দত্তক সন্তানকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দেওয়া যাবে কি?

Family Life · Hanafi

Question No: 5854
Questioner: Masuma 2231
Question Asked: 23 Sep 2026, 11:52 AM
Reviewed & Published: 23 Sep 2026, 12:42 PM
Views: 42
Tokens: 3,499
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বাচ্চা দত্তক যদি এতিমখানা থেকে নেয়া হয় এবং বাচ্চার বাবা মায়ের পরিচয় না জানা যায় সেক্ষেত্রে কি নিজেদের পরিচয় বাচ্চাকে দেয়া যাবে?

Answer

এতিমখানা থেকে দত্তক নেওয়া বাচ্চাকে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নটি এই মর্মে যে, এতিমখানা থেকে এমন বাচ্চা দত্তক নেওয়া হয়েছে যার বাবা-মায়ের পরিচয় জানা যায় না। সেক্ষেত্রে কি দত্তক গ্রহণকারী পরিবার নিজেদের পরিচয় (অর্থাৎ বাচ্চাকে নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয়) দিতে পারবে?

ইসলামী বিধান

মূলনীতি: দত্তক গ্রহণ ইসলামে স্বীকৃত, কিন্তু বংশীয় পরিচয় পরিবর্তন নয়

ইসলামে দত্তক গ্রহণ (তাবান্নী) বৈধ, তবে দত্তক সন্তানকে প্রকৃত সন্তানের মতো বংশীয় পরিচয়ে সম্পৃক্ত করা জায়েয নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

اُدْعُوْهُمْ لِاٰبَآئِهِمْ هُوَ اَقْسَطُ عِنْدَ اللّٰهِ ۚ فَاِنْ لَّمْ تَعْلَمُوْا اٰبَآءَهُمْ فَاِخْوَانُكُمْ فِی الدِّیْنِ وَمَوَالِیْكُمْ ۚ

"তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো; আল্লাহর কাছে এটাই ইনসাফপূর্ণ। যদি তোমরা তাদের পিতৃপরিচয় না জানো, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই ও বন্ধু।"

— (সূরা আহযাব: ৫)

হাদীসের দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ غَيْرُ أَبِيهِ فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حَرَامٌ

"যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে নিজের পিতা ছাড়া অন্য কারো দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত করে, তার জন্য জান্নাত হারাম।"

— (সহীহ বুখারী: ৬৭৬৬; সহীহ মুসলিম: ৬৩)

অন্য হাদীসে এসেছে:

مَنْ انْتَسَبَ إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ أَوْ ادَّعَى مَا لَيْسَ لَهُ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنْ النَّارِ

— (সহীহ বুখারী: ৪৩২৬)

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) উল্লেখ করেন:

"দত্তক গ্রহণকারী ও দত্তক সন্তানের মধ্যে বংশীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং সে (দত্তক সন্তান) নিজের প্রকৃত পিতার দিকেই সম্পৃক্ত থাকবে।"

— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৬৪৪)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে:

"কেউ যদি কোনো বাচ্চাকে দত্তক নেয়, তবে সে বাচ্চা তার (দত্তক গ্রহণকারীর) বংশের অন্তর্ভুক্ত হবে না।"

— (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ২, পৃ. ২৭০)

প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর

যদি বাচ্চার বাবা-মায়ের পরিচয় জানা না যায়

এক্ষেত্রে দুটি দিক বিবেচনা করতে হবে:

১. বংশীয় পরিচয় (নাসাব):

যেহেতু বাচ্চার প্রকৃত বাবা-মায়ের পরিচয় জানা যায় না, তাই বাচ্চাকে দত্তক গ্রহণকারীর নিজের সন্তান হিসেবে বংশীয় পরিচয় দেওয়া জায়েয নয়। তবে বাচ্চার প্রকৃত পিতৃপরিচয় অজানা থাকায় তাকে দত্তক গ্রহণকারীর নামের সাথে সম্বোধন করা যাবে শর্তসহ — অর্থাৎ এটা স্পষ্ট থাকতে হবে যে এটি বংশীয় সম্পর্ক নয়, বরং লালন-পালনের সম্পর্ক।

২. লালন-পালন ও পারিবারিক পরিচয়:

বাচ্চাকে পরিবারের সদস্য হিসেবে লালন-পালন করা, স্নেহ-মমতা দেওয়া, তার ভরণ-পোষণ করা — এসব বৈধ ও সওয়াবের কাজ। তবে তাকে "আমার ছেলে/মেয়ে" বলে পরিচয় দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

সমাধান ও করণীয়

১. বাচ্চাকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় না দেওয়া:

বাচ্চাকে নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয় দেওয়া যাবে না। বরং তাকে বলা যাবে যে, "আমরা তোমাকে লালন-পালন করছি, তুমি আমাদের কাছে আমানত।" অথবা "তুমি আমাদের পরিবারের একজন সদস্য।"

২. বাচ্চার প্রকৃত পরিচয় অজানা থাকলে:

যেহেতু বাচ্চার বাবা-মায়ের পরিচয় জানা যায় না, তাই বাচ্চাকে দত্তক গ্রহণকারীর নামের সাথে সম্বোধন করা যাবে, তবে এটা বংশীয় সম্পর্ক হিসেবে নয়, বরং পরিচয়ের সুবিধার্থে। যেমন: "অমুকের ছেলে/মেয়ে" বলে ডাকা যাবে, কিন্তু এটা বিশ্বাস করা যাবে না যে সে প্রকৃত সন্তান।

৩. বাচ্চা বড় হলে তাকে সত্য জানানো:

বাচ্চা বড় হলে এবং বোঝার মতো হলে তাকে সত্যতা জানানো উচিত যে, সে দত্তক নেওয়া হয়েছে। এতে করে ভবিষ্যতে বিবাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান পালন করা সহজ হবে।

৪. পর্দা ও মাহরাম সম্পর্ক:

দত্তক সন্তান দত্তক গ্রহণকারীর মাহরাম (যাদের সাথে পর্দা নেই) হবে না। বাচ্চা বালেগ হওয়ার পর পর্দার বিধান প্রযোজ্য হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَاِنْ لَّمْ تَعْلَمُوْا اٰبَآءَهُمْ فَاِخْوَانُكُمْ فِی الدِّیْنِ وَمَوَالِیْكُمْ

— (সূরা আহযাব: ৫)

৫. میراث (উত্তরাধিকার):

দত্তক সন্তান দত্তক গ্রহণকারীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে না। তবে ইচ্ছা করলে ওসিয়তের মাধ্যমে এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে কিছু দেওয়া যাবে।

বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) তার "ফাতাওয়া উসমানি" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:

"দত্তক সন্তানকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দেওয়া জায়েয নয়। তবে লালন-পালনের ক্ষেত্রে তাকে সন্তানের মতো স্নেহ-মমতা করা যাবে।"

— (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩০)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন"-এ সূরা আহযাবের ৫ নম্বর আয়াতের তাফসীরে লেখেন:

"ইসলামে দত্তক গ্রহণ নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু দত্তকের মাধ্যমে বংশীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না।"

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|------| | বাচ্চাকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দেওয়া | জায়েয নয় | | লালন-পালন করা, স্নেহ-মমতা দেওয়া | জায়েয ও সওয়াবের কাজ | | বাচ্চার প্রকৃত পরিচয় অজানা থাকলে | দত্তক গ্রহণকারীর নামে সম্বোধন করা যাবে (বংশীয় সম্পর্ক নয়) | | বাচ্চা বড় হলে সত্য জানানো | কর্তব্য | | মাহরাম সম্পর্ক | প্রতিষ্ঠিত হবে না | | উত্তরাধিকার | প্রতিষ্ঠিত হবে না |

উপসংহার: এতিমখানা থেকে দত্তক নেওয়া বাচ্চার বাবা-মায়ের পরিচয় না জানা গেলেও তাকে নিজেদের সন্তান হিসেবে বংশীয় পরিচয় দেওয়া যাবে না। তবে লালন-পালনের সম্পর্কে তাকে পরিবারের সদস্য হিসেবে রাখা যাবে এবং প্রয়োজনে দত্তক গ্রহণকারীর নামে সম্বোধন করা যাবে — শর্ত এই যে, এটি বংশীয় সম্পর্ক হিসেবে বিশ্বাস করা যাবে না। বাচ্চা বড় হলে তাকে সত্য জানানো কর্তব্য।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.