মেয়েদের তায়কোয়ান্দো শেখা ইসলামে জায়েজ কি না, পুরুষ শিক্ষকের কাছে শেখা, ছেলে-মেয়ে একসাথে অনুশীলন জায়েজ কি না?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
মেয়েদের তায়কোয়ান্দো শেখা নিয়ে ইসলামি শরীয়াহ কী?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নে জানতে চাওয়া হয়েছে—মেয়েদের তায়কোয়ান্দো (মার্শাল আর্ট) শেখার ইসলামি বিধান কী? আর যদি ছেলে-মেয়ে উভয় মিলে শেখানো হয় এবং শিক্ষক পুরুষ হন, তাহলে বিধান কী?
১. মূলনীতি: নারীর জন্য শরীয়তের সীমারেখা
ইসলামে নারীর জন্য পর্দা, শালীনতা ও সংরক্ষণের বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ "তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং প্রাচীন জাহেলি যুগের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।" — (সূরা আহযাব: ৩৩)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ "তারা যেন নিজেদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের জন্য পদাঘাত না করে।" — (সূরা নূর: ৩১)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, নারীর প্রতিটি নড়াচড়া, ভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গি এমন হওয়া উচিত নয় যা পরপুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বা ফিতনার কারণ হয়।
২. তায়কোয়ান্দো/মার্শাল আর্ট শেখার বিধান
(ক) পুরুষদের জন্য
পুরুষদের জন্য শারীরিক কসরত, আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ (যেমন তীরন্দাজি, ঘোড়দৌড়, কুস্তি) বৈধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের উৎসাহ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে:
عَلِّمُوا أَبْنَاءَكُمُ السِّبَاحَةَ وَالرَّمْيَ "তোমাদের সন্তানদের সাঁতার ও তীরন্দাজি শেখাও।" — (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান)
তবে তায়কোয়ান্দোতে যেহেতু আঘাত-প্রতিঘাত, চিৎকার, এবং অনেক সময় সংগীত-তালের সাথে অনুশীলন হয়, তাই এগুলো শরীয়তের সীমার মধ্যে থাকলে জায়েজ, নইলে নাজায়েজ।
(খ) মেয়েদের জন্য — মূল বিধান
মেয়েদের জন্য তায়কোয়ান্দো শেখা শর্তসাপেক্ষে জায়েজ হতে পারে, তবে সাধারণত নাজায়েজ বা মাকরূহে তাহরিমি হওয়ার দিকটিই প্রবল, কারণ:
- পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হয় — প্রশিক্ষণের সময় শরীরের অঙ্গভঙ্গি, লাফালাফি, দৌড়ানো ইত্যাদি পরপুরুষের সামনে বা ক্যামেরায় ধারণ করা ফিতনার কারণ।
- পুরুষ শিক্ষকের সামনে প্রশিক্ষণ — এতে খালওয়া (নির্জনতা) বা দৃষ্টি বিনিময়ের আশঙ্কা থাকে, যা হারাম।
- সংগীত ও তালের ব্যবহার — অনেক মার্শাল আর্টে সংগীত বাজানো হয়, যা ইসলামে নিষিদ্ধ।
- শরীরের গঠন ও পোশাক — টাইট পোশাক বা শরীরের অবয়ব প্রকাশ পাওয়া পোশাক পরা নারীর জন্য নিষিদ্ধ।
- আঘাত-প্রতিঘাত ও চিৎকার — নারীর স্বাভাবিক শালীনতার পরিপন্থী।
ফতোয়ায়ে উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়া-তে স্পষ্ট আছে, নারীর জন্য এমন খেলাধুলা বা কসরত নাজায়েজ, যাতে শরীরের অঙ্গভঙ্গি প্রকাশ পায় বা পরপুরুষ দেখে। (ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ৩৪৫; ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৬০)
৩. যদি ছেলে-মেয়ে উভয় মিলে শেখায়?
এ অবস্থায় সম্পূর্ণ নাজায়েজ। কারণ:
- ছেলে-মেয়ে একসাথে অনুশীলন করা = খালওয়া ও ইখতিলাত (পর্দার সম্পূর্ণ লঙ্ঘন)।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ "কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হবে না; তাদের তৃতীয়জন হবে শয়তান।" — (তিরমিজি: ২১৬৫)
- ইখতিলাতের ক্ষেত্রে তো আরও কঠিন। ফকিহগণ বলেন, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ফিতনার দরজা খুলে দেয়। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৪৮)
৪. যদি শিক্ষক পুরুষ হন?
পুরুষ শিক্ষকের কাছে মেয়ের তায়কোয়ান্দো শেখা নাজায়েজ, যদি না নিম্নলিখিত শর্ত পূর্ণ হয়:
- মাহরাম শিক্ষক হওয়া (যেমন বাবা, ভাই, চাচা)।
- পূর্ণ পর্দা রক্ষা করা।
- নির্জনতা না থাকা — অন্য মাহরাম উপস্থিত।
- শরীর স্পর্শ না করা — প্রশিক্ষণে স্পর্শ লাগলে তা হারাম।
- সংগীত ও অশ্লীল ভঙ্গি না থাকা।
কিন্তু বাস্তবে তায়কোয়ান্দোতে স্পর্শ, ধাক্কা, ভঙ্গি ইত্যাদি লাগে—তাই সাধারণভাবে নাজায়েজ।
৫. বিকল্প সমাধান
মেয়েদের জন্য ইসলামি শরীয়তসম্মত বিকল্প:
- নারী শিক্ষিকার কাছে, শুধু মেয়েদের পরিবেশে, পূর্ণ পর্দার সাথে ঘরে বা মহিলাদের জিমে শারীরিক কসরত।
- সাঁতার শেখা — মাহরামের তত্ত্বাবধানে, পূর্ণ পর্দায়।
- আত্মরক্ষার প্রয়োজন হলে — ঘরে মাহরামের সাথে প্রাথমিক কৌশল শেখা।
- শরীর সুস্থ রাখতে — হাঁটা, ঘরের ভেতরে ব্যায়াম, যা পর্দার পরিপন্থী নয়।
৬. সারসংক্ষেপ ফতোয়া
| অবস্থা | বিধান | |---|---| | মেয়ে একা, নারী শিক্ষিকা, পূর্ণ পর্দা, সংগীতমুক্ত | জায়েজ (শর্তসাপেক্ষে) | | মেয়ে + পুরুষ শিক্ষক | নাজায়েজ | | ছেলে-মেয়ে একসাথে | নাজায়েজ (হারাম) | | সংগীত/টাইট পোশাক/স্পর্শ | নাজায়েজ | | মাহরাম শিক্ষক, ঘরে, পর্দায় | জায়েজ |
মূল কথা: মেয়েদের তায়কোয়ান্দো শেখা সাধারণভাবে নাজায়েজ, বিশেষত পুরুষ শিক্ষক বা ছেলে-মেয়ে মিশ্র পরিবেশে। প্রয়োজন হলে শুধু নারী শিক্ষিকার কাছে, পূর্ণ পর্দায়, সংগীতমুক্ত পরিবেশে শেখা যেতে পারে।
আরবি দলিল
وَالْمُؤْمِنَاتُ يَغُضُّونَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ "মুমিন নারীরা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে ও লজ্জাস্থান হেফাজত করে।" — (সূরা নূর: ৩১)
الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ "নারী হলো সতর; যখন সে বের হয়, শয়তান তার দিকে তাকিয়ে থাকে।" — (তিরমিজি: ১১৭৩)
তথ্যসূত্র
- ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ৩
- ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ৪
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ৬
- বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফি)
- আল-হিদায়া, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ