Biyer khetre kivabe cele pokkher samne jabo
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বিয়ের ক্ষেত্রে পর্দা রক্ষা করে পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়া এবং পাত্র দেখা — ইসলামী দিকনির্দেশনা
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: বিয়ের সময় পাত্র দেখতে যাওয়া, পাত্রপক্ষের সামনে পর্দা রক্ষা করে যাওয়া, পাত্র সম্পর্কে কী কী জিজ্ঞাসা করা, পাত্র দ্বীনদার কিনা তা বোঝার উপায়, পাত্রী কোন পোশাকে যাবে ইত্যাদি।
১. পাত্র দেখার ইসলামী বিধান (ইসলামিক নিয়ম)
ইসলামে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীকে একে অপরকে দেখা শরীয়তসম্মত। এতে বিয়ের পর সুখী দাম্পত্য জীবনের সম্ভাবনা বাড়ে।
হাদীস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যখন তোমাদের কেউ কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তখন যদি সে তাকে দেখে ফেলে যাতে সে বিয়ের প্রতি আগ্রহী হয়, তবে তা করা উত্তম।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২০৮২; জামে তিরমিযী, হাদীস ১০৮৭
মুগীরা ইবনে শু'বা (রাঃ) বলেন, আমি এক নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: "তাকে দেখে নাও, কারণ এতে তোমাদের মধ্যে মিল-মহব্বত সৃষ্টি হবে।" — জামে তিরমিযী, হাদীস ১০৮৭; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৩২৩৫
হানাফী ফিকহের বিধান:
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর মতে, পাত্র-পাত্রী একে অপরের চেহারা ও হাতের কব্জি পর্যন্ত দেখতে পারবে। কারণ এতেই সৌন্দর্য ও গঠন সম্পর্কে ধারণা হয়।
"ولا بأس أن ينظر إلى وجهها وكفيها إذا أراد أن يتزوجها، وهو قول أبي حنيفة رحمه الله" — আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ১৪৮
শর্তাবলী:
- দেখা হবে মাহরামের উপস্থিতিতে বা পরিবারের অনুমতিক্রমে।
- খালওয়া (নির্জনে একাকী সাক্ষাৎ) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- কেবল প্রয়োজন পরিমাণ দেখা — চেহারা ও হাতের কব্জি।
- কামভাব বা কু-দৃষ্টি নিয়ে দেখা যাবে না।
- একাধিকবার বা বারবার দেখা যাবে না, বরং একবার বা প্রয়োজন হলে সীমিতবার।
"ولا يزيد على النظر إلى الوجه والكفين" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ১৪৯
২. পাত্রপক্ষের সামনে পর্দা রক্ষা করে কীভাবে যাবেন?
ক. পাত্রীর জন্য পর্দার বিধান
পাত্রী পাত্রের বাবা, ভাই, চাচা ইত্যাদি যারা তার জন্য নন-মাহরাম, তাদের সামনে পর্দা করবে।
কুরআনের নির্দেশ:
"তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।" — সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৩৩
"মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে, আর নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে..." — সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১
খ. পাত্র দেখার সময় পর্দার সমাধান
সর্বোত্তম পদ্ধতি:
- পৃথক কক্ষে বসা: পাত্রী এক কক্ষে, পাত্র অন্য কক্ষে — মাঝখানে পর্দা/দরজা। প্রয়োজনে পাত্রী পাত্রকে দেখবে, পাত্র পাত্রীকে দেখবে — তবে সরাসরি একসাথে না।
- মাহরামের উপস্থিতি: পাত্রীর মা, বাবা, ভাই বা মাহরাম পুরুষ সাথে থাকবেন।
- পাত্রের মা/বোনের মাধ্যমে: পাত্রের মা বা বোন পাত্রীকে দেখে পাত্রকে বর্ণনা দিতে পারেন — এটি অনেক পরিবারে প্রচলিত ও শরীয়তসম্মত।
- ভিডিও/ছবি: শরীয়তসম্মত নয়, তবে প্রয়োজনে পাত্রীর ছবি পাত্রের মা/বোনকে দেখানো যেতে পারে — তবে পাত্র নিজে দেখা উত্তম নয়। ফকীহগণ এতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।
"لا يجوز للرجل أن ينظر إلى صورة المرأة الأجنبية" — ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩২৯
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আছে:
"বিয়ের প্রস্তাবের সময় পাত্র-পাত্রীর সরাসরি সাক্ষাৎ হলে মাহরামের উপস্থিতি অপরিহার্য। খালওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।" — ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৫৬
৩. পাত্রী কোন পোশাকে যাবে?
ক. পোশাকের শরীয়তসম্মত নিয়ম
- সম্পূর্ণ শরীর ঢাকা: হাতের কব্জি ও পায়ের টাখনু পর্যন্ত ঢাকা থাকবে।
- ঢিলেঢালা পোশাক: শরীরের গঠন প্রকাশ পাবে না।
- অস্বচ্ছ কাপড়: পাতলা বা ট্রান্সপারেন্ট কাপড় নিষিদ্ধ।
- সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী পোশাক নয়: উজ্জ্বল রঙ, ভারী গহনা, সুগন্ধি — যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে — পরিহার করবে।
- সাধারণ পোশাক: বোরকা, হিজাব, লম্বা কুর্তি-পায়জামা, চাদর — যা সাধারণভাবে পরিধান করে।
"ولا تظهر زينتها إلا ما ظهر منها" — সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১
বাহিশতী জেওর-এ হযরত থানভী (রহঃ) লিখেছেন:
"বেগানা পুরুষের সামনে নারীর সাজসজ্জা করে বের হওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বিয়ের প্রস্তাবের সময়ও সাধারণ পোশাকে থাকবে, সাজগোজ করে নয়।" — বাহিশতী জেওর, খণ্ড ১, পৃ. ৪৫
খ. পাত্রের পোশাক
পাত্রও শরীয়তসম্মত পোশাক পরবে — টাখনুর উপরে কাপড়, সাধারণ শার্ট-প্যান্ট বা পাঞ্জাবি। অহংকার বা প্রদর্শনীমূলক পোশাক পরিহার করবে।
"لا ينظر الله إلى من جر ثوبه خيلاء" — সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৮৪
৪. পাত্র সম্পর্কে কী কী জিজ্ঞাসা করবেন?
ক. দ্বীনদারিতা সম্পর্কে
- নামাজ: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে কিনা? জামাতে পড়ে কিনা?
- কুরআন: কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে কিনা?
- রোজা: রমজানের রোজা রাখে কিনা?
- হালাল-হারাম: হালাল-হারামের পার্থক্য বোঝে কিনা? সুদ, ঘুষ, হারাম উপার্জন থেকে বাঁচে কিনা?
- দাড়ি: পুরুষের জন্য দাড়ি রাখা সুন্নত — সে দাড়ি রাখে কিনা?
- পর্দা: পরিবারের নারীদের পর্দার ব্যাপারে কেমন?
- সালাফ-সালিহীন: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসরণ করে কিনা? বেদআত থেকে বাঁচে কিনা?
হাদীস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমাদের কাছে যখন এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব দেয়, যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা সন্তুষ্ট, তখন তার সাথে বিয়ে দাও।" — জামে তিরমিযী, হাদীস ১০৮৪
"নারীকে চারটি কারণে বিয়ে করা হয়: সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীন। তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও।" — সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০৯০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৬৬
খ. চরিত্র ও স্বভাব সম্পর্কে
- রাগ নিয়ন্ত্রণ: রাগ হলে কেমন আচরণ করে?
- পরিবারের সাথে: বাবা-মায়ের সাথে কেমন ব্যবহার?
- সামাজিক: প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক কেমন?
- দায়িত্ববোধ: সংসারের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত কিনা?
- শিক্ষা ও পেশা: তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশা কী?
- স্বাস্থ্য: শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য কেমন?
গ. পারিবারিক বিষয়
- পরিবারের দ্বীনদারিতা: তার পরিবার দ্বীনদার কিনা?
- পরিবারের সদস্য: শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ কেমন?
- আলাদা থাকার ব্যবস্থা: আলাদা ঘর বা ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ আছে কিনা?
- সম্পত্তি: পারিবারিক সম্পত্তি বা ব্যবসা আছে কিনা? (তবে এটি প্রধান মাপকাঠি নয়)
৫. পাত্র দ্বীনদার কিনা তা কীভাবে চিনবেন?
ক. সরাসরি জিজ্ঞাসা
- নামাজ, রোজা, কুরআন — সরাসরি জিজ্ঞাসা করুন।
- তার জবাবের ধরন ও আন্তরিকতা লক্ষ্য করুন।
খ. তার আচরণ পর্যবেক্ষণ
- কথাবার্তা: তার কথায় সততা ও ভদ্রতা আছে কিনা?
- দৃষ্টি: তার দৃষ্টি সংযত কিনা? নারীর দিকে তাকিয়ে আছে কিনা?
- পোশাক: শরীয়তসম্মত পোশাক পরেছে কিনা?
- সময়ানুবর্তিতা: নির্ধারিত সময়ে এসেছে কিনা?
- পারিবারিক আচরণ: তার বাবা-মায়ের সাথে ব্যবহার কেমন?
গ. বিশ্বস্ত সূত্রে খোঁজ নেওয়া
- তার এলাকার ইমাম/মুয়াজ্জিন: তার নামাজ-রোজার অবস্থা জিজ্ঞাসা করুন।
- তার সহকর্মী/বন্ধু: তার চরিত্র সম্পর্কে জানুন।
- তার শিক্ষক: যদি সে দ্বীনি শিক্ষা পেয়ে থাকে।
- আত্মীয়-স্বজন: যারা তাকে চেনেন।
"المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده" — সহীহ বুখারী, হাদীস ১০
ঘ. ইস্তেখারা ও দুআ
ইস্তেখারা নামাজ: বিয়ের সিদ্ধান্তে ইস্তেখারা করা সুন্নত। দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করুন।
"اللهم إني أستخيرك بعلمك..." — সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৬৬
৬. ছবি ও ঘটক (মধ্যস্থতাকারী) সম্পর্কে সতর্কতা
ক. ছবি দেওয়া-নেওয়া
সমস্যা: আপনি লিখেছেন — "অনেক ছেলে ঘটকের কাছে আমার ছবি দিয়েছে।" এটি শরীয়তসম্মত নয়।
কারণ:
- নারীর ছবি বেগানা পুরুষের কাছে পাঠানো হারাম।
- ছবি হাতবদল হলে তা অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে।
- ছবি দেখে বিয়ে করলে তা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়।
"لا يجوز تصوير ذوات الأرواح ولا النظر إلى صور النساء الأجنبيات" — ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৩০
সমাধান:
- ছবি দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করুন।
- প্রয়োজনে পাত্রের মা বা বোনকে সরাসরি দেখান — এটি শরীয়তসম্মত।
- অথবা মাহরামের উপস্থিতিতে সরাসরি সাক্ষাৎ করুন।
খ. ঘটকদের ব্যাপারে সতর্কতা
- ঘটকরা প্রায়ই অতিরঞ্জিত করে। তাদের কথায় সম্পূর্ণ বিশ্বাস করবেন না।
- নিজে যাচাই করুন — সরাসরি জিজ্ঞাসা করুন, খোঁজ নিন।
- একাধিক সূত্রে তথ্য মিলিয়ে দেখুন।
৭. পাত্রপক্ষের বাবা দেখতে চাইলে কী করবেন?
ক. শরীয়তসম্মত পদ্ধতি
- পৃথক কক্ষ: পাত্রীর বাবা পাত্রের বাবাকে আলাদা কক্ষে বসাবেন। পাত্রী পর্দার আড়াল থেকে কথা বলতে পারেন বা মাহরামের মাধ্যমে জবাব দিতে পারেন।
- মাহরামের উপস্থিতি: পাত্রীর বাবা, ভাই বা চাচা সাথে থাকবেন।
- সরাসরি দেখা নয়: পাত্রের বাবা পাত্রীকে সরাসরি দেখতে চাইলে — পাত্রীর মা বা বোনের মাধ্যমে দেখাতে পারেন, অথবা পর্দার আড়াল থেকে।
- ভিডিও কল: শরীয়তসম্মত নয়, তবে অতি প্রয়োজন হলে মাহরামের উপস্থিতিতে সংক্ষিপ্ত ভিডিও কল করা যেতে পারে — তবে ফকীহগণ এতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।
"لا يجوز للرجل الأجنبي النظر إلى المرأة الأجنبية ولا الخلوة بها" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ১৪৮
খ. পাত্রের বাবা দ্বীনদার কিনা বোঝার উপায়
- নামাজ: তিনি নামাজ পড়েন কিনা?
- দাড়ি: দাড়ি আছে কিনা?
- কথাবার্তা: শরীয়তের বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?
- পরিবারের নারীদের পর্দা: তার পরিবারের নারীরা পর্দা করে কিনা?
- হালাল-হারাম: ব্যবসা-বাণিজ্যে হালাল-হারামের খেয়াল রাখেন কিনা?
- মসজিদে যাওয়া: নিয়মিত মসজিদে যান কিনা?
৮. পাত্রী পাত্রের সামনে কীভাবে যাবে?
ক. শরীয়তসম্মত পদ্ধতি
- মাহরামের সাথে: পাত্রীর বাবা, ভাই বা মাহরাম পুরুষ সাথে থাকবেন।
- পৃথক কক্ষ: পাত্রী এক কক্ষে, পাত্র অন্য কক্ষে — প্রয়োজনে পর্দার আড়াল থেকে কথা।
- সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ: দীর্ঘ সময় নয়, ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে।
- প্রয়োজনীয় কথা: বিয়ের বিষয়ে প্রয়োজনীয় কথা — দ্বীন, পরিবার, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
- কু-দৃষ্টি নয়: উভয়েই দৃষ্টি সংযত রাখবে।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।