এলার্জির সমস্যা শত ওষুধ ডাক্তার দেখিয়েও ঠিক হয়না সারা শরীরে চুলকে ছোট ছোট ঢিবি হয়ে ফুলে যায় এর জন্য কি রুকীইয়া করা দরকার আর কোন দুয়া বা কিভাবে করব?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 5742
Questioner: SADIYA KHATUN
Question Asked: 20 Sep 2026, 10:44 PM
Reviewed & Published: 20 Sep 2026, 11:00 PM
Views: 25
Tokens: 5,031
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

এলার্জির সমস্যা শত ওষুধ ডাক্তার দেখিয়েও ঠিক হয়না সারা শরীরে চুলকে ছোট ছোট ঢিবি হয়ে ফুলে যায় এর জন্য কি রুকীইয়া করা দরকার আর কোন দুয়া বা কিভাবে করব?

Answer

এলার্জি সমস্যার জন্য রুকইয়াহ ও দুআ: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

একজন ব্যক্তি এলার্জির সমস্যায় ভুগছেন। শত ওষুধ ও ডাক্তার দেখিয়েও ঠিক হচ্ছে না। সারা শরীরে চুলকায়, ছোট ছোট ঢিবি হয়ে ফুলে যায়। তিনি জানতে চান—এর জন্য রুকইয়াহ করা দরকার কি না এবং কী দুআ বা কীভাবে করবেন।


ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাধান

১. প্রথমে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কর্তব্য

ইসলামে চিকিৎসা করানো নিষিদ্ধ নয়; বরং এটি সুন্নাহসম্মত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً» "তোমরা চিকিৎসা করাও; কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধক (ঔষধ) সৃষ্টি করেননি।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৮৫৫; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০৩৮

তাই ডাক্তার দেখানো ও ঔষধ চালিয়ে যাওয়া জরুরি। তবে পাশাপাশি আধ্যাত্মিক চিকিৎসা (রুকইয়াহ ও দুআ) করাও জায়েজ ও অনেক ক্ষেত্রে উপকারী।


২. রুকইয়াহ করা কি দরকার?

হ্যাঁ, রুকইয়াহ করা জায়েজ ও মুস্তাহাব। রুকইয়াহ হলো কুরআনের আয়াত, দুআ ও আল্লাহর নাম দিয়ে ঝাড়ফুঁক করা। এটি সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ» "রুকইয়াহতে কোনো দোষ নেই, যতক্ষণ না তাতে শিরক থাকে।" — সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০০

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে রুকইয়াহ করতেন এবং সাহাবীদের করাতেন। — সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৯২

শর্ত: রুকইয়াহ অবশ্যই কুরআন, সুন্নাহসম্মত দুআ ও আল্লাহর নাম দিয়ে হতে হবে। তাবিজ-কবজ, মন্ত্র, জিন-শয়তানের নামে কিছু—এসব হারাম ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।


৩. এলার্জি ও চর্মরোগের জন্য রুকইয়াহ ও দুআ

(ক) সূরা ফাতিহা দিয়ে রুকইয়াহ

সূরা ফাতিহা সর্বোত্তম রুকইয়াহ। সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি (রাঃ) একবার সাপের কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সূরা ফাতিহা পড়ে ঝাড়ফুঁক করেছিলেন এবং সে সুস্থ হয়ে গিয়েছিল। — সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৩৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০১

(খ) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো দুআ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ রোগীর উপর ডান হাত রেখে এই দুআ পড়তেন:

«اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَاسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شَافِيَ إِلَّا أَنْتَ» "হে আল্লাহ! মানুষের রব! কষ্ট দূর করো, শিফা দাও; তুমিই শিফা দানকারী, তুমি ছাড়া কোনো শিফা দানকারী নেই।" — সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৭৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৯১

(গ) জিবরীল (আঃ)-এর শেখানো দুআ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, জিবরীল (আঃ) তাঁকে এই দুআ শিখিয়েছিলেন:

«بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنٍ أَوْ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ» "আল্লাহর নামে আমি তোমাকে রুকইয়াহ করছি, প্রত্যেক কষ্টদায়ক বস্তু থেকে, প্রত্যেক আত্মা, বদনজর ও হিংসুকের অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ তোমাকে শিফা দান করুন। আল্লাহর নামে আমি তোমাকে রুকইয়াহ করছি।" — সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৮৬

(ঘ) চুলকানি ও চর্মরোগের জন্য বিশেষ আমল

১. সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া — রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতি রাতে এই দুটি সূরা পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে সারা শরীরে মাসেহ করতেন। — সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১৭

২. আয়াতুল কুরসি পড়া — সূরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত।

৩. এই দুআ পড়া:

«أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ» "আমি আল্লাহর পূর্ণ কালিমাসমূহের মাধ্যমে সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।" — সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০৮

৪. সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার:

«بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ»সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৮৮; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৮৮


৪. রুকইয়াহ করার পদ্ধতি

  1. ওযু করা — পবিত্র অবস্থায় থাকা।
  2. নিয়ত করা — শিফার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।
  3. ডান হাত আক্রান্ত স্থানে রাখা (সম্ভব হলে)।
  4. সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা ইখলাস পড়া।
  5. উপরের দুআগুলো পড়া
  6. হাতে ফুঁ দিয়ে আক্রান্ত স্থানে মাসেহ করা
  7. দৃঢ় বিশ্বাস রাখা — শিফা আল্লাহর হাতে।

৫. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহঃ) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন:

রুকইয়াহ ও তাআবিজ (কুরআনী দুআ) জায়েজ, যদি তা কুরআন, আল্লাহর নাম ও সুস্পষ্ট আরবি দুআ দ্বারা হয়। আর যদি তা বোধগম্য না হয় বা শিরকের আশঙ্কা থাকে, তবে নিষিদ্ধ। — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৬৩

ফাতাওয়া আলমগিরিতে এসেছে:

কুরআনের আয়াত ও দুআ দিয়ে রুকইয়াহ করা জায়েজ; তবে জাদু-টোনা বা শিরকী কালাম দিয়ে নিষিদ্ধ। — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৫৪

মুফতি তাকি উসমানি (দাঃবাঃ) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন:

রুকইয়াহ শরীয়তসম্মত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। তবে এটি ঔষধ ও ডাক্তারের বিকল্প নয়, বরং সম্পূরক। — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৪১


৬. অতিরিক্ত আমল ও পরামর্শ

| আমল | ফজিলত | |------|--------| | সকাল-সন্ধ্যা আয়াতুল কুরসি | হেফাজতের জন্য | | সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত | রাতের হেফাজত | | সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার উপরের দুআ | সব অনিষ্ট থেকে হেফাজত | | সদকা করা | বালা-মুসিবত দূর করে | | ইস্তিগফার বেশি করা | গুনাহ মাফ ও রোগ শিফা | | রুকইয়াহ বিশেষজ্ঞ আলেমের কাছে যাওয়া | সঠিক পদ্ধতিতে রুকইয়াহ |

গুরুত্বপূর্ণ: যদি রুকইয়াহ করতে গিয়ে কেউ জিন-শয়তানের নাম নেয়, অজানা মন্ত্র পড়ে, বা তাবিজ-কবজ দেয়—তবে তা থেকে বিরত থাকুন। এটি শিরক ও হারাম।


৭. ডাক্তারি চিকিৎসার পাশাপাশি করণীয়

  1. এলার্জি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন — অ্যালার্জি টেস্ট করান।
  2. খাদ্য ও পরিবেশগত কারণ চিহ্নিত করুন — কোন খাবার বা বস্তুতে এলার্জি হয়।
  3. নিয়মিত ঔষধ সেবন করুন — ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী।
  4. রুকইয়াহ ও দুআ চালিয়ে যান — আধ্যাত্মিক চিকিৎসা হিসেবে।
  5. ধৈর্য ধারণ করুন — রোগ কাফফারা ও মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ» "মুসলিমের উপর যে কষ্ট, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা পেরেশানি আসে—এমনকি একটি কাঁটা ফুটলেও—আল্লাহ তা দ্বারা তার গুনাহ মাফ করে দেন।" — সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৪১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৭৩


সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | রুকইয়াহ করা দরকার? | হ্যাঁ, জায়েজ ও মুস্তাহাব; শর্ত হলো শিরকমুক্ত হওয়া | | কোন দুআ? | সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক-নাস, ইখলাস, উপরোক্ত দুআসমূহ | | কিভাবে করব? | ওযু করে, ডান হাত রেখে, কুরআন-দুআ পড়ে, হাতে ফুঁ দিয়ে মাসেহ করা | | ডাক্তারি চিকিৎসা? | চালিয়ে যাওয়া কর্তব্য; রুকইয়াহ সম্পূরক | | নিষিদ্ধ কী? | জিন-শয়তানের নাম, অজানা মন্ত্র, তাবিজ-কবজ, শিরকী কালাম |


উপদেশ: নিয়মিত ডাক্তারি চিকিৎসার পাশাপাশি উপরোক্ত রুকইয়াহ ও দুআ চালিয়ে যান। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং ধৈর্য ধারণ করুন। আল্লাহ আপনার শিফা দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.