স্বামী ভরণপোষণ না দিলে ইসলামে কী করণীয়? দায়িত্বহীন স্বামীর সাথে সংসার, তালাকের চিন্তা, ছবি ভাইরালের হুমকি — সমাধান ও করণীয় কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5910
Questioner: Maria0045
Question Asked: 24 Sep 2026, 05:44 PM
Reviewed & Published: 24 Sep 2026, 07:43 PM
Views: 30
Tokens: 10,078
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম
আমার বিয়ে হয়েছে গত আগস্ট মাসের ১ তারিখে। বিয়ের আগে ছেলের মা আমাকে তার ছেলের জন্য নেওয়ার জন্য অনেক ফোন দিত। কুফু না মেলায় আমরা প্রস্তাব বাতিল করে দেওয়াতে সে অনেক কান্নাকাটি করে। বিয়ের আগে বলেছিল আমার পড়াশুনার যাবতীয় খরচ তারাই বহন করবে। এক টাকাও আমার বাবার কাছ থেকে নিতে হবে না। বিয়ে হওয়ার আগের সপ্তাহেও আমরা প্রস্তাব জোরালোভাবে বাতিল করে দেই।তারপর ছেলের মা ফোন দিয়ে বলে দেখবোনে মেয়ে কোথায় বিয়ে দেন। এমন ইমোশনাল ব্লাকমেইল করে।তারপরে আমার মনে হঠাৎ করে কেমন পরিবর্তন চলে আসে আমি দেখাদেখি পর্বের জন্য রাজি হই।ছেলের মামা এতটাই চালাক ছিল তারা দেখতে এসেই কথার মারপ্যাচে ফেলে ঐদিন ই বিয়ে পড়িয়ে দেয়। এমন তারাহুরো ছিল কিছু বুঝেও উঠতে পারিনি।
এখন বিয়ের পরে আমার স্বামী ভরনপোষণ দিচ্ছে না। বলতেছে এখন তার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না দিতে পারবে না। অথচ বিয়ের আগে বলেছিল দিবে সব।
আমার স্বামীর সপ্ন আমি একদিন বিসিএস ক্যাডার হবো। সংসারের হাল ধরবো। আমি পাবলিক ভার্সিটির শিক্ষার্থী। আমার উপর এমন প্রত্যাশা প্রতিনিয়ত আমাকে মানসিক রোগী করে দিচ্ছে। তার কথা দরকার হলে আমার স্বামী ঘরে কাজ করবে আর আমি বাহিরে। এমন দায়িত্বহীন পুরুষ হওয়াতে প্রতিনিয়ত আমি মানসিক প্রেশার এর মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। আমার বয়স ২২ বছর। আমার স্বামীর বয়স ২৬। দায়িত্ব কর্তব্যের কথা বললেই বলে বয়সটা তো অনেক হয়ে যায়নি। একদিন সব ঠিক হবে।
আমি পাবলিক ভার্সিটিতে ২য় বর্ষে পড়াশুনা করছি। ভার্সিটির হলেই থাকি। বিয়ের আগে তারা সবই জানতো।আমি ভবিষ্যতে চাকরি করবো এই লোভে সে আমাকে বিয়ে করে।

এমতাবস্থায় আমার কি করনীয়?
এমন দায়িত্বহীন পুরুষের সাথে আমি কিভাবে সারাজীবন কাটিয়ে দিব?

আমি যদি বিবাহ বিচ্ছেদের কথা চিন্তা করি তাহলে আমার পাপ হবে কি না?

আমার স্বামীর ফোনে আমার পিকচার আছে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে এইগুলো ভাইরাল করে দিবে কি না এই ভয় ও পাচ্ছি। আমি তো পর্দা মেইনটেইন করি।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ ঐটাই নেই।সে আমাকে ভালোবাসে এই আশায় যে আমি একদিন সরকারি কর্মকর্তা হবো।

আমার করনীয় কি এখন?

Answer

পারিবারিক জীবনে স্বামীর দায়িত্বহীনতা: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও করণীয়

উত্তর (সংক্ষিপ্ত): ইসলামে স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণপোষণ (নফাকা) ফরজ। স্বামী সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নফাকা না দিলে সে গুনাহগার হবে এবং স্ত্রী শরীয়তসম্মতভাবে বিচারকের মাধ্যমে নফাকা আদায়ের দাবি করতে পারবে। তবে শুধু দায়িত্বহীনতা বা ভবিষ্যতের প্রত্যাশার কারণে বিবাহবিচ্ছেদ ইসলামে উৎসাহিত নয়; বরং ধৈর্য, পরামর্শ ও পারিবারিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা কর্তব্য। তালাকের চিন্তা করা নিজে থেকে পাপ নয়, তবে বিনা শরীয়তসম্মত কারণে তালাক দেওয়া বা তালাকের পথে অগ্রসর হওয়া নিন্দনীয়। ছবি ভাইরাল করার হুমকি দেওয়া বা তা বাস্তবায়ন করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও গুরুতর গুনাহ।


বিস্তারিত উত্তর

১. স্বামীর ভরণপোষণ (নফাকা) দেওয়া ফরজ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর সন্তান-জন্মদাত্রীগণ যদি তোমাদের সন্তানকে দুধ পান করায়, তবে তোমরা তাদের পারিশ্রমিক দাও।" (সূরা আত-তালাক: ৬)

"পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অন্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং因为他们 নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।" (সূরা আন-নিসা: ৩৪)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমাদের উপর তোমাদের স্ত্রীদের হক হলো, তোমরা তাদের খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করবে।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১২১৮)

হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়ারাদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্ট আছে: স্বামী সামর্থ্যবান হলে স্ত্রীর নফাকা (খাবার, বস্ত্র, বাসস্থান) দেওয়া তার উপর ওয়াজিব। সামর্থ্য না থাকলে সে পরিস্থিতি অনুযায়ী কম দেবে, কিন্তু একেবারে অস্বীকার করা যাবে না।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেন:

"স্বামীর উপর স্ত্রীর নফাকা ফরজ, তা সে ধনী হোক বা দরিদ্র — তবে দরিদ্র হলে সামর্থ্য অনুযায়ী।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:

"স্ত্রীর নফাকা দেওয়া স্বামীর দ্বীনি দায়িত্ব; এটি এড়িয়ে যাওয়া বা ফাঁকি দেওয়া জুলুম।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৪৫)

২. আপনার স্বামীর আচরণের শরীয়তসম্মত মূল্যায়ন

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

  • বিয়ের আগে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি — "সব দিবে, পড়াশুনার খরচ বহন করবে" — এটি প্রতারণা ও মিথ্যা, যা ইসলামে হারাম।
  • বিয়ের পর নফাকা না দেওয়া — সামর্থ্য থাকলে এটি সুস্পষ্ট গুনাহ ও জুলুম।
  • "তুমি বিসিএস হবে, সংসার চালাবে" — স্ত্রীর উপর ভরণপোষণের দায়িত্ব চাপানো ইসলামে বৈধ নয়। নফাকা স্বামীর দায়িত্ব, স্ত্রীর নয়।
  • "আমি ঘরে কাজ করব, তুমি বাইরে" — এটি ইসলামী দায়িত্ববণ্টনের পরিপন্থী। স্ত্রী চাইলে স্বামীর অনুমতিক্রমে চাকরি করতে পারে, কিন্তু স্বামী তার নফাকার দায়িত্ব এড়াতে পারে না।

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:

"স্বামী যদি নফাকা দিতে অস্বীকার করে, তবে কাজী (বিচারক) তাকে বাধ্য করবে অথবা স্ত্রীকে তার সম্পদ থেকে নফাকা আদায়ের অনুমতি দেবে।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক)

৩. আপনার করণীয় (ধাপে ধাপে)

প্রথম ধাপ: সরাসরি আলোচনা ও ধৈর্য

  • স্বামীর সাথে শান্তভাবে বসে কথা বলুন। রাগ বা অভিযোগের সুরে নয়, বরং ইসলামী দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিন।
  • তাকে বলুন: "নফাকা দেওয়া তোমার দ্বীনি দায়িত্ব; আমি চাকরি করলে তা অতিরিক্ত, কিন্তু তুমি দায়িত্ব এড়াতে পারবে না।"
  • ধৈর্য ধরুন — রাসূল ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন।" (সহীহ বুখারী)

দ্বিতীয় ধাপ: পারিবারিক মধ্যস্থতা

  • উভয় পরিবারের সম্মানিত ও দ্বীনদার ব্যক্তিদের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করান।
  • মা'আরিফুল কুরআন-এ মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: "পারিবারিক বিরোধে প্রথমে মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা কর্তব্য।" (সূরা আন-নিসা: ৩৫-এর তাফসীর)

তৃতীয় ধাপ: ইসলামী বিচারকের (কাজী/শরীয়া বোর্ড) শরণাপন্ন হওয়া

  • যদি স্বামী একেবারেই নফাকা না দেয় এবং মধ্যস্থতাও ব্যর্থ হয়, তবে শরীয়া বোর্ড বা ইসলামী বিচারকের মাধ্যমে নফাকা আদায়ের দাবি করুন।
  • হানাফী মাযহাবে কাজী স্বামীকে নফাকা দিতে বাধ্য করতে পারে; অস্বীকার করলে তাকে তালাক দেওয়ার নির্দেশও দিতে পারে।

চতুর্থ ধাপ: তালাকের চিন্তা

  • তালাক ইসলামে বৈধ, কিন্তু আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল। রাসূল ﷺ বলেছেন: "আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল হলো তালাক।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২১৭৮)
  • শুধু দায়িত্বহীনতা বা ভবিষ্যতের প্রত্যাশার কারণে তালাক দেওয়া বা চাওয়া শরীয়তসম্মত কারণ নয় — যদি না স্বামী নফাকা না দেয়, নির্যাতন করে, বা দ্বীনি দায়িত্ব সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়।
  • তালাকের চিন্তা করা নিজে থেকে পাপ নয় — এটি একটি বৈধ চিন্তা। কিন্তু বিনা শরীয়তসম্মত কারণে তালাক দেওয়া বা তালাকের পথে অগ্রসর হওয়া গুনাহ। যদি স্বামী নফাকা না দেয়, নির্যাতন করে, বা দ্বীনি দায়িত্ব এড়িয়ে যায় — তাহলে তালাক চাওয়া জায়েয।
  • খুলা' (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ) — হানাফী মাযহাবে স্ত্রী কাজীর মাধ্যমে খুলা' চাইতে পারে, তবে সাধারণত কিছু আর্থিক সমন্বয়ের বিষয় থাকে।

পঞ্চম ধাপ: ছবি ভাইরাল করার হুমকি

  • এটি গুরুতর গুনাহ ও জুলুম। কাউকে ব্ল্যাকমেইল করা, ছবি ভাইরাল করার হুমকি দেওয়া — ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
  • আল্লাহ বলেন: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
  • রাসূল ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে ভয় দেখায়, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন ভয় দেখাবেন।" (সুনানে আবু দাউদ)
  • আপনি পর্দা মেইনটেইন করেন — এটি আপনার সতীত্ব ও সম্মানের প্রমাণ। ছবি ভাইরাল করার হুমকি দিলে আপনি শরীয়া বোর্ড বা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। এটি আপনার অধিকার।

৪. মানসিক চাপ ও প্রত্যাশার বিষয়

  • আপনার স্বামীর "তুমি বিসিএস হবে, সংসার চালাবে" — এই প্রত্যাশা ইসলামী দায়িত্ববণ্টনের পরিপন্থী। স্ত্রীর উপর সংসার চালানোর দায়িত্ব নেই।
  • আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন: "স্ত্রীকে তার স্বামীর দায়িত্ব বহন করতে বাধ্য করা জুলুম।" (বেহেশতী জেওর, বিবাহ অধ্যায়)
  • আপনার পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া ভালো, কিন্তু স্বামীর দায়িত্ব এড়ানোর অজুহাত হিসেবে আপনার পড়াশুনা বা চাকরির প্রত্যাশা ব্যবহার করা বৈধ নয়।

৫. সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত পরামর্শ

| বিষয় | শরীয়তসম্মত অবস্থান | |---|---| | স্বামীর নফাকা দেওয়া | ফরজ (সামর্থ্য থাকলে) | | নফাকা না দেওয়া | গুনাহ ও জুলুম | | স্ত্রীর চাকরির প্রত্যাশা | স্বামীর দায়িত্ব নয় | | তালাকের চিন্তা | নিজে থেকে পাপ নয়, তবে বিনা কারণে তালাক নিন্দনীয় | | ছবি ভাইরালের হুমকি | কঠোরভাবে হারাম ও জুলুম | | করণীয় | ধৈর্য → আলোচনা → মধ্যস্থতা → শরীয়া বোর্ড |

আমার পরামর্শ:

  1. ধৈর্য ধরুন ও দুআ করুন — আল্লাহর কাছে সাহায্য চান, তাহাজ্জুদে দুআ করুন।
  2. স্বামীর সাথে শান্তভাবে কথা বলুন — তাকে ইসলামী দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিন।
  3. পরিবারের সম্মানিত লোকদের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করান।
  4. শরীয়া বোর্ড বা ইসলামী বিচারকের শরণাপন্ন হন — নফাকা আদায়ের জন্য।
  5. তালাকের সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে নেওয়ার আগে — ইস্তিখারা করুন এবং দ্বীনদার আলেমের পরামর্শ নিন।
  6. ছবি ভাইরালের হুমকি — এটি আপনার বিরুদ্ধে অপরাধ; প্রয়োজনে প্রশাসনিক অভিযোগ করুন।

মনে রাখবেন: আল্লাহ বলেন:

"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)

"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।" (সূরা আশ-শারহ: ৬)

আল্লাহ আপনার সমস্যার সহজ সমাধান দান করুন এবং আপনার পরিবারকে হেফাজত করুন। আমীন।


তথ্যসূত্র:

  • আল-কুরআন: সূরা আন-নিসা ৩৪, ২৯; সূরা আত-তালাক ৬, ২; সূরা আশ-শারহ ৬
  • সহীহ মুসলিম, হাদীস ১২১৮
  • সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২১৭৮
  • আল-হিদায়া (মারগিনানী)
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
  • ফাতাওয়া আলমগিরি
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
  • মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
  • বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.