বিবাহে বাঁধা বা দীর্ঘদিন বিবাহ না হওয়ার ক্ষেত্রে রুকাইয়া করা কি জায়েজ?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বিবাহে বাঁধা বা দীর্ঘদিন বিবাহ না হওয়ার ক্ষেত্রে রুকাইয়া করা উচিত?
** উত্তর:** হ্যাঁ, শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে রুকাইয়া (কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ঝাড়ফুঁক ও দোয়া) করা জায়েজ । তবে তা হতে হবে বিশুদ্ধ কুরআন, মাসনূন দোয়া ও আল্লাহর নাম দ্বারা—জাদু-তাবিজ, শিরকি আমল, গণক-জ্যোতিষীর আশ্রয় বা হারাম পদ্ধতি দ্বারা নয়। আর রুকাইয়াকে মূল সমাধান মনে না করে আসল কারণ অনুসন্ধান ও শরীয়তসম্মত উপায় অবলম্বন করা কর্তব্য।
১. রুকাইয়ার শরীয়তসম্মত ভিত্তি
কুরআন ও সুন্নাহে রুকাইয়ার বৈধতা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত:
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ
"আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা (রোগমুক্তি) ও রহমত।" — (সূরা বনী ইসরাঈল: ৮২)
قُلْ هُوَ لِلَّذِينَ آمَنُوا هُدًى وَشِفَاءٌ
"বলুন, এটি (কুরআন) মুমিনদের জন্য হেদায়েত ও শিফা।" — (সূরা হা-মীম আস-সাজদাহ: ৪৪)
হাদীস শরীফে এসেছে:
হযরত আউস ইবনে হুযাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে জাহেলি যুগের ঝাড়ফুঁক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন:
اعْرِضُوا عَلَيَّ رُقَاكُمْ، لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ
"তোমাদের রুকাইয়াগুলো আমার কাছে পেশ করো; রুকাইয়ায় কোনো অসুবিধা নেই, যতক্ষণ না তাতে শিরক থাকে।" — (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২০০)
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদা সাহাবায়ে কেরাম এক গোত্রপতির উপর সূরা ফাতিহা পড়ে ঝাড়ফুঁক করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ তা অনুমোদন করেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৭৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২০১)
২. বিবাহে বাঁধা বা দীর্ঘদিন বিবাহ না হওয়ার কারণ ও সমাধান
বিবাহ বিলম্বিত হওয়া বা বাঁধার পেছনে কয়েকটি কারণ হতে পারে:
(ক) স্বাভাবিক ও দুনিয়াবি কারণ
- পাত্র/পাত্রীর সন্ধান না পাওয়া
- আর্থিক সীমাবদ্ধতা
- পারিবারিক জটিলতা
- পছন্দের মানদণ্ড অতিরিক্ত কঠিন হওয়া
এসব ক্ষেত্রে রুকাইয়ার চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপ ও দোয়াই বেশি প্রযোজ্য। যেমন—
- বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দোয়া করা
- সূরা ত্বাহা: ১৩১-১৩২, সূরা আল-ফুরকান: ৭৪ ইত্যাদি পড়া
- রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ وَرَحْمَتِكَ
"হে আল্লাহ! আমি আপনার অনুগ্রহ ও রহমত প্রার্থনা করছি।"
আর বিশেষভাবে হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর দোয়া:
رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ
"হে আমার রব! আমাকে একা (নিঃসন্তান/অবিবাহিত) রেখো না; আপনি তো উত্তম উত্তরাধিকারী।" — (সূরা আম্বিয়া: ৮৯)
(খ) জিন-আসর, বদনজর বা জাদুর প্রভাব
যদি প্রকৃতপক্ষে বদনজর, জিনের আসর বা জাদুর প্রভাব থাকে—তবে শরীয়তসম্মত রুকাইয়া করা জায়েজ ও উপকারী। এ ক্ষেত্রে:
- সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত
- সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা ইখলাস
- মাসনূন দোয়াসমূহ পাঠ করা
- নিজে পড়া বা কোনো নেককার, সুন্নাহভিত্তিক রুকাইয়া-কারীর মাধ্যমে করানো
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন—কুরআন, আল্লাহর নাম ও মাসনূন দোয়া দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা জায়েজ; আর যদি তা অ-আরবি বা অর্থবোধক না হয়, তবে তা নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৩-৩৬৪)
ফাতাওয়া আলমগিরিতে এসেছে—রুকাইয়া ও তাবিজ-কবজ, যদি কুরআন বা আল্লাহর নাম দ্বারা হয়, তবে তা জায়েজ; আর যদি শিরকি কালাম বা অজ্ঞাত কিছু হয়, তবে তা হারাম। (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫৪)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি"তে বলেন—রুকাইয়া সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত, তবে শর্ত হলো তা শরীয়তসম্মত হতে হবে এবং রুকাইয়াকারীর নেককার ও আমানতদার হতে হবে। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৫-৩৪৬)
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ উল্লেখ করেন—কুরআন-দোয়া দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা জায়েজ, তবে জাদু-টোনা, গণক-জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েজ। (বেহেশতী জেওর, ১ম খণ্ড)
৪. রুকাইয়ার শর্তসমূহ
শরীয়তসম্মত রুকাইয়ার জন্য শর্ত:
- আল্লাহর কালাম, নাম বা সিফাত দ্বারা হতে হবে — অজ্ঞাত, অর্থহীন বা শিরকি কালাম নয়।
- আরবি বা অর্থবোধক ভাষায় হতে হবে — অর্থ না জানা কালাম নিষিদ্ধ।
- বিশ্বাস রাখতে হবে যে শিফা আল্লাহরই হাতে — রুকাইয়া নিজে প্রভাবক নয়।
- রুকাইয়াকারী নেককার, আমানতদার ও সুন্নাহভিত্তিক হতে হবে — জাদুকর, গণক, কাহিন বা শিরকি পদ্ধতির আশ্রয় নয়।
- হারাম উপকরণ (তাবিজে শিরকি লেখা, পশু-রক্ত, নাপাক বস্তু) ব্যবহার না করা।
৫. যা থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য
- গণক, জ্যোতিষী, কাহিন, জাদুকরের কাছে যাওয়া — রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً
"যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করে, তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হয় না।" — (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৩০)
- শিরকি তাবিজ-কবজ, জাদু-টোনা, হারাম পদ্ধতি — সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও কবীরা গুনাহ।
- রুকাইয়াকে মূল ভরসা বানানো — আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল ও দোয়াই মূল।