বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার শরীয়াহ বিধান — নারী নিজে প্রস্তাব পাঠাতে পারবে কি? দ্বীনি মেট্রিমনিয়াল সাইট ব্যবহারের হুকুম,
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি একবারে জেনারেল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে দ্বীনে ফেরা একজন মেয়ে। আমার পরিবার খুব বেশি দ্বীনদার নয়। আমার বিয়ের জন্য পরিবার থেকে ছেলে দেখা হচ্ছে। যে প্রস্তাবগুলো আসে বেশিরভাগ ছেলেই বেদ্বীন। কিন্তু আমি দ্বীনদার একজনকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক। বিভিন্ন দ্বীনি মেট্রিমনিয়্যাল সাইটে আমার দ্বীনদার কাউকে পছন্দ হলে প্রস্তাব পাঠানো কি ঠিক হবে? আমার মা-বাবা এটা করতে চান না। কারণ আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়েপক্ষ থেকে নাকি প্রস্তাব পাঠানো ঠিক নয়। এতে সম্মান কমে যায় বা মেয়েপক্ষকে ছোট করে দেখা হয়। আমি এ ব্যাপারে শরীয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে পরামর্শ চাচ্ছি।
Answer
বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার ব্যাপারে শরীয়াহর দৃষ্টিকোণ
উত্তর (ফতোয়া নং: 5782)
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين، أما بعد:
সংক্ষিপ্ত উত্তর
শরীয়াহর দৃষ্টিতে নারী নিজে সরাসরি বা মেট্রিমনিয়াল সাইটের মাধ্যমে পাত্রকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো উচিত নয় — এটি ইসলামী আদব ও হায়ার পরিপন্থী। তবে পাত্রীপক্ষের পক্ষ থেকে মাহরাম (যেমন বাবা, ভাই, চাচা, মামা) বা নির্ভরযোগ্য দ্বীনদার অভিভাবকের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানো সম্পূর্ণ জায়েয ও শরীয়তসম্মত। আপনার ক্ষেত্রে করণীয় হলো—আপনি নিজে প্রস্তাব না পাঠিয়ে, কোনো দ্বীনদার অভিভাবক বা নির্ভরযোগ্য দ্বীনি বোন/পরিবারের মাধ্যমে যোগাযোগ করাবেন।
বিস্তারিত আলোচনা
১. ইসলামে বিয়ের প্রস্তাবের মূলনীতি
ইসলামে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া বা গ্রহণ করা একটি স্বাভাবিক ও বৈধ বিষয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْتَأْمِرْ»
— (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১০৮৭)
অর্থাৎ, কেউ বিয়ের প্রস্তাব দিলে সে যেন পরিবারের সাথে পরামর্শ করে।
আর কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا عَرَّضْتُم بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ﴾
— (সূরা বাকারা: ২৩৫)
অর্থাৎ, নারীদের বিয়ের প্রস্তাব সম্পর্কে ইঙ্গিতে কথা বলাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই।
২. নারীর পক্ষ থেকে সরাসরি প্রস্তাব পাঠানো
শরীয়াহর দৃষ্টিতে নারীর পক্ষ থেকে সরাসরি পাত্রকে প্রস্তাব পাঠানো বা মেট্রিমনিয়াল সাইটে নিজে যোগাযোগ করা নিম্নলিখিত কারণে অনুচিত বা খেলাফে আওলা (নিকৃষ্ট):
ক) হায়া ও পর্দার বিধান লঙ্ঘন:
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ﴾
— (সূরা নূর: ৩১)
নারীর জন্য নিজেকে প্রকাশ করা ও অপরিচিত পুরুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা অনুচিত।
খ) হাদীসের নির্দেশনা:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الْحَيَاءُ مِنَ الْإِيمَانِ»
— (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৪)
অর্থাৎ, লজ্জা ঈমানের অংশ। নারীর পক্ষ থেকে সরাসরি প্রস্তাব পাঠানো এই হায়ার পরিপন্থী।
গ) ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি:
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন:
«وَلَا يَجُوزُ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَخْطُبَ الرَّجُلَ بِنَفْسِهَا، بَلْ يَتَوَلَّى ذَلِكَ وَلِيُّهَا»
— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ১৪৭)
অর্থাৎ, নারীর জন্য নিজে পুরুষকে প্রস্তাব দেওয়া জায়েয নয়; বরং তার অভিভাবক এই কাজ করবেন।
৩. অভিভাবকের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানো
অভিভাবক বা মহররমের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানো সম্পূর্ণ জায়েয।
এমনকি যদি পাত্রীপক্ষ থেকে প্রস্তাব যায়, তাতেও কোনো শরীয়াহ বাধা নেই। প্রমাণ:
-
হযরত খাদিজা (রা.) নিজে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন — তবে নাফিসা বিনতে মুনিয়া (রা.)-এর মাধ্যমে।
— (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৮৯৪; ইবনে হিশাম, সীরাত, খণ্ড ১, পৃ. ২৩৫) -
হযরত উমর (রা.) তাঁর কন্যা হযরত হাফসা (রা.)-এর বিয়ের প্রস্তাব হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উসমান (রা.)-কে পাঠিয়েছিলেন।
— (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫১২২) -
হযরত উসমান (রা.)-এর কন্যার বিয়ের প্রস্তাব সম্পর্কে হাদীসে বর্ণিত আছে।
— (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২১০১)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী:
পাত্রীপক্ষ থেকে প্রস্তাব পাঠানো জায়েয, তবে তা অভিভাবকের মাধ্যমে হতে হবে। পাত্রী নিজে সরাসরি যোগাযোগ করবে না।
— (আল-হিদায়া, খণ্ড ২, পৃ. ৩০৫; ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৭)
৪. মেট্রিমনিয়াল সাইট ব্যবহারের বিধান
দ্বীনি মেট্রিমনিয়াল সাইট ব্যবহার করা জায়েয, তবে শর্তসাপেক্ষে:
- পাত্রী নিজে সরাসরি প্রস্তাব পাঠাবে না — বরং অভিভাবক বা নির্ভরযোগ্য দ্বীনদার ব্যক্তির মাধ্যমে পাঠাবে।
- ছবি আদান-প্রদান বা ব্যক্তিগত চ্যাট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- মহররমের উপস্থিতিতে যোগাযোগ হতে হবে।
- প্রতারণা ও মিথ্যা তথ্য দেওয়া যাবে না।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে উল্লেখ করেছেন:
«اگر لڑکی کے سرپرست یا کوئی محرم اس کے لیے مناسب رشتہ تلاش کرنے کے لیے انٹرنیٹ کا استعمال کرے تو جائز ہے، بشرطیکہ لڑکی خود اجنبی مردوں سے رابطہ نہ کرے۔»
— (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৫)
৫. আপনার সামাজিক প্রেক্ষাপট ও অভিভাবকের আপত্তি
আপনার মা-বাবার আপত্তি সামাজিক প্রেক্ষাপটে যুক্তিসঙ্গত, তবে শরীয়াহর দৃষ্টিতে অভিভাবকের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানোতে সম্মান কমে না। বরং এটি ইসলামী আদবের অন্তর্ভুক্ত।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মা'আরিফুল কুরআন»-এ সূরা বাকারা ২৩৫-এর তাফসীরে বলেন:
«اسلام میں عورت کی طرف سے نکاح کا پیغام بھیجنا عیب نہیں، بشرطیکہ یہ پیغام اولیاء یا محرم کے ذریعے ہو۔»
অর্থাৎ, ইসলামে নারীর পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো দোষের নয়, শর্ত হলো তা অভিভাবক বা মহররমের মাধ্যমে হতে হবে।
৬. আপনার জন্য করণীয় (ব্যবহারিক পরামর্শ)
- নিজে সরাসরি প্রস্তাব পাঠাবেন না — এটি অনুচিত।
- আপনার বাবা-মাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন — যে দ্বীনদার পাত্রের সন্ধান করা তাদের দায়িত্ব, এবং এটি সামাজিক সম্মান কমায় না।
- যদি বাবা-মা রাজি না হন, তাহলে কোনো দ্বীনদার চাচা, মামা, ভাই বা নির্ভরযোগ্য দ্বীনি বোন-এর মাধ্যমে যোগাযোগ করান।
- মেট্রিমনিয়াল সাইটে প্রোফাইল তৈরি করতে পারেন, তবে যোগাযোগ হবে অভিভাবকের মাধ্যমে।
- ইস্তিখারা ও দুআ করুন — আল্লাহর কাছে দ্বীনদার জীবনসঙ্গী চেয়ে দুআ করুন:
«اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي زَوْجًا صَالِحًا»
— (মুসনাদে আহমাদ, খণ্ড ৬, পৃ. ২৩১)
- ধৈর্য ধারণ করুন — আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا﴾
— (সূরা তালাক: ২)
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|------| | নারী নিজে সরাসরি প্রস্তাব পাঠানো | অনুচিত | | মেট্রিমনিয়াল সাইটে নিজে যোগাযোগ | অনুচিত | | অভিভাবক/মহররমের মাধ্যমে প্রস্তাব | জায়েয | | দ্বীনি মেট্রিমনিয়াল সাইট ব্যবহার (অভিভাবকের মাধ্যমে) | জায়েয | | পাত্রীপক্ষ থেকে প্রস্তাব পাঠানো | শরীয়তসম্মত, সম্মানহানি নয় |
উপসংহার: আপনি নিজে সরাসরি প্রস্তাব পাঠাবেন না। বরং আপনার বাবা-মাকে রাজি করানোর চেষ্টা করুন, অথবা কোনো দ্বীনদার অভিভাবক বা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করান। এতে শরীয়াহর বিধান রক্ষা হবে এবং আপনার সম্মানও অক্ষুণ্ণ থাকবে।
والله أعلم بالصواب