মানসিক শান্তি
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
শায়খ নিজের মানসিক শান্তির জন্য খুব কাছের, কাছের বলতে মানে খুব প্রিয় এমন কেউ না। কিন্তু একসাথে পড়াশোনা করা হয়, জরুরিতে কথা বলা হয় বা সে এক সময় আমারই স্টুডেন্ট ছিল। এজন্য কথা হয়েছে, আগে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু ইদানিং তার কথা বার্তা সবকিছু আমাকে অনেক বেশি হার্ট করে। উনি ইচ্ছা করে করেন বা এ ধরনের কথা বলেন, এটা আমি জানি না। হয়তো বলেন না। হয়তো উনি ভালো নিয়াতেই বলেন। কিন্তু উনার কথা বলার যে ধরন সেটাতে আমি অনেক বেশি হার্ট হই। তো আমি উনার সাথে কথা বলতেও চাই না, উনার আমি কোনো কথা শুনতেও চাই না। আমি ফেসবুকে কোনো ভালো পোস্ট দিলেও উনি সেটার কিভাবে জানি না নেগেটিভ একটা কমেন্ট করে ফেলেন।ভালো ভেবে করেন কি খারাপ ভেবে করেন আমি জানি না। তো এখন ওনাকে যদি আমার ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে আনফ্রেন্ড করি বা ব্লক করি তাহলে কি কোনো সমস্যা?
উনি যদি এটাই কষ্ট পান তাহলে কি আমার গুনাহ হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় কারো কথাবার্তা বা আচরণ যদি আপনার জন্য মানসিক কষ্ট, দুশ্চিন্তা ও ক্ষতির কারণ হয়, এবং আপনি তাকে সরাসরি উপদেশ দেওয়ার পরও কোনো পরিবর্তন না দেখেন, তাহলে প্রয়োজনে তাকে আনফ্রেন্ড করা বা ব্লক করা জায়েয। এতে সাধারণত গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ। তবে হঠাৎ রাগের বশে নয়; বরং শান্তভাবে, নিজের দ্বীনি ও মানসিক সুরক্ষার স্বার্থে এবং অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া-বিতর্ক এড়াতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
তবে ইসলামে মুসলিম ভাই-বোনের সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা বা হিজরান (বয়কট) করা সাধারণত নিষিদ্ধ। কিন্তু সব সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা আর কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানি থেকে নিজেকে রক্ষা করা—দুটো এক নয়। আপনি যদি তার সাথে সালাম-সম্ভাষণ ও প্রয়োজনীয় ইসলামি সম্পর্ক বজায় রাখেন, শুধু ফেসবুক-মেসেঞ্জারে তার অপ্রীতিকর মন্তব্য/কথাবার্তা থেকে দূরে থাকেন, তাহলে এটি হিজরান বা সম্পর্কচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
বিস্তারিত:
১) মুসলিমের সম্মান ও মানসিক কষ্ট দেওয়া নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ» “প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।” — সহীহ বুখারী, হাদীস ১০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪০
অন্য হাদীসে এসেছে:
«لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ» “নিজের ক্ষতি করবে না, অন্যেরও ক্ষতি করবে না।” — সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২৩৪১; মুসনাদে আহমাদ
তাই কেউ যদি বারবার এমন কথা বলে বা এমন মন্তব্য করে, যা দিয়ে আপনার মানসিক কষ্ট হয়, তাহলে তা ইসলামি আদবের পরিপন্থী। আপনি নিজেকে রক্ষা করার অধিকার রাখেন।
২) প্রয়োজনে দূরত্ব রাখা জায়েয।
ইমাম ইবনে আবিদীন রহ. লিখেন, কাউকে শুধু দুনিয়াবি কারণে বয়কট করা নাজায়েয; কিন্তু দ্বীনি স্বার্থে বা ফিতনা-ফাসাদ ও ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য দূরত্ব রাখা জায়েয।
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৫৪০-এর আশপাশ; কিতাবুল হিজরান অধ্যায়
ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, যদি কারো সাথে সম্পর্ক রাখলে গীবত, ঝগড়া, হিংসা, মানসিক অশান্তি বা দ্বীনি ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে তার থেকে দূরত্ব রাখা জায়েয; বরং কখনো কখনো কর্তব্য।
৩) আনফ্রেন্ড/ব্লক করার হুকুম। সোশ্যাল মিডিয়ায় কাউকে আনফ্রেন্ড বা ব্লক করা নিজে থেকে জুলুম নয়; এটি একটি সীমা নির্ধারণের মাধ্যম। যদি উদ্দেশ্য হয়—
- অন্যের হয়রানি থেকে বাঁচা,
- অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া এড়ানো,
- নিজের ইজ্জত ও মানসিক শান্তি রক্ষা,
- হারাম কথা/সম্পর্ক থেকে দূরে থাকা, তাহলে এটি জায়েয।
তবে শুধু দুনিয়াবি তুচ্ছ কারণে, প্রতিশোধের নিয়তে, বা মুসলিম ভাইকে হেয় করার উদ্দেশ্যে ব্লক করা ঠিক নয়।
৪) সে কষ্ট পেলে কি আপনার গুনাহ হবে? এখানে মূল বিষয় হলো আপনার নিয়ত ও পদ্ধতি।
- যদি আপনি তাকে আগে ভদ্রভাবে বুঝিয়ে থাকেন, তারপরও সে একই ধরনের কষ্টদায়ক আচরণ করে, আর আপনি নিজেকে রক্ষার জন্য ব্লক করেন—তাহলে তার কষ্ট পাওয়ার দায় আপনার উপর বর্তাবে না, ইনশাআল্লাহ।
- কিন্তু যদি আপনি কোনো কারণ ছাড়াই, শুধু তুচ্ছ বিষয়ে বা তাকে অপমান করার জন্য ব্লক করেন, আর সে কষ্ট পায়—তাহলে এটি ভ্রাতৃত্বের হক নষ্ট করার কারণে গুনাহের কারণ হতে পারে।
ইসলামের মূলনীতি:
«إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ» “নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।” — সহীহ বুখারী, হাদীস ১
৫) সর্বোত্তম পন্থা:
- প্রথমে সম্ভব হলে ভদ্রভাবে তাকে জানান: “আপনার কিছু কথা/মন্তব্য আমার খুব কষ্ট দেয়। দয়া করে এমন করবেন না।”
- যদি সে না মানে, তাহলে তাকে আনফ্রেন্ড/ব্লক করতে পারেন।
- ব্লক করার আগে গালি, অপমান বা পাবলিকভাবে তাকে হেয় করা থেকে বিরত থাকুন।
- তার জন্য বদদুআ নয়; বরং হেদায়েতের দুআ করুন।
- সামনাসামনি দেখা হলে সালাম দিতে পারেন; সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করবেন না।
- নিজের মানসিক শান্তির জন্য বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত, যিকর, দরুদ ও দুআ পড়ুন। বিশেষ করে:
- «اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ...»
- «حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ»
- সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা নাস, সূরা ফালাক, সূরা ইখলাস নিয়মিত পড়ুন।
উপসংহার: প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি যদি তাকে আগে বুঝিয়ে থাকেন এবং তার আচরণ না বদলায়, তাহলে নিজের মানসিক শান্তি ও দ্বীনি সুরক্ষার জন্য তাকে আনফ্রেন্ড বা ব্লক করা জায়েয। এতে আপনার গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ। তবে নিয়ত পরিষ্কার রাখুন—শুধু নিজেকে রক্ষা করা, প্রতিশোধ নয়। আর সামনাসামনি ইসলামি সালাম ও ভ্রাতৃত্বের সাধারণ হক বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
والله أعلم بالصواب