ইস্তেখারা করার পর স্বপ্ন দেখা কি শরয়িতে গ্রহণযোগ্য? বোনের বাসায় ইস্তেখারা করা কি সহিহ? ব্যাংকে চাকরি করা ব্যক্তির বাসায় ইস্তেখারা করা যাবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আলহামদুলিল্লাহ আমি পরিপূর্ণ দ্বীন মেনে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। এবং পর্দার জন্য মাহরাম- ননমাহরাম মেইনটেইন করার চেষ্টা করি। আমার একটি বিয়ের প্রস্তাব ছিলো, আমার এলাকা থেকে দূরে হওয়ায় বিশেষ করে আমার আম্মু একটু নাজার। আমার পাত্রের বায়োডাটা দেখে আরো কিছু মাধ্যমের দ্বারা আমার মনে হয়েছে পাত্র দ্বীনদার, তবে আমার বাসা থেকে এখনও কোনো খোজ খবর নেওয়া হয়নি। পাত্রের সাথে কুফু মিলে, তাই আমি ইস্তেখারা করা শুরু করি।
প্রথম কয়দিন ইস্তেখারা করার সময় আমি আমার বোনের বাসায় ছিলাম।
১. প্রথম যেদিন ইস্তেখারা করি সেদিন রাতে ইস্তেখারার নামাজ পড়ে আমি ঘুমিয়ে যাই আর ঐ রাতে আমি স্বপ্নে দেখি, পাত্র আমার বাড়িতে এসেছে আর তখন আমার বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান ছিল তাই আমার আম্মু আমাদের ঘরে ছিলেন না, পাত্র দূর থেকে আমার কাছে খাবার খেতে চান আম্মু ঘরে না থাকায় আমি তাকে খাবার খেতে দিচ্ছিলাম এবং খাবার রেখে আমি পাশের রুমে চলে যাই, পাত্র ডাইনিং রুমে এসে খাবার খাচ্ছিলেন তখন আমার ২জন ফুফু আসেন এবং আমায় জিজ্ঞেস করেন উনি কে আমি লজ্জায় কিছু বলতে পারছিলাম না তাই পাত্র নিজেই উনার পরিচয় দিতে শুরু করেন ( এমন ভাবে পরিচয় দেন যে উনি আমার ফিউচার এরকম কিছু বলেন) সাথে সাথে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আর ঐ সময়টা ছিলো মাঝরাতে ফজরের আগে। (কিন্তু পাত্রের সাথে আমার সরাসরি এখনও দেখা হয়নি)
২. আমি আমার ইস্তেখারা কনটিনিউ করছি তো ২য় বার ইস্তেখারা করার পর আমি আবার স্বপ্নে দেখি পাত্র যিনি তিনি বলছেন এতো খোজাখুজির কি দরকার আমি তো আছিই এমন কিছু বলছিলেন।
আমি কয়েকজনের পরামর্শ অনুযায়ী আমার ইস্তেখারা কনটিনিউ করছি এখনও।
এরপর আমি ইস্তেখারায় স্বপ্নে দেখিনি কিন্তু লাস্টবার ইস্তেখারা করার পর মনে হয়েছে কেউ আমায় বলছে পাত্র ভালো।
*** ১ম ইস্তেখারা করার সময় আমি আমার বোনের বাসায় ছিলাম, আমার বোনের পরিবারের আয়ের উৎস তার হাসবেন্ড যিনি ব্যাংকে জব করেন। তাই আমার প্রশ্ন ছিলো তাদের বাসায় ইস্তেখারা করাটা কি সহিহ হয়েছে কি না?
** লাস্ট কয়দিন আমি আমার হলে থেকেই ইস্তেখারা কনটিনিউ করেছি।
*** আমার বা আমার পরিবারের পক্ষ থেকে কি এই বিয়ের প্রস্তাবে আগানো যাবে?
Answer
উত্তর (ফতোয়া নং: 5964)
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর নিচে প্রদান করা হলো। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কল্যাণময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফিক দান করুন। আমিন।
প্রথমে ইস্তেখারার শরয়ি পদ্ধতি ও স্বপ্নের বিধান:
ইস্তেখারা হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—আল্লাহ তাআলা যেন সেই কাজে কল্যাণ দান করেন অথবা তা থেকে বিরত রাখেন। ইস্তেখারার পর স্বপ্ন দেখা বা না দেখা কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত নয়; বরং ইস্তেখারার পর অন্তরে যে দিকেই ঝোঁক সৃষ্টি হয় বা কাজটি সহজ হয়ে যায়, সেটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণের ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়।
হাদিসে এসেছে:
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের সব কাজে ইস্তেখারা শেখাতেন... (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬৬)
ইস্তেখারার স্বপ্ন সম্পর্কে ফকিহগণের বক্তব্য: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহঃ) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন—
"ইস্তেখারার পর স্বপ্ন দেখা বা না দেখা কোনো দলিল নয়; বরং ইস্তেখারার পর অন্তরের প্রশান্তি ও কাজের সহজতা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৪)
মুফতি তাকি উসমানি (দাঃবাঃ) ফাতাওয়া উসমানি-তে বলেন—
"ইস্তেখারার স্বপ্ন কোনো শরয়ি দলিল নয়। স্বপ্ন দ্বারা শরয়ি হুকুম সাব্যস্ত হয় না। তবে স্বপ্ন যদি সুসংবাদ হয়, তাহলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ হিসেবে গ্রহণ করা যায়।" (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩২৭)
সুতরাং আপনার দেখা স্বপ্নগুলো:
- প্রথম স্বপ্নে পাত্র আপনার বাড়িতে এসেছে, খাবার খাচ্ছে, ফুফুরা জিজ্ঞেস করছে—এটি সাধারণত ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে ধরা যায়। তবে এটি কোনো শরয়ি দলিল নয়।
- দ্বিতীয় স্বপ্নে পাত্র বলছে "এত খোঁজাখুঁজির কী দরকার, আমি তো আছি"—এটিও ইতিবাচক ইঙ্গিত।
- শেষবার মনে হয়েছে কেউ বলছে "পাত্র ভালো"—এটি অন্তরের প্রশান্তি, যা ইস্তেখারার মূল লক্ষণ।
তবে শুধু স্বপ্নের উপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়; বরং পাত্রের দ্বীনদারি, চরিত্র, কুফু, পারিবারিক সম্মতি ইত্যাদি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রশ্ন ১: বোনের বাসায় ইস্তেখারা করা কি সহিহ হয়েছে? (বোনের স্বামী ব্যাংকে চাকরি করেন)
উত্তর: ইস্তেখারা নামাজ ও দুআর জন্য স্থান কোনো শর্ত নয়। যে কোনো পবিত্র স্থানে ইস্তেখারা করা যায়। বোনের বাসায় ইস্তেখারা করা সহিহ হয়েছে; এতে কোনো সমস্যা নেই।
তবে ব্যাংকে চাকরি করা বিষয়ে শরয়ি বিধান হলো—
- যদি ব্যাংক সুদভিত্তিক (কনভেনশনাল/রিবা) হয়, তাহলে সেখানে চাকরি করা—বিশেষ করে সুদের লেনদেনে সরাসরি জড়িত থাকা—হারাম। তবে যদি তিনি সুদের হিসাব-নিকাশ, সুদ লেখা-লেখা ইত্যাদি কাজে সরাসরি জড়িত না থাকেন, বরং অন্য বিভাগে (যেমন: আইটি, সিকিউরিটি, ক্লিনিং) কাজ করেন, তাহলে ফকিহগণের একটি দল এটিকে জায়েজ বলেছেন—তবে তা মাকরুহ।
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে—
"সুদ লেখা, সুদের সাক্ষী হওয়া এবং সুদের লেনদেনে সহায়তা করা—সবই হারাম।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৪৯)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহঃ) মাআরিফুল কুরআন-এ সূরা বাকারার ২৭৫ নং আয়াতের তাফসিরে বলেন—
"সুদভিত্তিক ব্যাংকে চাকরি করা জায়েজ নয়, যদি না তা সুদের লেনদেনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না হয়।" (মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৯৮)
সারকথা: আপনার বোনের বাসায় ইস্তেখারা করা সহিহ হয়েছে। তবে আপনার বোনের স্বামীর ব্যাংকের চাকরি যদি সুদভিত্তিক হয় এবং তিনি সরাসরি সুদের কাজে জড়িত থাকেন, তাহলে তার উপার্জন হারাম। সেক্ষেত্রে তার বাসায় অবস্থান করা বা তার আতিথেয়তা গ্রহণ করা—যদি তা হারাম মালের হয়—তাহলে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। তবে ইস্তেখারার নামাজ ও দুআর উপর এর কোনো প্রভাব নেই।
প্রশ্ন ২: হলে থেকে ইস্তেখারা কনটিনিউ করা কি সহিহ?
উত্তর: হলে থেকে ইস্তেখারা করা সম্পূর্ণ সহিহ। ইস্তেখারার জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থান বা পরিবেশের শর্ত নেই। আপনি যেখানেই থাকুন, পবিত্র স্থানে ইস্তেখারা করতে পারেন। এতে কোনো সমস্যা নেই।
প্রশ্ন ৩: আমার বা আমার পরিবারের পক্ষ থেকে এই বিয়ের প্রস্তাবে আগানো যাবে কি?
উত্তর: বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক চুক্তি। ইসলামে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা আবশ্যক:
১. দ্বীনদারি ও চরিত্র: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন—
"তোমরা চারটি বিষয় দেখে নারীকে বিয়ে করো: তার সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারি। তবে তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৯০) পুরুষের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। পাত্র দ্বীনদার হলে তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
২. কুফু (সমানতা): আপনি বলেছেন কুফু মিলে। এটি ভালো লক্ষণ। কুফু বলতে দ্বীন, চরিত্র, শিক্ষা, পারিবারিক অবস্থা ইত্যাদিতে সমতা বোঝায়।
৩. পারিবারিক সম্মতি: বিশেষ করে মায়ের সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার আম্মু "নাজার" করছেন—এর কারণ জেনে সমাধান করার চেষ্টা করুন। দূরত্ব, আর্থিক অবস্থা, বা অন্য কোনো কারণ থাকলে সেটি আলোচনার মাধ্যমে দূর করুন।
৪. ইস্তেখারার ফলাফল: আপনার ইস্তেখারায় ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে শুধু স্বপ্নের উপর নির্ভর করা যাবে না; বরং পাত্র সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করুন—তার দ্বীনদারি, চরিত্র, পারিবারিক অবস্থা, আচার-আচরণ ইত্যাদি।
৫. ইস্তেখারার পর করণীয়: ইস্তেখারার পর যদি অন্তরে প্রশান্তি আসে এবং কাজটি সহজ হয়, তাহলে সেটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণের ইঙ্গিত ধরে এগিয়ে যাওয়া যায়। আর যদি বাধা-বিপত্তি দেখা দেয়, তাহলে বিরত থাকা ভালো।
ফকিহগণের বক্তব্য: ইমাম তাহাবি (রহঃ) শরহু মাআনিল আসার-এ বলেন—
"ইস্তেখারার পর যে দিকেই অন্তর ঝুঁকে, সেটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণের ইশারা।" (শরহু মাআনিল আসার, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৪৫)
মুফতি আশরাফ আলী থানভি (রহঃ) বেহেশতী জেওর-এ বলেন—
"ইস্তেখারার পর স্বপ্ন দেখা শর্ত নয়; বরং অন্তরের প্রশান্তিই মূল।" (বেহেশতী জেওর, পৃষ্ঠা: ২২৩)
সারকথা:
- আপনার ইস্তেখারা সহিহ হয়েছে।
- স্বপ্নগুলো ইতিবাচক ইঙ্গিত, তবে শরয়ি দলিল নয়।
- পাত্রের দ্বীনদারি, চরিত্র, কুফু ও পারিবারিক সম্মতি যাচাই করে এগোনো যাবে।
- মায়ের "নাজার" দূর করার জন্য তার সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন।
- পাত্র সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করুন—তার এলাকার লোক, মসজিদের ইমাম, বা বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে।
- যদি সবকিছু ঠিক থাকে এবং অন্তরে প্রশান্তি থাকে, তাহলে বিয়ের প্রস্তাবে এগোনো জায়েজ ও কল্যাণকর।
তবে সতর্কতা: পাত্রের সাথে সরাসরি দেখা বা কথা বলা—বিয়েের আগে—শরয়তসম্মত নয়। পর্দার বিধান মেনে চলুন। পাত্রের সাথে যোগাযোগের প্রয়োজন হলে মাহরামের উপস্থিতিতে বা পরিবারের মাধ্যমে করুন।
পরামর্শ:
- ইস্তেখারা চালিয়ে যান—তবে স্বপ্নের উপর অতিরিক্ত নির্ভর করবেন না।
- পাত্র সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করুন—তার দ্বীনদারি, চরিত্র, পারিবারিক অবস্থা।
- মায়ের সাথে আলোচনা করুন—তার "নাজার" এর কারণ জেনে সমাধান করুন।
- বিশ্বস্ত ব্যক্তির পরামর্শ নিন—যেমন এলাকার ইমাম, মুফতি, বা দ্বীনদার আত্মীয়।
- ইস্তেখারার দুআ চালিয়ে যান—আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করুন।
- যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তাহলে পরিবারের মাধ্যমে পাত্রের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করুন।
- বিয়েের আগে পাত্রের সাথে সরাসরি সম্পর্ক নয়—পর্দার বিধান মেনে চলুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কল্যাণময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب والسلام عليكم ورحمة الله وبركاته