স্বামী তালাক বলেছে কি না সন্দেহ হলে তালাক হবে কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5776
Questioner: ruhani binte
Question Asked: 21 Sep 2026, 09:41 PM
Reviewed & Published: 21 Sep 2026, 10:11 PM
Views: 9
Tokens: 5,374
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুআলাইকুম।
আমার আর আমার স্বামীর মধ্যে ঝগড়া হয়। তারপর আমি উনাকে বলি আপনি কি আমাকে তালাক বলেছেন।উনি বলে তুই কি আমাকে উসকাস।তুই কি চাস বলি??.একটু পর উনি জানি আমাকে কি জানি একটা গালি দিছে।তারপর আমি বললাম বলেন কি বলরেন।
আর উনি বললো তোরে এটা কইতাম। কইলাম। তুই চাস কইতাম। আচ্চা কইলাম। কই। তারপর আবার দোষ হয়ে যাক। আসলে উনি এগুলাই বলেছে এমন কিছু। আমার মনে নাই।

আমি মুহূর্তে সব ভুলে যাই যে কি বলেছে।মনে হয় যে তালাক বলেছে কিন্তু আসলেই বলেছে কিনা তাও জানিনা।
এখানে কি তালাক হয়েছে??

আর আমার এই সমস্যা থেকে কিভাবে পরিত্রান পাবো।
দয়া করে সাহায্য করুন??

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো। প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নিন: তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য স্বামীর স্পষ্ট বা ইঙ্গিতবাহী তালাকের শব্দ উচ্চারণ করা শর্ত। শুধু সন্দেহ, ভুলে যাওয়া বা মনে হওয়া দ্বারা তালাক পতিত হয় না। ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো—"আল-ইয়াকীন লা ইয়াযুলু বিস-শাক্ক" (নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না)। অর্থাৎ, তালাক হয়েছে বলে নিশ্চিত না হলে তালাক পতিত হয় না।


১. আপনার বর্ণনা অনুযায়ী পরিস্থিতি বিশ্লেষণ

আপনার বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে:

  • স্বামী বলেছে: "তোরে এটা কইতাম। কইলাম। তুই চাস কইতাম। আচ্চা কইলাম। কই।"
  • এরপর আপনি বলেছেন: "তারপর আবার দোষ হয়ে যাক।"
  • আপনি বলেছেন: "আসলে উনি এগুলাই বলেছে এমন কিছু। আমার মনে নাই।"
  • আপনি বলেছেন: "আমি মুহূর্তে সব ভুলে যাই যে কি বলেছে। মনে হয় যে তালাক বলেছে কিন্তু আসলেই বলেছে কিনা তাও জানিনা।"

এখানে মূল বিষয় হলো—আপনি নিশ্চিত নন যে স্বামী প্রকৃতপক্ষে "তালাক" শব্দটি উচ্চারণ করেছে কি না। আপনার মনে হচ্ছে হয়তো বলেছে, কিন্তু নিশ্চিত নন।

ফিকহী মূলনীতি:

"لا يقع الطلاق بالشك"
অর্থ: সন্দেহ দ্বারা তালাক পতিত হয় না।

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী রহ.)-এ উল্লেখ আছে:

"وَلَا يَقَعُ الطَّلَاقُ بِالشَّكِّ بَلْ بِالْيَقِينِ أَوْ غَلَبَةِ الظَّنِّ"
(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩২)

অর্থাৎ, তালাক সন্দেহ দ্বারা পতিত হয় না; বরং নিশ্চিত বিশ্বাস বা প্রবল ধারণা দ্বারা পতিত হয়।

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:

"الطلاق لا يقع بالشك"
(ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক, খণ্ড ১, পৃ. ৩৫৪)

আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য:

যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন যে স্বামী "তালাক" শব্দটি বলেছে কি না, এবং আপনার নিজেরই স্মৃতি অস্পষ্ট, সুতরাং শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক পতিত হয়নি। কারণ তালাকের জন্য নিশ্চিত উচ্চারণ প্রয়োজন, যা এখানে প্রমাণিত নয়।

তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়: আপনার স্বামী যদি সত্যিই "তালাক" শব্দটি বলে থাকে, তাহলে তালাক পতিত হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি যেহেতু নিশ্চিত নন, তাই আপনি তালাক পতিত হয়েছে বলে ধরে নিতে বাধ্য নন। বরং আপনি আসল (মূল অবস্থা) ধরে নেবেন, অর্থাৎ বিবাহ এখনো বহাল আছে।


২. "উসকাস", "চাস" ইত্যাদি শব্দের হুকুম

আপনার স্বামী বলেছে: "তুই কি আমাকে উসকাস। তুই কি চাস বলি??" — এগুলো তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়, বরং প্রশ্নবোধক বা হুমকিমূলক বাক্য। এগুলো দ্বারা তালাক পতিত হয় না।

তবে যদি স্বামী বলে: "তুই চাস তালাক? আচ্চা, তালাক দিলাম" — তাহলে তালাক পতিত হবে। কিন্তু আপনার বর্ণনায় এমন স্পষ্ট উচ্চারণের নিশ্চিত প্রমাণ নেই।


৩. গালি দেওয়ার হুকুম

স্বামী আপনাকে গালি দিয়েছে—এটি গুনাহের কাজ, হারাম। কিন্তু গালি দেওয়া দ্বারা তালাক পতিত হয় না, যদি না গালির মধ্যে তালাকের স্পষ্ট শব্দ থাকে।


৪. আপনার করণীয় ও পরিত্রাণের উপায়

(ক) নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করুন

আপনি স্বামীকে শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করুন: "আপনি কি সত্যিই 'তালাক' শব্দটি বলেছিলেন? যদি বলে থাকেন, তাহলে কতবার বলেছিলেন?"

  • যদি তিনি বলেন "না, আমি তালাক বলিনি" — তাহলে তালাক পতিত হয়নি, নিশ্চিন্ত থাকুন।
  • যদি তিনি বলেন "হ্যাঁ, বলেছিলাম" — তাহলে কতবার বলেছিলেন তা জেনে নিন। একবার বললে এক তালাকে রিজয়ী (প্রত্যাহারযোগ্য) তালাক পতিত হবে। তিনবার বললে তিন তালাক পতিত হবে।

(খ) যদি তালাক পতিত হয়ে থাকে

যদি প্রমাণিত হয় যে এক তালাক পতিত হয়েছে, তাহলে স্বামী ইদ্দতের মধ্যে (তিন মাসিক বা গর্ভবতী হলে সন্তান জন্ম পর্যন্ত) রুজু (প্রত্যাহার) করতে পারবেন। রুজুর জন্য নতুন আকদ বা মোহর প্রয়োজন নেই, শুধু মুখে বলা বা আচরণ দ্বারা রুজু করা যায়।

"وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ ۚ وَلَا يَحِلُّ لَهُنَّ أَن يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ إِن كُنَّ يُؤْمِنَّ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَٰلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا"
(সূরা বাকারা: ২২৮)

(গ) যদি তিন তালাক পতিত হয়ে থাকে

তাহলে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী হিল্লা (অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ ও স্বাভাবিক দাম্পত্যের পর তালাক/মৃত্যু) ছাড়া পুনরায় বিবাহ বৈধ হবে না। এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

(ঘ) সতর্কতা ও পরামর্শ

  1. মিথ্যা সাক্ষ্য দেবেন না — যদি তালাক না হয়ে থাকে, "হয়েছে" বলে ধরে নেওয়া যাবে না; আর যদি হয়ে থাকে, "হয়নি" বলা যাবে না।
  2. স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতির শরণাপন্ন হোন — বিস্তারিত শুনে ফতোয়া দেবেন। অনলাইনে বিস্তারিত না জেনে চূড়ান্ত ফতোয়া দেওয়া কঠিন।
  3. স্বামী-স্ত্রী উভয়ে মিলে আল্লাহর কাছে তাওবা করুন — ঝগড়া, গালি, তালাকের হুমকি—এসব পরিত্যাগ করুন।
  4. দাম্পত্য জীবন সুন্দর করতে — একসাথে সালাত, দুআ, এবং দ্বীনি পরিবেশ গড়ে তুলুন।

৫. সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | আপনি নিশ্চিত নন তালাক বলা হয়েছে কি না | তালাক পতিত হয়নি (সন্দেহে তালাক হয় না) | | "উসকাস", "চাস" ইত্যাদি শব্দ | তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়, তালাক হয় না | | গালি দেওয়া | হারাম, কিন্তু তালাক হয় না | | যদি স্বামী সত্যিই "তালাক" বলে থাকে | একবার হলে এক তালাকে রিজয়ী, তিনবার হলে তিন তালাক | | পরিত্রাণ | স্বামীকে জিজ্ঞাসা করুন, মুফতির শরণাপন্ন হোন, তাওবা করুন |


৬. দুআ

اللَّهُمَّ أَصْلِحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ أَزْوَاجِنَا وَاجْعَلْ بُيُوتَنَا مَلِيئَةً بِالْمَوَدَّةِ وَالرَّحْمَةِ

"হে আল্লাহ! আমাদের ও আমাদের স্বামীদের মধ্যে সংশোধন করে দিন, আমাদের ঘরগুলোকে ভালোবাসা ও দয়া দ্বারা পূর্ণ করে দিন।"


মনে রাখবেন: শয়তান দাম্পত্য জীবনে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। আপনি ও আপনার স্বামী উভয়ে শান্ত হয়ে, একসাথে বসে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে বিষয়টি সমাধান করুন। যদি তালাক পতিত না হয়ে থাকে, তাহলে আর কোনো চিন্তা নেই। আর যদি হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত মুফতির পরামর্শ নিন।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.