পরকীয়া ও যিনার তাওবা কীভাবে করবেন?

Family Life · Hanafi

Question No: 5880
Questioner: Afsiya Zaman
Question Asked: 23 Sep 2026, 09:54 PM
Reviewed & Published: 23 Sep 2026, 10:07 PM
Views: 31
Tokens: 4,596
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

Ek bon jinay lipto hoyeche akhon fire asche r onutopto . Akhon uni amr kache jante cheyechen kivhabe tawba korben ? R shamir haaq je nosto korechen ei khetre ki kora uchit tar ? Ami nirdisto vhabei Kichu bolte pari ni .Mon theke tawba Korte bolechi r jina howar probonota ache amon lok theke dure thakte bolechi . Bon ti ata te sontusto na . Er baire r ki nosiha korbo?

Answer

পরকীয়া ও তাওবার বিধান — হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বিস্তারিত উত্তর

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: এক বোন পরকীয়ায় (যিনা/অবৈধ সম্পর্কে) জড়িত ছিলেন, এখন ফিরে এসেছেন এবং অনুতপ্ত। তিনি জানতে চান—কীভাবে তাওবা করবেন? স্বামীর হক যেহেতু নষ্ট করেছেন, সেক্ষেত্রে কী করা উচিত? প্রশ্নকর্তা তাকে মনের তাওবা ও যিনার প্রতি প্রবণতাসম্পন্ন লোক থেকে দূরে থাকতে বলেছেন, কিন্তু বোন এতে সন্তুষ্ট নন। এর বাইরে আর কী নসিহত করা যায়?


প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: পরকীয়া কেবল গুনাহ নয়, এটি কবিরা গুনাহ

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "আর তোমরা যিনার নিকটেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

"যখন কোনো বান্দা যিনা করে, তখন তার থেকে ঈমান বের হয়ে যায় এবং তা মাথার উপর ছায়ার মতো থাকে; অতঃপর সে তাওবা করলে ঈমান ফিরে আসে।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৪৬৭০, তিরমিজি: ২৬২৫)

হানাফি ফিকহের মূলনীতি: যিনা কবিরা গুনাহ। তবে তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন। আল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।" — (সূরা বাকারা: ২২২)


দ্বিতীয়ত: তাওবার শর্তসমূহ (হানাফি মাজহাব অনুযায়ী)

ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ এবং ইমাম গাজালি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, তাওবার জন্য তিনটি শর্ত অপরিহার্য:

  1. গুনাহটি সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করা — এখন থেকে আর কখনো সেই কাজে ফিরে না যাওয়া।
  2. অতীতের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া — অন্তর থেকে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া।
  3. ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা — ইস্তিগফার ও সংকল্প।

আর যদি গুনাহটি কোনো বান্দার হকের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাহলে চতুর্থ শর্ত যোগ হয়: 4. যার হক নষ্ট হয়েছে, তার হক ফিরিয়ে দেওয়া বা তার কাছে ক্ষমা চাওয়া।

রেফারেন্স: ইবন আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৩০; ইমাম গাজালি, ইহইয়া উলুমিদ্দীন, খণ্ড ৪।


তৃতীয়ত: স্বামীর হক নষ্টের বিষয়ে করণীয়

এখানে কয়েকটি দিক বিবেচনা করতে হবে:

(ক) যদি স্বামী জানেন না

এক্ষেত্রে স্বামীকে জানানো জরুরি নয়। বরং অনেক ফকিহ বলেছেন, স্বামীকে জানালে সংসারে ভাঙন সৃষ্টি হতে পারে, যা আরও বড় ফিতনা। তবে বোনকে অবশ্যই:

  • আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা করতে হবে।
  • স্বামীর প্রতি এখন থেকে পূর্ণ আনুগত্য ও সেবা করা।
  • স্বামীর হক (ভরণপোষণ, সন্তান-সন্ততি, দাম্পত্য অধিকার) পূর্ণভাবে আদায় করা।
  • স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান বাড়িয়ে দেওয়া।

হানাফি ফিকহের মূলনীতি: গোপন গুনাহের ক্ষেত্রে গোপনেই তাওবা করা উত্তম; প্রকাশ করা জরুরি নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যে ব্যক্তি গুনাহ করে গোপন রেখেছে, তার তাওবাও আল্লাহর কাছে গোপন রাখা উত্তম।" — (মিশকাত, হাদিস: ২৩৪০)

(খ) যদি স্বামী জেনে যান

তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন। স্বামী যদি ক্ষমা করে দেন এবং সংসার চালু রাখতে চান, তবে তা জায়েজ। আর যদি স্বামী তালাক দিতে চান, তবে শরিয়ত অনুযায়ী তালাকের বিধান প্রযোজ্য হবে।

(গ) স্বামীর হক ফিরিয়ে দেওয়া

স্বামীর হক মূলত তিন প্রকার:

  1. দাম্পত্য অধিকার — এটা অতীতে নষ্ট হয়েছে, ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়; তবে ভবিষ্যতে পূর্ণভাবে আদায় করতে হবে।
  2. ভরণপোষণ ও সেবা — এখন থেকে যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
  3. সম্মান ও বিশ্বস্ততা — এখন থেকে পূর্ণ বিশ্বস্ততা রক্ষা করতে হবে।

ইমাম তাহতাবি (রহ.)ইমাম সারাখসি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, বান্দার হকের ক্ষেত্রে তাওবা তখনই পূর্ণ হয় যখন সে হক আদায় করে বা মালিককে সন্তুষ্ট করে। তবে দাম্পত্য বিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে স্বামী না জানলে জানানো জরুরি নয়; বরং ভবিষ্যতে পূর্ণ বিশ্বস্ততা রক্ষাই মূল কর্তব্য।

রেফারেন্স: সারাখসি, আল-মাবসুত, খণ্ড ৯; কাসানি, বাদাইউস সানাই, খণ্ড ৭।


চতুর্থত: বোনকে আর কী নসিহত করা যায়?

প্রশ্নকর্তা ইতিমধ্যে ভালো নসিহত করেছেন—মনের তাওবা ও যিনাপ্রবণ লোক থেকে দূরে থাকা। বোন সন্তুষ্ট নন। এর বাইরে যা বলা যায়:

১. তাওবার পূর্ণ পদ্ধতি শিখিয়ে দিন

  • সালাতুল তাওবা পড়তে বলুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

    "যে ব্যক্তি কোনো গুনাহ করে, অতঃপর উত্তমরূপে ওযু করে দুই রাকাত নামাজ পড়ে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।" — (সুনানে আবু দাউদ: ১৫২১, তিরমিজি: ৪০৬)

  • ইস্তিগফার বেশি বেশি করতে বলুন—বিশেষত "আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি"।

  • সদকা করতে বলুন—গোপন গুনাহের কাফফারা হিসেবে।

  • নেক আমল বাড়াতে বলুন—নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, রোজা।

২. স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য বাড়ানোর তাগিদ দিন

  • স্বামীর সেবা, তার সন্তুষ্টি, তার প্রতি ভালোবাসা—এগুলোই এখন তার প্রধান ইবাদত।
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

    "স্ত্রী যদি তার স্বামীর প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং স্বামীও তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" — (তিরমিজি: ১১৬১)

৩. যিনার দিকে নিয়ে যায় এমন সব পথ বন্ধ করুন

  • মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া, পুরুষদের সাথে অবাধ মেলামেশা—সব বন্ধ করতে হবে।
  • পর্দা ও হিজাবের বিধান কঠোরভাবে পালন করতে হবে।
  • যিনাপ্রবণ লোকদের থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে—এটি প্রশ্নকর্তার নসিহত সঠিক।

৪. আত্মসমালোচনা ও আখিরাতের ভয় জাগিয়ে দিন

  • জাহান্নামের শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিন।
  • জান্নাতের নেয়ামতের কথা বলুন।
  • মৃত্যুকে স্মরণ করতে বলুন।

৫. একজন বিশ্বস্ত আলিমা/মহিলা শিক্ষিকার সাথে পরামর্শ করতে বলুন

  • যদি বোন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন, তবে একজন নির্ভরযোগ্য আলিমা বা মহিলা ইসলামি শিক্ষিকার সাথে পরামর্শ করা ভালো।
  • প্রয়োজনে ইসলামি কাউন্সেলিং করাতে পারেন।

৬. দুআ শিখিয়ে দিন

  • رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ ("হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবা কবুল করুন; নিশ্চয়ই আপনি তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।")
  • اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ ("হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করি।")

৭. স্বামীর হক আদায়ের ব্যাপারে বাস্তব পদক্ষেপ

  • স্বামীর জন্য বেশি বেশি দুআ করা।
  • স্বামীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা।
  • সংসারের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া।
  • সন্তানদের ভালোভাবে লালন-পালন করা।

পঞ্চমত: একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

স্বামীকে জানানো প্রসঙ্গে: যদি স্বামী না জানেন এবং বোন তাওবা করেন, তবে স্বামীকে জানানো জরুরি নয়। বরং অনেক আলিম বলেছেন, জানালে সংসার ভেঙে যেতে পারে, যা আরও বড় গুনাহের কারণ হতে পারে। তবে যদি স্বামী জানতে চান বা কোনোভাবে জেনে যান, তাহলে মিথ্যা বলা যাবে না; সততার সাথে উত্তর দিতে হবে।

ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) বলেছেন:

"গোপন গুনাহের ক্ষেত্রে গোপন রাখা এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করা উত্তম; কারণ প্রকাশ করলে ফিতনা ছড়ায়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৩০)


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | করণীয় | |------|--------| | তাওবা | আন্তরিক অনুতাপ, পরিত্যাগ, ভবিষ্যতে না করার সংকল্প | | স্বামীর হক | ভবিষ্যতে পূর্ণ বিশ্বস্ততা, সেবা, ভালোবাসা | | স্বামীকে জানানো | না জানালে জানানো জরুরি নয়; গোপনেই তাওবা | | নামাজ | সালাতুল তাওবা, নফল নামাজ, ইস্তিগফার | | সদকা | গোপন গুনাহের কাফফারা হিসেবে | | দূরত্ব | যিনাপ্রবণ লোক ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ দূরে | | দুআ | রাব্বিগফিরলি..., আল্লাহুম্মা আসআলুকাল আফওয়া... | | পরামর্শ | বিশ্বস্ত আলিমা/শিক্ষিকার সাথে পরামর্শ |

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: বোনকে বোঝান যে, আল্লাহর রহমত অসীম। তিনি যদি আন্তরিক তাওবা করেন, আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করবেন। আল্লাহ বলেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন; তিনিই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" — (সূরা যুমার: ৫৩)

উপসংহার: বোনকে সবচেয়ে বড় নসিহত হলো—আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া, আন্তরিক তাওবা করা, স্বামীর প্রতি পূর্ণ বিশ্বস্ততা রক্ষা করা, এবং যিনার দিকে নিয়ে যায় এমন সব পথ বন্ধ করা। প্রশ্নকর্তার নসিহত সঠিক; এর সাথে উপরোক্ত বিষয়গুলো যোগ করলে বোন ইনশাআল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন এবং সঠিক পথে চলতে পারবেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন এবং আন্তরিক তাওবার তাওফিক দিন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.