মার প্রতি দ্বায়িত্ব
Family Life · Hanafi
Question
Answer
মায়ের সেবা ও স্ত্রীর অধিকার: দ্বন্দ্ব নিরসনে ইসলামী দিকনির্দেশনা
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারীর মা (৪৫+ বয়সী) অসুস্থতার কারণে দিনে ৩-৪ বার পা টিপে দিতে হয়, ওষুধ খুলে হাতে দিতে হয়, পরীক্ষার আগের রাতেও বুঝেন না। ছেলে মায়ের পিঠ চুলকিয়ে দেয়—এতে স্ত্রী অসন্তুষ্ট হন। রাগ করলে স্বামী কী করবে এবং কীভাবে সংসার মেইনটেইন করবে?
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি: মায়ের সেবা ফরজে কিফায়া ও স্ত্রীর হক
১. মায়ের সেবা করা সন্তানের কর্তব্য
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
رَغِمَ أَنْفُهُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ مَنْ أَدْرَكَ وَالِدَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ أَحَدَهُمَا أَوْ كِلَيْهِمَا ثُمَّ لَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ "তার নাক ধূলিমলিন হোক, তার নাক ধূলিমলিন হোক, তার নাক ধূলিমলিন হোক—সে ব্যক্তির, যে তার পিতা-মাতার একজন বা উভয়কে বৃদ্ধাবস্থায় পেল, অতঃপর জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না (অর্থাৎ সেবা করল না)।" — (সহীহ মুসলিম: ২৫৫১)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: মায়ের সেবা করা—বিশেষত অসুস্থ অবস্থায়—সন্তানের উপর ফরজে কিফায়া (যদি একাধিক সন্তান থাকে) বা ফরজে আইন (যদি একমাত্র সন্তান হয়)। ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. বলেন:
"والدین کی خدمت کرنا اولاد پر لازم ہے، خصوصاً جب وہ ضعیف یا بیمار ہوں" — (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৪৪, কিতাবুল হজর)
২. স্ত্রীর অধিকারও ফরজ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ "নারীদের রয়েছে পুরুষদের উপর অধিকার, যেমন পুরুষদের রয়েছে নারীদের উপর অধিকার—নিয়ম অনুযায়ী।" — (সূরা বাকারা: ২২৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ "মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বাধিক পূর্ণ ঈমানদার, যার চরিত্র সর্বোত্তম; এবং তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম।" — (সুনানে তিরমিজি: ১১৬২)
সমস্যার সমাধান: ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা
ক. মায়ের সেবার ক্ষেত্রে করণীয়
| বিষয় | সমাধান | |------|--------| | পা টিপে দেয়া | নিজে সম্ভব না হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিন—যেমন: মায়ের জন্য একটি পা মালিশ মেশিন, বা কোনো মহিলা সেবিকা (caregiver) নিয়োগ। | | ওষুধ খুলে হাতে দেয়া | ওষুধ আলাদা ডিসপেনসারে সাজিয়ে রাখুন, যাতে মা নিজেই খুলতে পারেন। অথবা স্ত্রীকে বলুন—তিনি মায়ের কাছে পৌঁছে দেবেন (এটি তার দায়িত্ব নয়, তবে সহযোগিতা)। | | পরীক্ষার আগের রাত | পরীক্ষার আগে মায়ের সেবার জন্য বিকল্প কেউ থাকলে তাকে দায়িত্ব দিন। | | পিঠ চুলকানো | এটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত কাজ। স্ত্রীর উপস্থিতিতে বা তার সামনে করা অনুচিত। মায়ের জন্য একটি ব্যাক স্ক্র্যাচার কিনে দিন। |
হানাফি ফতোয়া: ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন:
"اگر بیوی شوہر کی ماں کی خدمت کرنے سے انکار کرے تو اس پر جبر نہیں کیا جا سکتا، کیونکہ یہ اس کی ذمہ داری نہیں۔" — (কিতাবুল আছার, ইমাম মুহাম্মদ)
খ. স্ত্রীর অভিযোগের সমাধান
স্ত্রীর রাগ করা স্বাভাবিক, কারণ:
- সন্দেহ ও ঈর্ষা: পিঠ চুলকানোর মতো কাজ স্ত্রীর সামনে করলে তার মনে খারাপ ধারণা আসতে পারে।
- অবহেলা: স্বামী যদি মায়ের সেবায় এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে স্ত্রীর হক আদায় না হয়, তবে তা ইসলামসম্মত নয়।
- শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি: দিনে ৩-৪ বার পা টিপে দেয়া স্বামীর জন্য কষ্টকর, যা তার ব্যবহারে প্রভাব ফেলে।
সমাধান:
- স্ত্রীর সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন: তাকে বুঝান—মায়ের সেবা আপনার ধর্মীয় দায়িত্ব, কিন্তু তাকে অবহেলা করা আপনার দায়িত্বে অবহেলা হবে।
- স্ত্রীর হক আদায় করুন: তার ভরণপোষণ, ভালোবাসা, ও সময়—সব ঠিক রাখুন। রাসূল ﷺ বলেছেন: "তোমাদের উপর তোমাদের স্ত্রীদের হক রয়েছে।" (সহীহ মুসলিম: ১২১৮)
- মায়ের সেবায় স্ত্রীর সাহায্য কামনা করুন, জোর নয়: স্ত্রী সাহায্য করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন; না করলে জোর করবেন না।
- সীমা নির্ধারণ করুন: মায়ের সেবা করুন, কিন্তু স্ত্রীর সামনে পিঠ চুলকানোর মতো কাজ এড়িয়ে চলুন। এটি উভয়ের সম্মান রক্ষা করবে।
রাগ করলে স্বামী কী করবে?
১. ধৈর্য ধারণ করুন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا يَقُولُونَ وَاهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيلًا "তারা যা বলে তাতে ধৈর্য ধারণ করুন এবং সুন্দরভাবে তাদের এড়িয়ে চলুন।" — (সূরা মুযযাম্মিল: ১০)
২. রাগের সময় চুপ থাকুন
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْكُتْ "তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে সে চুপ থাকুক।" — (মুসনাদে আহমাদ: ২১৩৭)
৩. স্ত্রীকে বুঝানোর সময় উপযুক্ত নির্বাচন করুন
রাগের মুহূর্তে তর্ক করবেন না। শান্ত হলে বলুন:
"তোমার অভিমান আমার কাছে মূল্যবান। মায়ের সেবা আমার দায়িত্ব, কিন্তু তোমার হকও আমার দায়িত্ব। আমি চেষ্টা করব যাতে তোমার কোনো কষ্ট না হয়।"
৪. মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করুন
যদি সমস্যা সমাধান না হয়, তবে পরিবারের কোনো সম্মানিত ব্যক্তি (যেমন: চাচা, বড় ভাই, বা ইমাম) কে মধ্যস্থতাকারী করুন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا "যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে এক বিচারক নিযুক্ত করো স্বামীর পরিবার থেকে এবং এক বিচারক স্ত্রীর পরিবার থেকে।" — (সূরা নিসা: ৩৫)
সংসার মেইনটেইন করার কৌশল
১. সময় ভাগ করুন
| সময় | কাজ | |------|-----| | সকাল | মায়ের সেবা (ওষুধ, নাস্তা) | | দুপুর | স্ত্রীর সাথে সময় (খাবার, কথা) | | বিকাল | মায়ের সেবা (পা টিপে দেয়া) | | রাত | স্ত্রীর সাথে সময় (পরিবারিক আলোচনা) |
২. মায়ের জন্য আলাদা ব্যবস্থা
যদি সম্ভব হয়, মায়ের জন্য একটি আলাদা রুম বা আলাদা ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করুন—যাতে স্ত্রীর ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষা পায়। ইসলামে এটি জায়েজ।
৩. স্ত্রীর অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন
স্ত্রী যখন রাগ করেন, তখন তাকে বলুন:
"তুমি আমার জীবনের অংশ। মায়ের সেবা আমার দায়িত্ব, কিন্তু তোমাকে কষ্ট দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। বলো, কীভাবে আমি উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারি?"
৪. দুআ করুন
আল্লাহর কাছে দুআ করুন:
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا "হে আমার প্রতিপালক! আমার পিতা-মাতার প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৪)
এবং স্ত্রীর জন্য:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাদের চোখের শীতলতা বানান।" — (সূরা ফুরকান: ৭৪)
বিশেষ পরামর্শ (হানাফি ফতোয়া অনুযায়ী)
- মায়ের সেবা করা ফরজ, কিন্তু স্ত্রীর হক আদায়ও ফরজ। উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা আপনার দায়িত্ব।
- স্ত্রীকে মায়ের সেবার জন্য বাধ্য করা যাবে না। ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মতে, স্ত্রীর উপর শাশুড়ির সেবা করা ওয়াজিব নয়। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭৭)
- পিঠ চুলকানোর মতো কাজ স্ত্রীর সামনে করবেন না। এটি সুন্নাহসম্মত শিষ্টাচার নয়।
- মায়ের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিন: পা মালিশ মেশিন, ব্যাক স্ক্র্যাচার, বা মহিলা সেবিকা।
- স্ত্রীর রাগকে সম্মান করুন: রাগ করা তার অধিকার, কারণ সে আপনার সঙ্গী। তাকে বুঝান, ভালোবাসুন, এবং তার হক আদায় করুন।
- প্রয়োজনে আলাদা বসবাসের ব্যবস্থা করুন: যদি একসাথে থাকলে সমস্যা বাড়ে, তবে ইসলামে আলাদা থাকার অনুমতি আছে—তবে মায়ের সেবা অব্যাহত রাখুন।
উপসংহার
ইসলামে মায়ের সেবা ও স্ত্রীর হক—উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের সেবা করা সন্তানের কর্তব্য, কিন্তু স্ত্রীর হক আদায় না করা অন্যায়। ভারসাম্য রক্ষা করুন, ধৈর্য ধারণ করুন, এবং উভয়ের সাথে সদ্ব্যবহার করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — (সূরা নিসা: ১৯)
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথ দেখান এবং সংসারে শান্তি দান করুন। আমিন।