের মর্যাদা সর্বাধিক

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলেন: "হে আল্লাহর রাসূল! আমার সদ্ব্যবহারের সর্বাধিক হকদার কে?" তিনি বললেন:

"তোমার মা।" লোকটি বলল: "তারপর কে?" তিনি বললেন: "তোমার মা।" লোকটি বলল: "তারপর কে?" তিনি বললেন: "তোমার মা।" লোকটি বলল: "তারপর কে?" তিনি বললেন: "তারপর তোমার বাবা।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৭১, সহীহ মুসলিম: ২৫৪৮)

(খ) জান্নাত মায়ের পায়ের নিচে — এর সহীহ ব্যাখ্যা

"জান্নাত মায়ের পায়ের নিচে" — এই কথাটি প্রসিদ্ধ হলেও এটি সহীহ সনদে বর্ণিত হাদীস নয়। তবে এর অর্থের সারমর্ম সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন:

এক ব্যক্তি নবী ﷺ-কে বলল: "আমি জিহাদে যেতে চাই।" তিনি জিজ্ঞাসা করলেন:

"তোমার মা কি জীবিত আছেন?" লোকটি বলল: "হ্যাঁ।" তিনি বললেন: "তাহলে তাঁর খিদমতে থাকো, কারণ জান্নাত সেখানেই।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৪৯ — সহীহ, শায়খ আলবানী)

(গ) পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:

"আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে।" (তিরমিযী: ১৮৯৯ — সহীহ, শায়খ আলবানী)

(ঘ) মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম

"সে ধ্বংস হোক! সে ধ্বংস হোক! সে ধ্বংস হোক — যে তার পিতা-মাতার একজন বা উভয়কে বার্ধক্য অবস্থায় পেল, অথচ (তাদের খিদমত করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৫১)


৩. মা-বাবার হক (শায়খগণের বক্তব্য অনুযায়ী)

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা ও তাদের সাথে সিলাহ-রাহমী (সম্পর্ক রক্ষা) করা ফরয; আর তাদের অবাধ্য হওয়া কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।" (মাজমূ'উল ফাতাওয়া: ১৪/২৯১)

শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"মায়ের হক পিতার হকের চেয়ে তিনগুণ বেশি — কারণ হাদীসে নবী ﷺ তিনবার 'তোমার মা' বলেছেন, অতঃপর 'তোমার বাবা' বলেছেন।" (শারহুল আরবাঈন আন-নাওয়াবিয়্যাহ)

শায়খ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"পিতা-মাতার আনুগত্য করা ওয়াজিব, তবে তা আল্লাহর অবাধ্যতার ক্ষেত্রে নয়। আল্লাহর অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মাজমূ'উ ফাতাওয়া ইবনে বায: ৯/২৯০)


৪. মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহারের ব্যবহারিক দিক

  1. তাদের সাথে নরম কথা বলা — কখনো 'উফ' শব্দও না বলা (সূরা ইসরা: ২৩)।
  2. তাদের খিদমত করা — বিশেষত বার্ধক্যে।
  3. তাদের জন্য দু'আ করা — "রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানী সাগীরা"।
  4. তাদের অনুমতি নিয়ে সফর/জিহাদে যাওয়া — সহীহ মুসলিমের হাদীস অনুযায়ী।
  5. তাদের মৃত্যুর পরেও সদ্ব্যবহার — তাদের জন্য দু'আ, ইস্তিগফার, ওয়াদা পূরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও তাদের বন্ধুদের সম্মান করা।

    নবী ﷺ বলেছেন: "মৃত্যুর পরেও সন্তান তার পিতা-মাতার জন্য দু'আ ও ইস্তিগফার করতে থাকে।" (সহীহ মুসলিম: ১৬৩১-এর অর্থ)


৫. সতর্কতা

  • পিতা-মাতার অবাধ্যতা (উকূকুল ওয়ালিদাইন) কবীরা গুনাহ — সহীহ বুখারী (৫৯৭৬) ও মুসলিমে (৮৭) বর্ণিত।
  • তবে শিরক বা হারাম কাজে তাদের আনুগত্য করা যাবে না; এ ক্ষেত্রে নম্রভাবে অস্বীকার করা, কিন্তু তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার না করা (সূরা লুকমান: ১৫)।

উপসংহার

মা-বাবার মর্যাদা ইসলামে তাওহীদের পরেই। তাদের সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাদের অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। মায়ের হক সর্বাধিক। তাদের খিদমত জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

ওয়াল্লাহু আ'লাম বিস-সাওয়াব।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.