সন্তানের মৃত্যুতে সবর, শোক ও আল্লাহর ফয়সালাতে সন্তুষ্ট থাকার বিধান ও পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাই?

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 6005
Questioner: Rakib's Noor
Question Asked: 27 Sep 2026, 11:07 AM
Reviewed & Published: 27 Sep 2026, 12:19 PM
Views: 9
Tokens: 6,297
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম
আমার মেয়ে জন্মের একদিন পর মারা যায়। আমরা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট, কোনো অভিযোগ করি না, সবর করার চেষ্টা করি তবে ডেলিভারির সময়ে করা ভুলত্রুটির জন্য খালি আফসোস করে ফেলি, মনের মধ্যে খালি চিন্তা আসে যে এমন করলে এমন হতো, আল্লাহ চাইলে দিতে পারতেন, আর মেয়ে বেচে থাকলে এমন হতো, ওমন হতো,, এগুলা বলে ফেলি শোক থেকে। আর মেয়ের জন্য কলিজা ছিড়ে,কান্না করি,,,একবার ভাবি এটা আল্লাহর পরিক্ষা আবার মনে হয় আল্লাহ অসন্তুষ্ট তাই আমাদের দেয়া নেয়ামত নিয়ে গেছেন। (কিন্তু আল্লাহ এমন কেনো করলেন বা আমাদের কপাল খারাপ এই ধরনের কিছুই বলি না আল্লাহুম্মাগফিরলি)আমরা জানি আল্লাহর ফয়সালাই উত্তম আমাদের জন্য। এখন এরকম কথা, চিন্তার জন্য আল্লাহ কি অসন্তুষ্ট হবেন? আমাদের গুনাহ হবে?

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই আপনার প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। আল্লাহ তা'আলা আপনার কন্যার মাধ্যমে আপনার জন্য জান্নাতে একটি সুপারিশকারী রেখে দিয়েছেন — ইনশাআল্লাহ। আপনার প্রশ্নের উত্তর কয়েকটি অংশে দিচ্ছি:


১. সন্তানের মৃত্যুতে সবর করা — এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

"আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা। আর সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।" — সূরা আল-বাকারা: ১৫৫

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: "মুসিবত নিজে থেকে কোনো শাস্তি নয়; বরং তা পরীক্ষা, যা দ্বারা আল্লাহ বান্দার সবর ও ঈমান যাচাই করেন।" (মাজমুউল ফাতাওয়া)


২. আপনার কন্যা ইনশাআল্লাহ জান্নাতে আপনার জন্য সুপারিশ করবে

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: يَا ابْنَ آدَمَ، إِنْ صَبَرْتَ وَاحْتَسَبْتَ عِنْدَ الصَّدْمَةِ الْأُولَى لَمْ أَرْضَ لَكَ ثَوَابًا دُونَ الْجَنَّةِ

"আল্লাহ তা'আলা বলেন: হে আদম-সন্তান! যদি তুমি প্রথম আঘাতের সময় সবর করো এবং সওয়াবের আশা করো, তবে আমি জান্নাত ছাড়া অন্য কোনো প্রতিদান দিয়ে সন্তুষ্ট হব না।" — সুনান ইবনু মাজাহ: ১৫৯৭ (শাইখ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন)

আরেকটি হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন:

مَا مِنْ مُسْلِمَيْنِ يُتَوَفَّى لَهُمَا ثَلَاثَةٌ مِنَ الْوَلَدِ لَمْ يَبْلُغُوا الْحِنْثَ إِلَّا أَدْخَلَهُمَا اللَّهُ الْجَنَّةَ

"যে কোনো মুসলিম দম্পতির তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান মারা গেলে আল্লাহ তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।" — সহীহ মুসলিম: ২৬৩৫


৩. "এমন হলে এমন হতো" — এই ধরনের চিন্তা সম্পর্কে

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ فَلَا تَقُلْ: لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا، وَلَكِنْ قُلْ: قَدَّرَ اللَّهُ وَمَا شَاءَ فَعَلَ، فَإِنَّ لَوْ تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ

"যদি তোমার কোনো ক্ষতি হয়, তবে বলো না: 'যদি আমি এমন করতাম, তাহলে এমন হতো।' বরং বলো: 'আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন।' কারণ 'যদি' (لو) শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়।" — সহীহ মুসলিম: ২৬৬৪

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: "'লাও' (যদি) বলা শয়তানের প্রবেশদ্বার, কারণ এটি আল্লাহর কাদার (তাকদীর) প্রতি অসন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যায়।" (শিফাউল আলীল)

তবে — আপনি যদি শোকে আচ্ছন্ন হয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন কথা বলে ফেলেন, তবে তা গুনাহ নয়, ইনশাআল্লাহ। কারণ রাসূল ﷺ বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ

"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের কুমন্ত্রণা ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না সে তা আমলে পরিণত করে বা মুখে বলে।" — সহীহ বুখারী: ৫২৬৯


৪. শাইখ ইবনু উসাইমীন-এর বক্তব্য

শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"মুসিবতের সময় বান্দার উচিত আল্লাহর কাদারে সন্তুষ্ট থাকা এবং 'লাও' (যদি) বলা থেকে বিরত থাকা। কেননা 'লাও' শয়তানের প্রবেশদ্বার। তবে যদি কেউ শোকের তীব্রতায় অনিচ্ছাকৃতভাবে বলে ফেলে, তবে তাকে তাওবা করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।" — (শারহু রিয়াদুস সালিহীন)


৫. আপনার কান্না ও শোক সম্পর্কে

কান্না করা নিষিদ্ধ নয় — রাসূল ﷺ নিজেও সন্তানের মৃত্যুতে কেঁদেছিলেন:

إِنَّ الْعَيْنَ تَدْمَعُ، وَالْقَلْبَ يَحْزَنُ، وَلَا نَقُولُ إِلَّا مَا يَرْضِي رَبَّنَا

"চোখ অশ্রু ঝরায়, হৃদয় দুঃখিত হয়, কিন্তু আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা ছাড়া কিছু বলি না।" — সহীহ বুখারী: ১৩০৩

তবে নিষিদ্ধ হলো — উচ্চস্বরে বিলাপ করা, গাল-মুখ চাপড়ানো, চিৎকার করা, আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা।


৬. "আল্লাহ অসন্তুষ্ট তাই নিয়ামত নিয়ে গেছেন" — এই চিন্তা কি ঠিক?

এটি ঠিক নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ ۚ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

"আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো মুসিবত আসে না। আর যে আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে, আল্লাহ তার হৃদয়কে হেদায়েত দেন।" — সূরা আত-তাগাবুন: ১১

শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: "মুসিবত কখনো আল্লাহর অসন্তুষ্টির প্রমাণ নয়; বরং তা হতে পারে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম, গুনাহ মোচনের উপায়, অথবা পরীক্ষা।" (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনু বায)


৭. আপনার করণীয়

| করণীয় | বর্জনীয় | |--------|---------| | إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ পড়া | "লাও" (যদি) বলা | | সবর করা ও সওয়াবের আশা করা | আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ | | সন্তানের জন্য দুআ করা | উচ্চস্বরে বিলাপ | | আল্লাহর কাদারে সন্তুষ্ট থাকা | "কপাল খারাপ" জাতীয় কথা | | সদকা করা সন্তানের নামে | শোকে আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দেওয়া |


৮. চূড়ান্ত উত্তর

আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:

  1. শোকে কান্না করা, কলিজা ছিঁড়ে কাঁদা — এটি গুনাহ নয়, বরং স্বাভাবিক মানবিক আবেগ। রাসূল ﷺ নিজে কেঁদেছেন।

  2. "এমন হলে এমন হতো" বলা — এটি শয়তানের প্রবেশদ্বার। তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে বলে ফেললে গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ। তবে সচেতনভাবে এড়িয়ে চলুন এবং বলুন: "قَدَّرَ اللَّهُ وَمَا شَاءَ فَعَلَ"।

  3. "আল্লাহ অসন্তুষ্ট তাই নিয়ামত নিয়েছেন" — এই চিন্তা ভুল। আল্লাহর ফয়সালা সর্বদা উত্তম। তিনি যা নিয়েছেন, তার বিনিময়ে জান্নাতে উত্তম কিছু দেবেন ইনশাআল্লাহ।

  4. আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন কি? — যদি আপনি সবর করেন, সন্তুষ্ট থাকেন, এবং "লাও" বলা থেকে বিরত থাকেন, তবে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন এবং আপনার প্রতিদান জান্নাত হবে ইনশাআল্লাহ।


দুআ

اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا

"হে আল্লাহ! আমার মুসিবতে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর চেয়ে উত্তম কিছু আমাকে দিন।" — সহীহ মুসলিম: ৯১৮

আল্লাহ আপনার সবরকে কবুল করুন, আপনার কন্যার মাধ্যমে জান্নাতে আপনার মর্যাদা বাড়িয়ে দিন, এবং আপনার হৃদয়কে শান্তি দান করুন। আমিন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.