পৈতৃক সম্পত্তি, বাড়ি নির্মাণ ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত ইসলামী বিধান; ঝামেলার ভয়ে ভালো অংশ ছেড়ে দেওয়া কি জায়েজ?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: পৈতৃক সম্পত্তি, বাড়ি নির্মাণ ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত মাসআলা
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
আপনার বিবাহযোগ্য ব্যক্তি (বড় ভাই) বাবা-মায়ের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা নিয়ে বিদেশ গিয়েছিলেন। পরে বাবার জমিতে তিনি ১৭ লাখ টাকা দিয়ে দুইতলা বাড়ি নির্মাণ করেন, ছোট বোন দেন ৫ লাখ, ছোট ভাই কিছুই দেননি। মোট খরচ ~৩০ লাখ। নিচতলা বড় ভাইয়ের টাকায় ভালোভাবে ফার্নিশড। এখন বড় ভাই বলছেন—ভবিষ্যতে ছোট ভাই যদি বলেন "আমি নিচতলায় থাকব", তাহলে তিনি ঝগড়া করবেন না; ভালো অংশ (নিচতলা) ছোট ভাইকে দিয়ে দেবেন, আর উপরের অংশ (কম সুবিধাজনক) নিজে নেবেন। প্রশ্ন: এটি ইসলামী বিধান অনুযায়ী ঠিক না ভুল? বড় ভাই ঝামেলার ভয়ে ছেড়ে দিলে ছোট ভাই ভালো অংশ ভোগ করলে তা জায়েজ হবে কি? সম্পত্তি কি বাবার, নাকি এখন মায়ের?
১. সম্পত্তির মালিকানা: বাবার না মায়ের?
সিদ্ধান্ত: পৈতৃক সম্পত্তি বাবার মালিকানাধীন ছিল। বাবা জীবিত থাকলে সম্পত্তির মালিক তিনি। বাবা মারা গেলে সম্পত্তি সব ওয়ারিশের মিলিত মালিকানায় চলে যায়—শুধু মায়ের একার নয়।
দলিল:
- আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন—পুত্রের জন্য দুই কন্যার অংশের সমান..." (সূরা নিসা: ১১) - রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"তোমরা প্রত্যেককে তার হক দাও।" (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৭৩২; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৬১৫) - রাদ্দুল মুহতার (৬/৭৬১) ও ফাতাওয়া আলমগিরি (৬/৪৪৮)-এ উল্লেখ আছে—মৃতের পর তার সম্পত্তি সব ওয়ারিশের মধ্যে শরীয়ত নির্ধারিত অনুপাতে বণ্টিত হবে; কেউ বাদ পড়বে না।
প্রয়োগ:
বাবা যদি জীবিত থাকেন—সম্পত্তির মালিক বাবা; সন্তানদের কোনো স্বতন্ত্র হক নেই। বাবা মারা গেলে সম্পত্তি মা ও সব সন্তানের মধ্যে শরীয়ত অনুযায়ী বণ্টন হবে। মায়ের একার সম্পত্তি নয়।
২. বড় ভাইয়ের বাড়ি নির্মাণ: মালিকানা ও হিসাব
বড় ভাই বাবার জমিতে ১৭ লাখ দিয়ে বাড়ি বানিয়েছেন। এতে কয়েকটি দিক বিবেচ্য:
(ক) বাবার অনুমতি থাকলে:
- বাবার জমিতে সন্তানের নির্মাণ—বাবার অনুমতি থাকলে তা বাবার সম্পত্তির উন্নয়ন হিসেবে গণ্য হবে। বাড়িটি বাবার সম্পত্তির অংশ হবে।
- বড় ভাইয়ের বিনিয়োগ বাবার প্রতি ঋণ বা দান হিসেবে বিবেচিত হবে—নিয়ত অনুযায়ী।
- বাবা মারা গেলে সম্পত্তি সব ওয়ারিশের মধ্যে বণ্টন হবে; বড় ভাইয়ের বিনিয়োগের সমপরিমাণ আগে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে (যদি ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়)।
(খ) বাবার অনুমতি না থাকলে:
- অনুমতি ছাড়া নির্মাণ করলে বড় ভাই বাবার প্রতি জালিম হবেন। তবে বাবা ক্ষমা করলে বা মাফ করে দিলে সমস্যা নেই।
- বাবা মারা গেলে সব ওয়ারিশের সম্মতি ছাড়া বাড়ি দখলে রাখা জায়েজ নয়।
দলিল:
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"যে ব্যক্তি কোনো জমি অন্যায়ভাবে দখল করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সাত স্তর জমিনের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৩১৯৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৬১২) - রাদ্দুল মুহতার (৬/১৪১)-এ আছে—অন্যের সম্পত্তিতে অনুমতি ছাড়া নির্মাণ করা জুলুম; নির্মাতার জন্য তা ফেরত বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৩. ছোট ভাইয়ের কিছু না দেওয়া ও ভালো অংশ দাবি করা
(ক) ছোট ভাইয়ের অবস্থান:
- ছোট ভাই বাড়ি নির্মাণে কিছু দেননি—এটি তার নৈতিক দায়িত্বে ঘাটতি, তবে শরীয়তগতভাবে বাধ্যতামূলক ছিল না (বাবা জীবিত থাকলে)।
- বাবা মারা গেলে সম্পত্তিতে ছোট ভাইয়ের শরীয়ত নির্ধারিত হক থাকবে—সে বাড়ি নির্মাণে টাকা দেয়নি বলে জায়গার হক থেকে বঞ্চিত হবে না।
(খ) বড় ভাইয়ের ভালো অংশ ছেড়ে দেওয়া:
- বড় ভাই যদি স্বেচ্ছায়, চাপমুক্তভাবে নিচতলা ছোট ভাইকে দিয়ে দেন—এটি হিবা (দান) হিসেবে বৈধ। তবে শর্ত: বড় ভাইয়ের নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন পূরণের পর, এবং কোনো জুলুম বা প্রতারণা ছাড়া।
- কিন্তু যদি ঝামেলার ভয়ে, অনিচ্ছায়, বা ভবিষ্যৎ বিরোধ এড়াতে বাধ্য হয়ে ছেড়ে দেন—এটি ইসলামী দৃষ্টিতে ঠিক নয়। কারণ এটি অন্যায় দাবির কাছে নতিস্বীকার, যা জুলুমকে উৎসাহিত করে।
দলিল:
- আল্লাহ বলেন:
"তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ গ্রাস করো না..." (সূরা বাকারা: ১৮৮) - রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"মুসলিমের সম্পদ তার সন্তুষ্টি ছাড়া হালাল নয়।" (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ২০৬৯৫; সহীহ জামে, হাদিস: ৭৬৬২) - মাজমুউল ফাতাওয়া (৩০/৩৬৩)-এ ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন—কোনো ব্যক্তির সম্পদ অন্যের জন্য হালাল নয়, যদি না সে সন্তুষ্টচিত্তে দেয়।
৪. বড় ভাইয়ের উচিত কী?
- বাবার সাথে পরামর্শ: বাবা জীবিত থাকলে সম্পত্তির মালিক বাবা; বড় ভাইয়ের উচিত বাবার সাথে সমঝোতা করা।
- সব ওয়ারিশের সম্মতি: বাবা মারা গেলে সব ওয়ারিশের সম্মতিতে বণ্টন করা।
- বিনিয়োগের হিসাব: বড় ভাইয়ের ১৭ লাখ ও ছোট বোনের ৫ লাখ—ঋণ না দান, তা স্পষ্ট করা। ঋণ হলে আগে ফেরত, তারপর বণ্টন।
- ভালো অংশ ছেড়ে দেওয়া: স্বেচ্ছায়, সন্তুষ্টচিত্তে হলে জায়েজ; ভয় বা চাপে হলে নয়।
- ঝগড়া এড়ানো: ঝগড়ার ভয়ে হক ছেড়ে দেওয়া ইসলামী সমাধান নয়; বরং ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠা করা ইসলামী দায়িত্ব।
৫. চূড়ান্ত ফতোয়া
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | সম্পত্তির মালিকানা | বাবা জীবিত থাকলে বাবা; মৃত হলে সব ওয়ারিশের মধ্যে শরীয়ত অনুযায়ী বণ্টন | | মায়ের একার সম্পত্তি? | না; মা শুধু তার শরীয়ত নির্ধারিত অংশের মালিক | | ছোট ভাইয়ের না দেওয়া | নৈতিক ঘাটতি, তবে হক বাতিল হয় না | | বড় ভাইয়ের ভালো অংশ ছেড়ে দেওয়া | স্বেচ্ছায় হলে জায়েজ; ভয়/চাপে হলে জায়েজ নয় | | ছোট ভাইয়ের ভালো অংশ ভোগ | অন্যায় দাবি হলে জায়েজ নয়; সম্মতিতে হলে জায়েজ | | ঝামেলার ভয়ে হক ছাড়া | ইসলামী দৃষ্টিতে ভুল; ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠা করা উচিত |
পরামর্শ:
পরিবারের বড়দের (বিশেষত পিতা, যদি জীবিত থাকেন) মাধ্যমে সমঝোতা করুন। সম্ভব হলে লিখিতভাবে সম্পত্তির বণ্টন ও বিনিয়োগের হিসাব স্পষ্ট করুন। শরীয়ত অনুযায়ী প্রত্যেকে তার হক পেলে ঝগড়ার অবকাশ থাকবে না। ঝগড়ার ভয়ে হক ছেড়ে দেওয়া দুর্বলতা; বরং ইনসাফের সাথে সমাধান করা ইসলামের শিক্ষা।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।