ফাতেহা ই ইয়াজদাহম কি শরীয়তসম্মত?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
Answer
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম: শরীয়তের দৃষ্টিতে বিস্তারিত বিশ্লেষণ
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার জন্য, যিনি দ্বীনের সঠিক পথ দেখিয়েছেন। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবায়ে কেরামের উপর।
ভূমিকা
প্রশ্নে উল্লেখিত "ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম" (ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহুম) হলো ১১ই রবিউস সানি উপলক্ষে বাংলাদেশে বিশেষভাবে পালিত একটি অনুষ্ঠান, যা সুফি ধারার একটি বিশেষ সম্প্রদায় (বিশেষত চিশতিয়া-সাবেরিয়া তরিকার অনুসারী) দ্বারা আয়োজিত হয়। এটিকে কেন্দ্র করে সরকারি ছুটি প্রদান করা হয়। নিচে ধারাবাহিকভাবে এর পরিচয়, উৎপত্তি, বাংলাদেশে পালনের ধরন এবং শরীয়তের বিধান আলোচনা করা হলো।
১. ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম কী?
"ইয়াজদাহম" শব্দটি ফারসি ভাষার, যার অর্থ এগারো (১১)। "ফাতেহা" অর্থ সূচনা বা ফাতিহা পাঠ। সুতরাং "ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম" অর্থ এগারো তারিখের ফাতেহা।
এটি মূলত হযরত শাহ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর ওফাতের ১১তম দিন উপলক্ষে (অথবা কোনো বিশেষ পীরের ওফাতের ১১তম দিনে) আয়োজিত একটি বিশেষ মাহফিল, যেখানে কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, মিলাদ ও খাদ্য বিতরণ করা হয়।
বিশেষভাবে লক্ষণীয়: বাংলাদেশে এটি প্রধানত হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর ওফাত দিবসের ১১তম দিন উপলক্ষে সিলেট অঞ্চলে ব্যাপকভাবে পালিত হয়। হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর ওফাত হয় ২০ শাওয়াল (মতান্তরে ২৬ শাওয়াল)। এর ১১তম দিন হিসেবে ১১ই রবিউস সানি বা সংশ্লিষ্ট তারিখে এই অনুষ্ঠান হয়।
২. এর উৎপত্তি কোথা থেকে?
ঐতিহাসিক পটভূমি:
- উৎপত্তি: এই প্রথার মূল উৎস সুফি তরিকার অনুসারীদের মধ্যে পীরের ওফাতের পর নির্দিষ্ট দিনে (৩য়, ৭ম, ১০ম, ১১তম, ৪০তম) ফাতেহা ও খতমে কুরআন আয়োজনের রীতি। এটি ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষত চিশতিয়া তরিকার প্রভাবে বিস্তার লাভ করে।
- বাংলাদেশে: সিলেট অঞ্চলে হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে এই প্রথা বিশেষভাবে প্রচলিত। পরবর্তীতে এটি একটি সামাজিক-ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়।
- সরকারি স্বীকৃতি: বাংলাদেশে ১৯৭০-এর দশক থেকে বিভিন্ন সময়ে এই দিনে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে বহাল থাকে।
শরীয়তের মানদণ্ডে উৎপত্তির মূল্যায়ন:
ইসলামে কোনো ব্যক্তির ওফাতের পর নির্দিষ্ট দিন গণনা করে বিশেষ অনুষ্ঠান করার কোনো ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহে নেই। রাসূল ﷺ-এর ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরাম কখনো তাঁর ওফাত দিবস বা ১১তম দিন উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান করেননি। বরং তাঁরা মৃত্যুকে স্মরণ করে ইবাদত বাড়াতেন, কিন্তু নির্দিষ্ট দিনকে কেন্দ্র করে উৎসব বা মাহফিলের রীতি চালু করেননি।
৩. বাংলাদেশে কী উপলক্ষে এটি পালন করা হয়?
বাংলাদেশে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম প্রধানত নিম্নলিখিত উপলক্ষে পালিত হয়:
| উপলক্ষ | বিবরণ | |--------|--------| | হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর ওফাত | সিলেটে ১১তম দিনে বিশেষ মাহফিল, মাজার জিয়ারত, খাদ্য বিতরণ | | অন্যান্য পীর-আউলিয়ার ওফাত | বিভিন্ন খানকাহ ও মাজারে ১১তম দিনের ফাতেহা | | সরকারি ছুটি | সরকারি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ছুটি ঘোষণা (ধর্মীয় বিধান নয়, বরং প্রশাসনিক) |
মনে রাখা জরুরি: সরকারি ছুটি প্রদান করা একটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটি দ্বীনের কোনো বিধান বা ইবাদতের স্বীকৃতি নয়। কোনো বিষয়ে সরকারি ছুটি থাকা মানেই সেটি শরীয়তসম্মত হয়ে যায় না।
৪. এটি কি শরীয়তসম্মত?
মূলনীতি:
ইসলামে ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো কুরআন ও সুন্নাহ। রাসূল ﷺ বলেছেন:
"مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ" "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করবে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।" — সহীহ বুখারী: ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম: ১৭১৮
আরও ইরশাদ হয়েছে:
"وَمَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ" "যে ব্যক্তি এমন আমল করবে যার উপর আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।" — সহীহ মুসলিম: ১৭১৮
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের শরীয়তসম্মত দিকগুলো:
১. কুরআন তিলাওয়াত: যদি মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন পড়া হয় এবং সাওয়াব পৌঁছানোর নিয়তে হয়, তবে তা মূলত জায়েজ। তবে নির্দিষ্ট দিন-তারিখকে আবশ্যক বা বিশেষ ফজিলতপূর্ণ মনে করা বিদআত।
২. দোয়া ও ইস্তিগফার: মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা সুন্নত। রাসূল ﷺ মৃতের জন্য দোয়া করতেন।
৩. খাদ্য বিতরণ: গরিব-মিসকিনকে খাদ্য দান করা সাওয়াবের কাজ। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ আয়োজনকে দ্বীনের অংশ মনে করা বা না করলে গুনাহ মনে করা বিদআত।
শরীয়তবিরোধী দিকগুলো:
১. নির্দিষ্ট দিন-তারিখকে দ্বীনের অংশ মনে করা: ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট দিনে মৃতের জন্য বিশেষ ফাতেহা বা মাহফিলের বিধান নেই। এটি বিদআত।
২. মৃত ব্যক্তির নামে বিশেষ আয়োজন: মৃত ব্যক্তির নামে বিশেষ খাবার তৈরি, যা শুধু সেই উপলক্ষে হয়—এটি সুন্নাহসম্মত নয়।
৩. মাজারে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান: মাজারে গিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে ফাতেহা পড়া, চাদর চড়ানো, মান্নত করা—এসবের অনেকটাই শিরক ও বিদআতের সীমা স্পর্শ করে।
৪. সামাজিক প্রথা হিসেবে পালন: যদি এটি ধর্মীয় আবশ্যকতা হিসেবে পালিত হয় এবং না করলে গুনাহ মনে করা হয়, তবে তা বিদআত।
ফিকহের সিদ্ধান্ত:
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
"মৃতের জন্য নির্দিষ্ট দিনে খাবার তৈরি করা এবং লোকদের জমা করা—এটি যদি মৃতের ওসিয়ত না হয় এবং শুধু প্রথা হিসেবে হয়, তবে তা মাকরুহ।"
আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর" ও "ইমদাদুল ফাতাওয়া"-তে বলেন:
"মৃতের জন্য ঈসালে সাওয়াব করা জায়েজ, কিন্তু নির্দিষ্ট দিন-তারিখ নির্ধারণ করে বিশেষ অনুষ্ঠান করা এবং তাকে দ্বীনের অংশ মনে করা বিদআত।"
মুফতি মুহাম্মাদ শফি (রহ.) "মা'আরিফুল কুরআন"-এ বলেন:
"ইসলামে মৃত্যুকে স্মরণ করা ও দোয়া করা সুন্নত, কিন্তু মৃত্যুবার্ষিকী বা নির্দিষ্ট দিনে উৎসব করা ইসলামের শিক্ষা নয়।"
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি"-তে বলেন:
"মৃতের জন্য দোয়া ও কুরআন পাঠ জায়েজ, কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ আয়োজনকে দ্বীনের অংশ মনে করা বিদআত। সরকারি ছুটি থাকলেও তা দ্বীনের বৈধতার প্রমাণ নয়।"
৫. প্রসিদ্ধ আলেমদের অভিমত
| আলেম | অভিমত | |------|--------| | ইমাম আবু হানিফা (রহ.) | মৃতের জন্য দোয়া ও সাদাকা জায়েজ, কিন্তু নির্দিষ্ট দিনের অনুষ্ঠান সুন্নাহে নেই | | ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) | ঈসালে সাওয়াব জায়েজ, তবে প্রথাগত আয়োজন বিদআত | | ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) | মৃতের জন্য কুরআন পাঠ জায়েজ, নির্দিষ্ট দিনের বিধান নেই | | ইবনে আবিদিন (রহ.) | নির্দিষ্ট দিনে খাবার তৈরি ও জমা করা মাকরুহ | | আশরাফ আলী থানভী (রহ.) | নির্দিষ্ট দিনকে দ্বীনের অংশ মনে করা বিদআত | | মুহাম্মাদ শফি (রহ.) | মৃত্যুবার্ষিকী পালন ইসলামের শিক্ষা নয় | | তাকি উসমানি (দা.বা.) | সরকারি ছুটি দ্বীনের বৈধতার প্রমাণ নয় |
৬. শরীয়তসম্মত না হলে কী পদক্ষেপ নেয়া যায়?
ব্যক্তিগত পর্যায়ে:
১. নিজে অংশগ্রহণ না করা: যদি অনুষ্ঠানে বিদআত বা শিরকের কাজ হয়, তবে তা থেকে বিরত থাকা। ২. সঠিক জ্ঞান প্রচার: পরিবার ও সমাজে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সঠিক তথ্য পৌঁছানো। ৩. মৃতের জন্য দোয়া করা: নির্দিষ্ট দিনের বাইরে নিয়মিত মৃতের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করা। ৪. সাদাকা করা: মৃতের নামে গরিব-মিসকিনকে গোপনে সাহায্য করা।
সামাজিক পর্যায়ে:
১. আলেমদের ভূমিকা: মসজিদ ও মাদরাসায় সঠিক মাসআলা তুলে ধরা। ২. সংলাপ: যারা এই প্রথা পালন করেন তাদের সাথে ভালোভাবে কথা বলে বোঝানো। ৩. বিকল্প আয়োজন: নির্দিষ্ট দিনের বদলে যেকোনো সময় মৃতের জন্য দোয়া ও কুরআন খতমের আয়োজন করা।
প্রশাসনিক পর্যায়ে:
১. সরকারি ছুটির বিষয়ে: এটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তবে ধর্মীয় বিধান হিসেবে নয়, বরং সামাজিক প্রথা হিসেবে ছুটি দেয়া হয়। মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত সরকারি ছুটিকে দ্বীনের বৈধতা হিসেবে না দেখা। ২. আইনগত পদক্ষেপ: যদি কোনো অনুষ্ঠানে শিরক-বিদআত বা আইনবিরোধী কাজ হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো। ৩. গঠনমূলক দাবি: আলেমদের উচিত সরকারের কাছে দাবি করা যে, ছুটি দিলে তা যেন দ্বীনের অংশ হিসেবে না হয়, বরং সাংস্কৃতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে হয়।
৭. সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
| বিষয় | সিদ্ধান্ত | |------|----------| | ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের মূল উৎস | সুফি তরিকার প্রথা, সুন্নাহে প্রমাণিত নয় | | নির্দিষ্ট দিনে ফাতেহা | বিদআত (যদি দ্বীনের অংশ মনে করা হয়) | | মৃতের জন্য দোয়া ও কুরআন পাঠ | জায়েজ (নির্দিষ্ট দিনের শর্ত ছাড়া) | | মৃতের নামে খাবার বিতরণ | জায়েজ (যদি রিয়া ও প্রথা না হয়) | | সরকারি ছুটি | প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, দ্বীনের বৈধতা নয় | | শরীয়তসম্মত? | নির্দিষ্ট দিন-তারিখকে দ্বীনের অংশ মনে করা বিদআত; তবে সাধারণ দোয়া-সাদাকা জায়েজ |
চূড়ান্ত ফতোয়া:
**প্রচলিত পদ্ধতিতে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম পালন করা বিদ'আত।
সরকারি ছুটি প্রদান দ্বীনের বৈধতার প্রমাণ নয়। মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করা এবং বিদআত থেকে বিরত থাকা।