সন্তানের হক সমান ভাবে বন্টনে মা বাবার করনীয়

Family Life · Hanafi

Question No: 5993
Questioner: Humaira akter
Question Asked: 26 Sep 2026, 10:52 PM
Reviewed & Published: 26 Sep 2026, 11:00 PM
Views: 30
Tokens: 7,726
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম
আমার বিয়ে হয়েছে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। বিয়ের পর থেকেই আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ি এক ছোট্ট রুমে আমাদের থাকতে দিয়েছে।কোনমতে এক খাট বসিয়ে আরেকটা ছোটখাটো ওয়ারড্রব ধরেছে এমন। আমি নামাজ পরলে জায়নামাজ এর কিছু অংশ খাটের ভিতরে থাকে।আর এত গরম এই রুমে। গরমে পাগল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় আমার। ৪ বছর ধরে আমি এই রুমেই ধৈর্য্য ধরে আছি। আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ি ঠিকই বড় রুমে থাকে ইভেন আমার ভাসুরকে আরও বড় রুম দিয়েছে। আমাদের রুমের ডাবল এমন।আমার শ্বশুর শ্বাশুড়িকে প্রত্যেকটা জিনিসে আমার হাজব্যন্ডকে গুরুত্ব দেয়না। বা তাকে সমান ভাবে কোন কিছুই দেয়না। আমি এইটা সব সময়ই খেয়াল করেছি। সে তাদের অনুগত বেশি। কিন্তু তাকেই তারা কম ভালোবাসে। এবং হক ও সমান ভাবে দেয়না। সেই ছেলেকে ব্যবসার জন্যও টাকা দিয়ে রেখেছে, মেয়েকেও দিয়েছে কিন্তু আমার হাজব্যন্ডকে দেয়নি।এগুলো বললে তারা খুব বিশ্রী ভাষা প্রয়োগ করে। তাদের সামর্থ্য আছে তাই বলেছিলাম আরেকটা বড় রুম আমাদের করে দিতে অনেক বলে কয়ে রাজি করিয়েছি আমরা। রাজি হয়েছেও। এখন অস্বীকার করে, যে তারা এমন কিছু বলেয়নি।
এইযে তারা এমন করে সবকিছু সমান ভাবে বন্টন করেনা এতে কি তাদের গুনাহ হচ্ছেনা?

Answer

সন্তানদের মধ্যে সমান আচরণ ও ন্যায়বিচার: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামী দৃষ্টিতে এর স্পষ্ট উত্তর রয়েছে। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


১. সন্তানদের মধ্যে সমান আচরণের বিধান

হাদীসের ভিত্তি

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

اتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ

"আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।"

— সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫৮৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬২৩

আরেকটি হাদীসে এসেছে, নু'মান ইবনে বশীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত:

أَعْطَانِي أَبِي عَطِيَّةً، فَقَالَتْ أُمِّي عَمْرَةُ بِنْتُ رَوَاحَةَ: لَا أَرْضَى حَتَّى تُشْهِدَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ، فَأَتَى رَسُولَ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ: إِنِّي أَعْطَيْتُ ابْنِي مِنْ عَمْرَةَ بِنْتِ رَوَاحَةَ عَطِيَّةً، وَإِنَّهَا أَمَرَتْنِي أَنْ أُشْهِدَكَ، فَقَالَ: أَعْطَيْتَ سَائِرَ وَلَدِكَ مِثْلَ هَذَا؟ قَالَ: لَا، قَالَ: فَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ

"আমার পিতা আমাকে একটি দান দিলেন। আমার মা আমরাহ বিনতে রাওয়াহা বললেন: আমি সন্তুষ্ট হবো না যতক্ষণ না আপনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সাক্ষী বানান। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে বললেন: আমি আমার ছেলেকে একটি দান দিয়েছি... তিনি ﷺ জিজ্ঞেস করলেন: তুমি তোমার অন্য সন্তানদেরও কি এ রকম দিয়েছো? তিনি বললেন: না। তখন রাসূল ﷺ বললেন: আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।"

— সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫৮৭

হানাফী ফিকহের অবস্থান

ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:

يُسْتَحَبُّ لِلْأَبِ أَنْ يُسَوِّيَ بَيْنَ أَوْلَادِهِ فِي الْعَطِيَّةِ، وَلَا يُفَضِّلُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ

"পিতার জন্য মুস্তাহাব হলো সন্তানদের মধ্যে দানে সমতা রক্ষা করা এবং এককে অন্যের উপর প্রাধান্য না দেওয়া।"

— ফাতাওয়া আলমগীরী, কিতাবুল হিবা, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৯১

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন:

وَالْعَدْلُ بَيْنَ الْأَوْلَادِ فِي الْعَطِيَّةِ مُسْتَحَبٌّ عِنْدَ عَامَّةِ الْعُلَمَاءِ، وَقِيلَ: وَاجِبٌ

"সন্তানদের মধ্যে দানে ইনসাফ করা সাধারণ আলেমদের মতে মুস্তাহাব, আর কারো মতে ওয়াজিব।"

— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৬৯৬


২. আপনার পরিস্থিতির বিশ্লেষণ

ক) থাকার ব্যবস্থা ও সমান আচরণ

আপনার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি যদি সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করে থাকেন — যেমন ভাসুরকে বড় রুম দেওয়া, আপনার স্বামীকে ছোট রুমে রাখা — তবে এটি ইসলামী দৃষ্টিতে অন্যায় ও গুনাহের কাজ। কেননা:

  1. হাদীসে স্পষ্ট নির্দেশ — সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করতে বলা হয়েছে।
  2. হানাফী ফিকহ — ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

لَا يَجُوزُ لِلْأَبِ أَنْ يُفَضِّلَ بَعْضَ وَلَدِهِ عَلَى بَعْضٍ فِي الْعَطِيَّةِ إِلَّا لِعُذْرٍ

"পিতার জন্য জায়েয নয় কোনো সন্তানকে অন্য সন্তানের উপর দানে প্রাধান্য দেওয়া, তবে কোনো ওজর থাকলে ভিন্ন কথা।"

— শারহু মা'আনিল আছার, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৩৫

খ) ব্যবসার টাকা দেওয়া ও না দেওয়া

আপনার শ্বশুর যদি এক ছেলেকে ব্যবসার জন্য টাকা দেন, মেয়েকে দেন, কিন্তু আপনার স্বামীকে না দেন — তবে এটি স্পষ্ট বৈষম্য। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়:

  • যদি সব সন্তানকে সমান না দেন, তবে এটি গুনাহের কাজ।
  • তবে যদি কোনো সন্তানকে বেশি দেন কোনো বৈধ কারণে (যেমন: বেশি অভাবী, বেশি দ্বীনদার, বা বিশেষ প্রয়োজন), তবে ফিকহের কিছু আলেম এটিকে জায়েয বলেছেন — তবে তা সন্তানের মধ্যে প্রকাশ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করলে তা মাকরূহ।

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে মুফতি আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) বলেন:

"সন্তানদের মধ্যে সমান আচরণ করা কর্তব্য। যদি কেউ কোনো সন্তানকে বেশি দেয়, তবে তা সন্তানদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে, যা নাজায়েয।"

— ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৮৫

গ) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা

আপনার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি বড় রুম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে অস্বীকার করেছেন। ইসলামে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা একটি গুরুতর অপরাধ:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো।"

— সূরা মায়িদা, আয়াত ১

وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا

"আর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো, নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।"

— সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত ৩৪


৩. আপনার করণীয়

ক) ধৈর্য ধারণ করা

আপনি ৪ বছর ধৈর্য ধরে আছেন — এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ

"নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান বেহিসাব দেওয়া হবে।"

— সূরা যুমার, আয়াত ১০

খ) স্বামীর সাথে পরামর্শ

আপনার স্বামীকে ইসলামী দৃষ্টিতে বুঝান যে, পিতামাতার সেবা করা ফরজ, কিন্তু অন্যায় বৈষম্য মেনে নেওয়া জরুরি নয়। তিনি যদি পিতামাতার অনুগত হন, তবে তা সন্তানের দায়িত্ব — কিন্তু পিতামাতার উচিত সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করা।

গ) সরাসরি অভিযোগ না করা

শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সাথে বিশ্রী ভাষায় কথা বলা বা সরাসরি অভিযোগ করা পরিস্থিতি আরও খারাপ করবে। বরং ধৈর্য, দোয়া ও হিকমতের সাথে সমাধানের চেষ্টা করুন।

ঘ) আলাদা থাকার চেষ্টা

যদি সম্ভব হয়, স্বামীর সাথে পরামর্শ করে আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করুন। ইসলামে স্ত্রীর জন্য আলাদা ঘর পাওয়ার অধিকার রয়েছে:

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

"আর তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।"

— সূরা নিসা, আয়াত ১৯

ফাতাওয়া উসমানী-তে মুফতি তাকী উসমানী (দাঃবাঃ) বলেন:

"স্ত্রীর জন্য স্বামীর ঘরে আলাদা কক্ষ থাকা তার হক। যদি যৌথ পরিবারে থাকার কারণে তার হক ক্ষুণ্ণ হয়, তবে আলাদা থাকার ব্যবস্থা করা উত্তম।"

— ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮৯

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত — যদি তারা কোনো বৈধ কারণে (যেমন: আপনার স্বামীর আর্থিক অবস্থা ভালো, বা অন্য সন্তানের বেশি প্রয়োজন) বৈষম্য করে, তবে তা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু আপনার বর্ণনা অনুযায়ী এটি স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব, যা ইসলামে নিষিদ্ধ।


৪. উপদেশ

  1. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন — তিনি সবচেয়ে ন্যায়বিচারক।
  2. স্বামীর সাথে ভালো সম্পর্ক রাখুন — এটিই আপনার শক্তি।
  3. শ্বশুর-শ্বাশুড়ির প্রতি সদাচরণ করুন — যদিও তারা অন্যায় করছেন, আপনার আখলাক তাদের চেয়ে উন্নত হওয়া উচিত।
  4. দোয়া করুন — আল্লাহ তাদের হেদায়েত দান করুন এবং আপনার পরিস্থিতির উন্নতি করুন।
  5. প্রয়োজনে আলেমের পরামর্শ নিন — স্থানীয় মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.