শাশুড়ি পুত্রবধূকে নিয়ন্ত্রণ করলে ইসলামে কী করণীয়?
Family Life · Hanafi
Question
আমার স্বামী আমাকে উনার মায়ের শাসনাধীন রাখতে চান সবসময়।আমার শাশুড়ীও উনার কথা মত সবকিছু না করলে মাইন্ড করেন,এসব নিয়ে দোষারোপ করেন অন্যকে।আলহামদুলিল্লাহ আমার স্বামীর সামর্থ্য আছে বাসায় কাজের মহিলা রাখার।আমার শাশুড়ি রাজি না বলে আমার স্বামীও রাজি না।আমি বাপের বাড়ি কখন যাবো,কতদিন থাকবো এসব কিছু আমার শাশুড়ির কথামত হবে।আমার স্বামীও আমার শাশুড়ির কথা মত বাপের বাড়ি থেকে চলে আসতে বলেন।আমার এগুলো খুব খারাপ লাগে।এক্ষেত্রে আমার কি করা উচিত?ধৈর্য্য ধারণই কি একমাত্র উপায়?
Answer
স্বামী-শাশুড়ির অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ: ইসলামি দৃষ্টিকোণ ও করণীয়
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ইসলাম পরিবারকে সুসংগঠিত রাখতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে। আপনার পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে।
১. স্ত্রীর ব্যক্তিগত অধিকার ও স্বাধীনতা
ইসলামে স্ত্রীর কিছু মৌলিক অধিকার রয়েছে যা স্বামী বা শাশুড়ি বিনা কারণে কেড়ে নিতে পারেন না:
- নিজের সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত বিষয়ে স্বাধীনতা: স্ত্রী নিজের সম্পত্তির মালিক, নিজের ব্যক্তিগত বিষয়ে স্বাধীন। (সূরা নিসা: ৩২; রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭)
- পিতা-মাতার সাথে সাক্ষাতের অধিকার: ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা (সিলাতুর রহম) ফরজ। স্ত্রীকে পিতা-মাতার সাথে দেখা করতে বাধা দেওয়া বা তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য করা শরিয়তসম্মত নয়। (সূরা নিসা: ১; সহিহ বুখারি: ৫৯৮৭)
- শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে চলাফেরার স্বাধীনতা: স্বামী শরিয়তের সীমার মধ্যে স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, কিন্তু শাশুড়ির ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশি অনুযায়ী নয়।
২. শাশুড়ির অধিকার ও সীমা
শাশুড়ি ইসলামে মা-বাবার সম্মানের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর সাথে সদাচরণ, খেদমত ও সম্মান করা কর্তব্য। কিন্তু শাশুড়ির কোনো শরিয়তসম্মত অধিকার নেই যে তিনি পুত্রবধূকে নিজের ইচ্ছাধীন গৃহবন্দী রাখবেন বা পিতা-মাতার সাথে সাক্ষাতে বাধা দেবেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৪)
৩. স্বামীর দায়িত্ব
স্বামীর প্রধান দায়িত্ব হলো ন্যায়বিচার করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন..." (সূরা নাহল: ৯০)
স্বামী যদি মায়ের অযৌক্তিক দাবি পূরণ করতে গিয়ে স্ত্রীর শরিয়তসম্মত অধিকার লঙ্ঘন করেন, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন। মায়ের খেদমত করা ফরজ, কিন্তু মায়ের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী স্ত্রীকে জুলুম করা জায়েজ নয়।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেছেন: স্বামীর উপর স্ত্রীর নাফাকাহ (ভরণপোষণ) ও ন্যায়বিচার করা ওয়াজিব। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭২)
৪. কাজের মহিলা রাখার বিষয়
আপনার স্বামীর সামর্থ্য আছে এবং আপনি চাচ্ছেন — এটি আপনার শরিয়তসম্মত অধিকার। ইসলামে স্ত্রীর গৃহকর্ম স্বামীর উপর ফরজ নয়; বরং স্ত্রীর খেদমত করা স্বামীর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত (হানাফি মাজহাবে প্রসিদ্ধ মত)। তবে শাশুড়ির অসম্মতিতে স্বামী না রাখলে এটি সরাসরি হারাম নয়, কিন্তু স্ত্রীর উপর জুলুম হলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
৫. আপনার করণীয় (ব্যবহারিক পরামর্শ)
ক. ধৈর্য + প্রজ্ঞা একসাথে
শুধু ধৈর্য একমাত্র উপায় নয়; বরং ধৈর্য + হিকমত (প্রজ্ঞা) + শরিয়তসম্মত উপায়ে অধিকার আদায়ের চেষ্টা — এটাই ইসলামি পদ্ধতি।
খ. স্বামীর সাথে একান্তে আলোচনা
রাগের মুহূর্তে নয়, শান্ত সময়ে স্বামীর সাথে বসে বলুন:
- "আমি আপনার মায়ের খেদমত করতে রাজি, কিন্তু পিতা-মাতার সাথে দেখা করতে বাধা দেওয়া আমার শরিয়তসম্মত অধিকার লঙ্ঘন।"
- কুরআন-হাদিসের দলিলসহ বুঝান, যেন তিনি জানেন এটি শুধু আপনার আবদার নয়, দ্বীনের হুকুম।
গ. শাশুড়ির সাথে সদাচরণ বজায় রাখুন
তাঁর সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন না। সম্ভব হলে তাঁর মন জয় করার চেষ্টা করুন। তবে শরিয়তবিরোধী নির্দেশ মানতে বাধ্য নন।
ঘ. পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করুন
সম্ভব হলে ফোনে, সম্ভব হলে সরাসরি — পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না। এটি কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।
ঙ. নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী
পরিবারের কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ দ্বীনদার ব্যক্তি বা ইমাম/মুফতির মাধ্যমে মধ্যস্থতা করান।
চ. সবরের সীমা
যদি জুলুম চরমে পৌঁছে এবং স্বামী না বোঝে, তাহলে ইসলামি আদালত বা শরিয়তসম্মত বিচারকের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের সুযোগ আছে। তবে সিদ্ধান্তের আগে অভিজ্ঞ মুফতির পরামর্শ নিন।
৬. সতর্কতা
- শাশুড়িকে গালি দেওয়া, অপমান করা, সম্পর্ক ছিন্ন করা — সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- স্বামীর বিরুদ্ধে অবাধ্যতা (নুশুজ) করা যাবে না, তবে শরিয়তবিরোধী নির্দেশ মানতে বাধ্য নন।
- তালাকের হুমকি দেওয়া বা বাড়ি ছেড়ে পালানো — এগুলো সমাধান নয়, বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ করে।
সারসংক্ষেপ
ধৈর্য একমাত্র উপায় নয়। আপনার করণীয়:
- ধৈর্য — আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
- দুআ — আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।
- প্রজ্ঞার সাথে স্বামীকে বোঝানো — দলিলসহ।
- শাশুড়ির সাথে সদাচরণ — কিন্তু শরিয়তবিরোধী নির্দেশ না মানা।
- পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক রক্ষা — এটা আপনার অধিকার।
- প্রয়োজনে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতা বা মুফতির পরামর্শ।
আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারে শান্তি, ন্যায়বিচার ও বারাকাহ দান করুন। আমিন।