স্বামী শাশুড়ির পক্ষ নিয়ে স্ত্রীকে ভুল প্রমাণ করলে ইসলাম কী বলে?

Family Life · Hanafi

Question No: 5949
Questioner: Salma Akter
Question Asked: 25 Sep 2026, 08:57 PM
Reviewed & Published: 25 Sep 2026, 09:40 PM
Views: 24
Tokens: 5,428
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি আমার স্বামীকে আমার শাশুড়ির ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করলে তিনি আমাকে আমার বুঝ দিয়ে খুশি না করে আমার শাশুড়িই সঠিক সেটা সবসময় প্রমাণ করে দেন।আমাকে ভুল প্রমাণ করে কষ্ট দেন।আমরা জয়েন্ট ফ্যামিলি।বর্তমানে আমার ২ মাসের শিশু আছে,আমার জা গর্ভবতী ও আমার শাশুড়ি অসুস্থ।আমার স্বামী ঘরের সমস্ত কাজ আমাকে করতে বাধ্য করছেন।সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমার শাশুড়ি চায় না বলে আমার স্বামীও কাজের মহিলা রাখছেন না।আমি যতটুক পারি চেষ্টা করে যাচ্ছি উনাদের সেবা করার।তারপরও আমি কাজ ফাঁকি দেই বলে দোষারোপ করেন আমার স্বামী।এক্ষেত্রে আমার করণীয় কি?ধৈর্য্য ধারণই কি একমাত্র উপায়?

Answer

প্রশ্ন: স্বামীর প্রতি অভিযোগ ও শাশুড়ির ব্যাপারে সঠিক করণীয়

সংক্ষিপ্ত উত্তর

ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত। আপনার স্বামীর উচিত আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং ইনসাফের সাথে বিচার করা। তবে আপনারও কিছু দায়িত্ব ও করণীয় রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ধৈর্য, সংলাপ এবং ইসলামি সীমার মধ্যে সমাধানের চেষ্টা করা কর্তব্য। শুধু ধৈর্যই একমাত্র উপায় নয়; বরং হিকমতের সাথে কথা বলা, সালিশের ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনে ইসলামি বিধান মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া।


বিস্তারিত উত্তর

১. স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অধিকার ও ইনসাফ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — (সূরা আন-নিসা: ১৯)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ "নারীদের পুরুষদের উপর যেরূপ অধিকার আছে, পুরুষদেরও নারীদের উপর অনুরূপ অধিকার আছে।" — (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম।" — (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন যে, স্বামীর উপর স্ত্রীর হক হলো—সে স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করবে, তার প্রতি ইনসাফ করবে এবং তার অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখাবে। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭)

২. আপনার স্বামীর আচরণের মূল্যায়ন

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

  • আপনি অভিযোগ করলে তিনি আপনার কথা না শুনে সর্বদা মায়ের পক্ষ নেন।
  • আপনাকে ভুল প্রমাণ করে কষ্ট দেন।
  • সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কাজের মহিলা রাখছেন না, অথচ আপনি ২ মাসের শিশুর মা।
  • আপনি চেষ্টা করেও "কাজ ফাঁকি" বলেছেন দোষারোপ করেন।

ইসলামি দৃষ্টিকোণ:

১. ইনসাফ না করা: স্বামীর উচিত উভয় পক্ষের কথা শোনা। শুধু মায়ের পক্ষ নেওয়া এবং স্ত্রীকে সর্বদা ভুল বলা ইনসাফের পরিপন্থী। আল্লাহ বলেন: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ — "নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফের আদেশ দেন।" (সূরা আন-নাহল: ৯০)

২. সন্তান প্রতিপালনে সহযোগিতা: ২ মাসের শিশুর মা হিসেবে আপনার শারীরিক ও মানসিক বিশ্রামের প্রয়োজন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, স্ত্রী স্বামীর ঘরের কাজ করতে বাধ্য নয়; বরং তা সদাচরণ ও সহযোগিতার অংশ হিসেবে করে থাকে। (আল-হিদায়া: ২/৩৫০; ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/৫৪৮)

৩. গৃহকর্মে বাধ্য করা: ফুকাহায়ে কেরামের স্পষ্ট মত হলো—স্ত্রী স্বামীর ঘরের কাজকর্ম করতে আইনত বাধ্য নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, স্ত্রী যদি নিজ ইচ্ছায় খেদমত করে, তা সওয়াবের কাজ; কিন্তু জোরপূর্বক করানো ইসলামি দৃষ্টিতে সমীচীন নয়। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭)

৪. কাজের মহিলা রাখা: সামর্থ্য থাকলে এবং স্ত্রী অসুস্থ বা শিশু প্রতিপালনে ব্যস্ত থাকলে কাজের মহিলা রাখা উত্তম। শাশুড়ির "না" বলার কারণে তা না করা এবং স্ত্রীর উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানো ইনসাফের পরিপন্থী।

৩. আপনার করণীয়

ক. ধৈর্য ও সংলাপ:

শুধু ধৈর্যই একমাত্র উপায় নয়। বরং:

  • শান্ত সময়ে একান্তে কথা বলুন: রাগের মুহূর্তে নয়; বরং শান্ত পরিবেশে স্বামীকে বলুন—"আমি আপনার ও পরিবারের সেবা করতে চাই, কিন্তু ২ মাসের শিশু ও আমার শারীরিক অবস্থার কারণে কষ্ট হচ্ছে। আপনি যদি একটু সহযোগিতা করেন বা কাজের মহিলা রাখেন, তাহলে আমি আরও ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারব।"
  • অভিযোগের ভাষা পরিহার করুন: শাশুড়ির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ না করে নিজের অসুবিধার কথা বলুন। এতে স্বামী রক্ষণশীল হয়ে উঠবেন না।

খ. সালিশের ব্যবস্থা:

যদি সরাসরি কথা বলে সমাধান না হয়, তাহলে ইসলামের নির্দেশনা হলো—উভয় পরিবারের বিশ্বস্ত লোকদের মাধ্যমে সালিশ করা।

وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا "যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে এক বিচারক নিয়োগ করো স্বামীর পরিবার থেকে এবং এক বিচারক স্ত্রীর পরিবার থেকে।" — (সূরা আন-নিসা: ৩৫)

গ. নিজের সীমা রক্ষা:

  • আপনি যা সামর্থ্যের বাইরে, তা করতে গিয়ে নিজের ও শিশুর ক্ষতি করবেন না।
  • শিশুর হক আপনার উপর অগ্রাধিকারযোগ্য। শিশুকে অবহেলা করা যাবে না।
  • আপনার নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিন; কারণ আপনি গর্ভবতীও নন, বরং সদ্য প্রসূতি।

ঘ. অভিভাবকের সাথে পরামর্শ:

আপনার বাবা-মা বা বিশ্বস্ত আত্মীয়ের সাথে পরামর্শ করুন। প্রয়োজনে তারা স্বামীর সাথে কথা বলতে পারেন।

ঙ. দুআ ও আল্লাহর উপর ভরসা:

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً "হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন।"

নিয়মিত সূরা আল-ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি এবং সূরা আন-নিসার ৩৪-৩৫ তিলাওয়াত করুন। রাসূল ﷺ বলেছেন: وَاتَّقُوا اللَّهَ فِي النِّسَاءِ — "নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।" (সহিহ মুসলিম: ১২১৮)

৪. ধৈর্যই কি একমাত্র উপায়?

না। ধৈর্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু ধৈর্য নয়; বরং:

| করণীয় | বিবরণ | |--------|--------| | সংলাপ | শান্তভাবে নিজের অসুবিধা জানানো | | সালিশ | পরিবারের বিশ্বস্ত লোকদের মাধ্যমে | | হক রক্ষা | নিজের ও শিশুর স্বাস্থ্যের যত্ন | | দুআ | আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা | | প্রয়োজনে | ইসলামি সীমার মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত |

ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেন, স্ত্রীর উচিত স্বামীর সাথে ধৈর্য ও হিকমতের সাথে চলা; কিন্তু যদি স্বামী ইসলামি সীমা লঙ্ঘন করে, তবে অভিভাবকের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা। (বেহেশতী জেওর: ৭ম খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে উল্লেখ করেন, স্ত্রীকে গৃহকর্মে জোরপূর্বক বাধ্য করা এবং তার অভিযোগ না শোনা ইসলামি আদবের পরিপন্থী। (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩২৮)


সারসংক্ষেপ

১. আপনার স্বামীর সর্বদা মায়ের পক্ষ নেওয়া ও আপনাকে ভুল বলা ইনসাফের পরিপন্থী। ২. ২ মাসের শিশুর মা হিসেবে আপনার বিশ্রাম ও যত্নের অধিকার আছে। ৩. গৃহকর্মে বাধ্য করা ইসলামত নয়; বরং তা সহযোগিতার বিষয়। ৪. শুধু ধৈর্যই একমাত্র উপায় নয়; বরং সংলাপ, সালিশ ও হক রক্ষা কর্তব্য। ৫. রাগের সময় নয়; শান্ত সময়ে কথা বলুন। ৬. প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করুন। ৭. আল্লাহর কাছে দুআ করুন এবং শিশুর যত্ন নিন।

  • আল-কুরআনুল কারিম (সূরা আন-নিসা: ১৯, ৩৪-৩৫; সূরা আল-বাকারা: ২২৮; সূরা আন-নাহল: ৯০)
  • সহিহ মুসলিম: ১২১৮
  • সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫
  • আল-হিদায়া: ২/৩৫০
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): ৩/৫৭
  • ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/৫৪৮
  • বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী): ৭ম খণ্ড
  • ফাতাওয়া উসমানি (তাকি উসমানি): ২/৩২৮

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.