হক বাতিল বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাচ্ছি
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
হক ও বাতিল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা
প্রশ্ন: হক ও বাতিল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد
ভূমিকা
‘হক’ (الحق) শব্দের অর্থ সত্য, ন্যায়, প্রতিষ্ঠিত, অপরিবর্তনীয়। আর ‘বাতিল’ (الباطل) শব্দের অর্থ মিথ্যা, অসত্য, বিনাশশীল, ভিত্তিহীন। ইসলামী পরিভাষায় হক হলো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আগত সত্য দ্বীন, সঠিক আকীদা, বৈধ বিধান ও ন্যায়পূর্ণ পথ। আর বাতিল হলো শয়তান ও নফসের পক্ষ থেকে আগত ভ্রষ্টতা, কুফর-শিরক, বিদআত ও অন্যায় পথ।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন:
وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ ۚ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا “বলুন, হক এসে গেছে এবং বাতিল বিলীন হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই বাতিল বিলীন হওয়ারই যোগ্য।” (সূরা বনী ইসরাইল: ৮১)
بَلْ نَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَى الْبَاطِلِ فَيَدْمَغُهُ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٌ “বরং আমি হককে বাতিলের উপর নিক্ষেপ করি, ফলে তা বাতিলকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়, তখনই তা বিলীন হয়ে যায়।” (সূরা আম্বিয়া: ১৮)
১. হকের পরিচয় ও প্রকারভেদ
হক মূলত তিন প্রকার:
(ক) হকুল্লাহ (আল্লাহর হক): আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাওহীদ, রিসালাতের স্বীকৃতি, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদত। এগুলো আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত হক।
(খ) হকুল ইবাদ (বান্দার হক): মানুষের জান-মাল, ইজ্জত-সম্মান, আমানত, প্রতিবেশীর হক, আত্মীয়ের হক, স্ত্রী-সন্তানের হক ইত্যাদি।
(গ) হকুন নফস (নিজের হক): নিজের শরীর, আত্মা ও ইহ-পরকালীন কল্যাণের প্রতি দায়িত্ব পালন।
হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
إِنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، فَأَعْطِ كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ “নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালকের তোমার উপর হক আছে, তোমার নিজের উপর হক আছে, তোমার পরিবারের উপর হক আছে। সুতরাং প্রত্যেক হকদারকে তার হক দাও।” (সহীহ বুখারী: ১৯৬৮)
২. বাতিলের পরিচয় ও প্রকারভেদ
বাতিল মূলত দুই প্রকার:
(ক) আকীদাগত বাতিল: শিরক, কুফর, নাস্তিক্যবাদ, মূর্তিপূজা, পীর-ফকিরকে আল্লাহর সমতুল্য মনে করা, গায়েব জানার দাবি, তাওয়াসসুলের ভুল ব্যাখ্যা ইত্যাদি।
(খ) আমলগত বাতিল: বিদআত, হারাম উপার্জন, সুদ, ঘুষ, জুয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য, প্রতারণা, গীবত, পরনিন্দা ইত্যাদি।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ “তোমরা হককে বাতিলের সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জেনে-বুঝে হক গোপন করো না।” (সূরা বাকারা: ৪২)
৩. হক ও বাতিলের পার্থক্য নির্ণয়ের মানদণ্ড
হক ও বাতিল চেনার মূল মানদণ্ড চারটি:
১. কুরআন: আল্লাহর কালাম চূড়ান্ত সত্যের মানদণ্ড। ২. সুন্নাহ: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কথা, কাজ ও অনুমোদন। ৩. ইজমা: উম্মতের মুজতাহিদ ইমামগণের ঐকমত্য। ৪. কিয়াস: কুরআন-সুন্নাহর আলোকে যুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর উসূল অনুযায়ী, কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলীল ছাড়া কোনো বিষয়কে হক বলা যায় না। ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’-তে উল্লেখ করেন, হক ও বাতিলের পার্থক্য নির্ণয়ে ইজমা ও সুন্নাহর অনুসরণ অপরিহার্য।
৪. হক ও বাতিলের সংঘর্ষ চিরন্তন
আদম (আ.) থেকে আজ পর্যন্ত হক ও বাতিলের সংঘর্ষ চলছে। নূহ (আ.), ইব্রাহীম (আ.), মূসা (আ.), ঈসা (আ.) এবং সর্বশেষ মুহাম্মদ ﷺ সবাই হকের পক্ষে ছিলেন, আর তাদের বিরোধীরা ছিল বাতিলের পক্ষে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ “আমি মানুষের মধ্যে দিনগুলো পালাক্রমে ঘুরিয়ে থাকি।” (সূরা আলে ইমরান: ১৪০)
অর্থাৎ কখনো হক, কখনো বাতিলের আধিপত্য দেখা যায়—এটি আল্লাহর পরীক্ষা। কিন্তু চূড়ান্ত বিজয় সর্বদা হকেরই।
৫. হক ও বাতিলের প্রতি মুসলিমের কর্তব্য
১. হককে জানা ও মানা: ইলম অর্জন করা ফরজ। ইমাম গাজালী (রহ.) ‘ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন’-এ বলেন, ইলম ছাড়া ইবাদত অন্ধকারে পথ চলার মতো।
২. বাতিল পরিত্যাগ করা: বাতিলকে দৃঢ়ভাবে বর্জন করা।
৩. হকের পক্ষে অবস্থান নেওয়া: সত্য কথা বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা।
৪. সন্দেহপূর্ণ বিষয় এড়ানো: হাদীসে আছে—
دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ “যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে তা ছেড়ে যা সন্দেহমুক্ত তা গ্রহণ করো।” (তিরমিযী: ২৫১৮)
৫. আহলে হক ওলামায়ে কেরামের অনুসরণ: ফিকহী মাসআলায় হানাফী মাযহাবের অনুসরণ, আকীদায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পথ।
৬. হানাফী ফিকহে হক-বাতিলের ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত
- হক: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা, হজ, যাকাত, বিবাহ, ব্যবসায় শরীয়তসম্মত লেনদেন।
- বাতিল: সুদভিত্তিক ব্যাংকিং, ঘুষ, মিথ্যা সাক্ষ্য, তালাকের অপব্যবহার, বিদআতী মিলাদ-কিয়াম, শবে বরাতে নির্দিষ্ট পদ্ধতির বিদআত ইত্যাদি।
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ বলেন, বিদআতী আমল হক হিসেবে গণ্য নয়, যদিও তা ইবাদতের নামে করা হয়।
৭. হক ও বাতিল চেনার জন্য প্রয়োজনীয় ইলম
- আকীদা: আকীদাতুত তহাবিয়া, ফিকহুল আকবার।
- ফিকহ: কুদূরী, হেদায়া, রাদ্দুল মুহতার।
- তাসাউফ: ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, মাকতুবাত ইমাম রাব্বানী।
- ফতোয়া: ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ফতোয়ায়ে উসমানী, ইমদাদুল ফতোয়া।
উপসংহার
হক হলো আল্লাহর পথ, যা কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মত দ্বারা প্রমাণিত। বাতিল হলো শয়তানের পথ, যা কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত। প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব হলো ইলম অর্জন করে হককে চেনা, বাতিল বর্জন করা এবং হকের পক্ষে অবিচল থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হকের উপর অবিচল রাখুন এবং বাতিল থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
والله أعلم بالصواب