স্বামীর ইনকামে প্রথম হকদার কে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
স্বামীর ইনকামে প্রথম হকদার কে?
প্রশ্ন
স্বামীর ইনকামে প্রথম হকদার কে?
উত্তর
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে স্বামীর উপার্জনে প্রথম ও প্রধান হকদার হলো তার স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি — অর্থাৎ যাদের ভরণ-পোষণ (নাফাকা) দেওয়া স্বামীর উপর ওয়াজিব। এরপর অন্যান্য আত্মীয়দের হক আসে।
কুরআনের দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
"সন্তানের পিতার দায়িত্ব হলো প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের (মায়েদের) খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করা।" — সূরা আল-বাকারা: ২৩৩
لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ
"সামর্থ্যবান ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে।" — সূরা আত-তালাক: ৭
وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ ۖ لِمَنْ أَرَادَ أَن يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ
— সূরা আল-বাকারা: ২৩৩
হাদীসের দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
"তোমাদের উপর তাদের (স্ত্রীদের) খাদ্য ও পোশাকের হক রয়েছে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১২১৮
হাকীম ইবনে মুআবিয়া (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বললেন:
يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا حَقُّ زَوْجَةِ أَحَدِنَا عَلَيْهِ؟ قَالَ: أَنْ تُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمْتَ، وَتَكْسُوَهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ...
"হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কারো উপর তার স্ত্রীর হক কী? তিনি বললেন: তুমি যখন খাবে তখন তাকে খাওয়াবে, তুমি যখন পোশাক পরবে তখন তাকে পোশাক পরাবে..." — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২১৪২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ১৮৫০
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
دِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ فِي رَقَبَةٍ، وَدِينَارٌ تَصَدَّقْتَ بِهِ عَلَى مِسْكِينٍ، وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ، أَعْظَمُهَا أَجْرًا الَّذِي أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ
"এক দীনার আল্লাহর পথে ব্যয় করলে, এক দীনার দাসমুক্তিতে, এক দীনার মিসকিনকে দান করলে, আর এক দীনার নিজের পরিবারের উপর ব্যয় করলে — এগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সওয়াব ঐ দীনারের, যা তুমি নিজের পরিবারের উপর ব্যয় করেছ।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৯৯৫
হানাফী ফিকহের বিস্তারিত বর্ণনা
১. নাফাকার হকদার কে?
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী স্বামীর উপর নাফাকা (ভরণ-পোষণ) ওয়াজিব হয় নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের জন্য:
ক. স্ত্রী: স্ত্রীর খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান — সবই স্বামীর উপর ওয়াজিব, তা স্ত্রী ধনী হোক বা গরীব হোক। ইমাম সারাখসী (রহ.) বলেন:
وَنَفَقَةُ الزَّوْجَةِ وَاجِبَةٌ عَلَى الزَّوْجِ بِالْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَالْإِجْمَاعِ
"স্ত্রীর নাফাকা স্বামীর উপর কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা ওয়াজিব।" — আল-মাবসূত, খণ্ড ৫, পৃ. ১৮০
খ. নাবালেগ (অপ্রাপ্তবয়স্ক) সন্তান: পুত্র সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বনির্ভর হওয়ার আগ পর্যন্ত এবং কন্যা সন্তান বিবাহ হওয়ার আগ পর্যন্ত পিতার উপর নাফাকা ওয়াজিব।
ইমাম কুদূরী (রহ.) বলেন:
وَعَلَى الرَّجُلِ أَنْ يُنْفِقَ عَلَى زَوْجَتِهِ وَأَوْلَادِهِ الصِّغَارِ
"পুরুষের উপর তার স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের নাফাকা দেওয়া কর্তব্য।" — মুখতাসারুল কুদূরী
গ. পিতা-মাতা (যদি অভাবী হন): যদি পিতা-মাতা অভাবী হন এবং সন্তান সামর্থ্যবান হয়, তবে সন্তানের উপর পিতা-মাতার নাফাকা ওয়াজিব।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
"পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" — সূরা আল-ইসরা: ২৩
২. হকের ক্রম (অগ্রাধিকার)
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী নাফাকার অগ্রাধিকার ক্রম নিম্নরূপ:
| ক্রম | হকদার | বিধান | |------|--------|-------| | ১ | স্ত্রী | ওয়াজিব (সর্বপ্রথম) | | ২ | অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান | ওয়াজিব | | ৩ | অভাবী পিতা-মাতা | ওয়াজিব (সন্তান সামর্থ্যবান হলে) | | ৪ | অন্যান্য অভাবী আত্মীয় | মুস্তাহাব/কখনো ওয়াজিব |
ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:
وَالْأَصْلُ فِي النَّفَقَةِ أَنَّهَا تَجِبُ عَلَى الْأَقْرَبِ فَالْأَقْرَبِ
"নাফাকার মূলনীতি হলো: নিকটতম আত্মীয়ের হক আগে, তারপর পরেরজন।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৭২
৩. স্ত্রীর হক সর্বপ্রথম কেন?
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, স্ত্রীর নাফাকা সন্তানের নাফাকার চেয়েও অগ্রাধিকারযোগ্য। কারণ:
- স্ত্রীর নাফাকা বিনিময়মূলক (মুআওয়াদা) — বিবাহের চুক্তির অংশ।
- সন্তানের নাফাকা আত্মীয়তার সম্পর্কভিত্তিক।
- হাদীসে পরিবারের উপর ব্যয়কে সর্বোত্তম সদকা বলা হয়েছে।
ইমাম হাসকাফী (রহ.) বলেন:
وَنَفَقَةُ الزَّوْجَةِ مُقَدَّمَةٌ عَلَى نَفَقَةِ الْأَوْلَادِ
"স্ত্রীর নাফাকা সন্তানদের নাফাকার উপর অগ্রাধিকারযোগ্য।" — আদ-দুররুল মুখতার
৪. যদি সামর্থ্য সীমিত হয়?
যদি স্বামীর সামর্থ্য সীমিত হয়, তবে:
- প্রথমে স্ত্রীর নাফাকা পূরণ করবে।
- এরপর সন্তানদের।
- এরপর পিতা-মাতার।
- এরপর অন্যান্য আত্মীয়দের।
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:
"স্বামীর উপর প্রথম ওয়াজিব হলো স্ত্রীর নাফাকা। স্ত্রীকে খাদ্য, পোশাক ও বাসস্থান দেওয়া তার প্রধান দায়িত্ব। এরপর সন্তানদের নাফাকা।" — ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৩২৫
বিশেষ দৃষ্টিকোণ
স্ত্রী নিজে উপার্জন করলে?
স্ত্রী ধনী হলেও স্বামীর উপর তার নাফাকা ওয়াজিব। স্ত্রীর সম্পদ থেকে নাফাকা দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব নয়। তবে স্ত্রী স্বেচ্ছায় সাহায্য করতে পারে।
দ্বিতীয় স্ত্রী থাকলে?
একাধিক স্ত্রী থাকলে প্রত্যেকের নাফাকা আলাদাভাবে ওয়াজিব। সমানভাবে বণ্টন করা উত্তম, তবে সামর্থ্য অনুযায়ী কম-বেশি হলে অসুবিধা নেই।
সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে?
প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বনির্ভর সন্তানের নাফাকা পিতার উপর ওয়াজিব নয়। তবে পড়াশোনারত থাকলে বা অসুস্থ হলে সহায়তা করা কর্তব্য।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | প্রথম হকদার | স্ত্রী | | দ্বিতীয় হকদার | অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান | | তৃতীয় হকদার | অভাবী পিতা-মাতা | | স্ত্রীর নাফাকার বিধান | ওয়াজিব (ধনী-গরীব নির্বিশেষে) | | সন্তানের নাফাকার বিধান | ওয়াজিব (প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বনির্ভর হওয়া পর্যন্ত) | | দলিল | সূরা বাকারা: ২৩৩, সহীহ মুসলিম: ৯৯৫, ১২১৮ |
উপদেশ
স্বামীর উচিত পরিবারের ভরণ-পোষণে উদার হওয়া এবং স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালনে ত্রুটি না করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ
"মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার ভরণ-পোষণাধীন ব্যক্তিদের অবহেলা করে।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ১৬৯২
তথ্যসূত্র:
- সূরা আল-বাকারা: ২৩৩
- সূরা আত-তালাক: ৭
- সহীহ মুসলিম: ৯৯৫, ১২১৮
- সুনানে আবু দাউদ: ১৬৯২, ২১৪২
- আল-মাবসূত (সারাখসী), খণ্ড ৫
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৩
- আদ-দুররুল মুখতার (হাসকাফী)
- মুখতাসারুল কুদূরী
- ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া
- বেহেশতী জেওর