লিখিত ইজাব-কবুল দ্বারা হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নিকাহ শুদ্ধ হয় কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5723
Questioner: Ibrahim
Question Asked: 20 Sep 2026, 02:36 PM
Reviewed & Published: 20 Sep 2026, 03:15 PM
Views: 43
Tokens: 6,692
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
হুজুর,
প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়ে যদি একই মজলিসে দুইজন মুসলিম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সাক্ষীর সামনে একটি কাগজে স্‌বামী ঘরে ছেলের নাম আর স্ত্রীর ঘরে মেয়ের নাম লিখে সাক্ষীদের সামনে দুইজনেই সেচ্ছায় সই করে।(মুখে কিছু না বলে)
বি:দ্র:কাগজে স্‌বামী ও স্ত্রীর পরিচয়ের ঘর ছিল শুধু যা পুরণ করা হয়েছে ও ছেলেমেয়ে উভয়েই সই করেছে সাক্ষীদের সামনে।সেখানে কোন (বিবাহ করলাম,গ্রহণ করলাম) এমন বাক্য লেখাছিল না।

১.এর মাধ্যমে কি শরিয়তের দৃষ্টিতে তারা বৈধ স্‌বামীস্ত্রী হিসাবে গণ্য হবে?

২.সবাই একই মজলিসে থাকাকালীন মুখে উচ্চারণ না করে শুধু লিখিত ভাবে শরিয়তসম্মত ভাবে বৈধ বিবাহের জন্য কি কি বাধ্যতামূলক কাজ আছে?

৩.উল্লেখিত ঘটনার প্রেক্ষিতে ছেলেমেয়ে যদি একত্রে বসবাস করে তবে ছেলে মেয়ের আলাদা হবার জন্য কি ছেলের মৌখিক ভাবে তালাক দেওয়া বাধ্যতামূলক?

৪.মেয়ে কি নিজে থেকেই পরবর্তীতে অন্য কোথাও বিবাহ করতে পারবে?


হানাফি মাযহাব অনুযায়ী সমাধান দেবেন দয়া করে।

Answer

লিখিত ইজাব-কবুল দ্বারা বিবাহ শুদ্ধ হবে কি?

উত্তর (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين

মূলনীতি (নিকাহর রুকন ও শর্ত)

হানাফি মাযহাব মতে নিকাহ সংঘটিত হওয়ার জন্য দুটি রুকন অপরিহার্য:

  1. ইজাব (বরপক্ষের প্রস্তাব/সম্মতি)
  2. কবুল (কনেপক্ষের সম্মতি)

আর শর্ত হলো:

  • ইজাব-কবুল একই মজলিসে হতে হবে।
  • দুইজন মুসলিম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অথবা এক পুরুষ ও দুই মহিলা সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে।
  • ইজাব-কবুল মুখে উচ্চারণ করা অথবা লিখিতভাবে প্রকাশ করা — উভয়ই শরিয়তে স্বীকৃত, তবে শর্ত হলো তা স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থতামুক্ত হতে হবে।

দলিল: আল্লাহ তা'আলা বলেন—

"তোমরা নারীদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও।" (সূরা নিসা: ৪)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

"সাক্ষী ছাড়া কোনো নিকাহ নেই।" (সুনানে তিরমিযি, হাদিস: ১১০৪; মুসনাদে আহমাদ)

ইমাম সারাখসি (রহ.) বলেন—

"নিকাহর জন্য ইজাব ও কবুল শর্ত, এবং তা মুখে উচ্চারণ বা লিখন দ্বারা হতে পারে, যদি তা স্পষ্ট হয়।" (আল-মাবসুত, কিতাবুন নিকাহ)


প্রশ্ন ১: উক্ত লিখিত পদ্ধতিতে কি তারা বৈধ স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবে?

উত্তর: না, উক্ত পদ্ধতিতে নিকাহ শুদ্ধ হয়নি। কারণ:

  1. ইজাব-কবুলের স্পষ্ট বাক্য অনুপস্থিত: কাগজে শুধু "স্বামী" ও "স্ত্রী" ঘরে নাম লেখা হয়েছে, কিন্তু "আমি বিবাহ করলাম", "আমি কবুল করলাম" — এমন কোনো স্পষ্ট ইজাব-কবুলের বাক্য লেখা হয়নি, মুখেও উচ্চারণ করা হয়নি। শুধু নাম লেখা ও সই করা নিকাহর ইজাব-কবুল হিসেবে গণ্য হয় না।

  2. নিকাহর ইজাব-কবুল দ্ব্যর্থতামুক্ত স্পষ্ট হতে হবে: ইমাম কাসানি (রহ.) বলেন—

"নিকাহর ইজাব-কবুল এমন শব্দে হতে হবে যা নিকাহর অর্থ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে; শুধু নাম লেখা বা সই করা নিকাহর ইজাব-কবুল নয়।" (বাদায়েউস সানায়ে, কিতাবুন নিকাহ)

  1. ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন—

"নিকাহর জন্য ইজাব-কবুলের স্পষ্ট শব্দ অপরিহার্য; শুধু লিখন যদি স্পষ্ট ইজাব-কবুলের বাক্য ধারণ না করে, তবে তা নিকাহর জন্য যথেষ্ট নয়।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ)

সুতরাং: তারা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবে না। তাদের মধ্যে সম্পর্ক নাজায়েজ


প্রশ্ন ২: মুখে উচ্চারণ না করে শুধু লিখিতভাবে বৈধ বিবাহের জন্য কী কী বাধ্যতামূলক কাজ আছে?

উত্তর: লিখিতভাবে নিকাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক:

  1. স্পষ্ট ইজাব-কবুলের বাক্য লিখতে হবে:

    • বর লিখবে/বলবে: "আমি অমুককে আমার স্ত্রী হিসেবে কবুল করলাম" বা "আমি বিবাহ করলাম"।
    • কনে লিখবে/বলবে: "আমি কবুল করলাম" বা "আমি সম্মতি দিলাম"।
    • অথবা উভয় পক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নিকাহর শব্দ ব্যবহার করতে হবে।
  2. একই মজলিসে হতে হবে: ইজাব ও কবুল একই বৈঠকে হতে হবে। আলাদা মজলিসে হলে নিকাহ হবে না।

  3. দুইজন মুসলিম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে এবং তাদের সামনে ইজাব-কবুল সম্পন্ন হতে হবে।

  4. ইজাব-কবুলের ধারাবাহিকতা: ইজাবের পরপরই কবুল হতে হবে, মাঝে অন্য কোনো কথা বা কাজ না থাকা উত্তম।

  5. প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হতে হবে: উভয় পক্ষ বালেগ ও আকিল হতে হবে।

  6. মহর নির্ধারণ: মহর নির্ধারণ করা সুন্নত ও কর্তব্য; মহর উল্লেখ না করলেও নিকাহ শুদ্ধ হয়, তবে মহরে মিসল ধার্য হবে।

  7. স্বেচ্ছায় সম্মতি: জবরদস্তি বা ভয়ভীতি ছাড়া স্বেচ্ছায় ইজাব-কবুল হতে হবে।

দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

"তোমরা নারীদের তাদের অভিভাবকের অনুমতিক্রমে বিবাহ কর, এবং সাক্ষী রাখ।" (সুনানে তিরমিযি)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত হলো—নিকাহর জন্য ইজাব-কবুলের স্পষ্ট শব্দ অপরিহার্য, তা মুখে হোক বা লিখনে; শুধু নাম লেখা বা সই করা যথেষ্ট নয়। (আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ)


প্রশ্ন ৩: উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে ছেলেমেয়ে যদি একত্রে বসবাস করে, তবে আলাদা হওয়ার জন্য ছেলের মৌখিকভাবে তালাক দেওয়া বাধ্যতামূলক?

উত্তর: যেহেতু উক্ত পদ্ধতিতে নিকাহই শুদ্ধ হয়নি, তাই:

  1. তালাকের প্রশ্নই আসে না: তালাক কেবল শুদ্ধ নিকাহর পরেই কার্যকর হয়। নিকাহ না থাকলে তালাকের কোনো অস্তিত্ব নেই।

  2. তাদের একত্রে বসবাস সম্পূর্ণ হারাম ও জিনার অন্তর্ভুক্ত: এ অবস্থায় একত্রে বসবাস করা কবিরা গুনাহ। আল্লাহ বলেন—

    "তোমরা জিনার নিকটেও যেয়ো না।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)

  3. আলাদা হওয়া ফরজ: তাদের অবশ্যই সাথে সাথে আলাদা হয়ে যেতে হবে। তালাক দেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং তাওবা করে ভবিষ্যতে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে নিকাহ করতে হবে।

  4. যদি সন্তান জন্মগ্রহণ করে: নিকাহ শুদ্ধ না হওয়ায় সন্তান জারজ হিসেবে গণ্য হবে (যদিও ইসলামে জারজ সন্তান কোনো অপরাধ নয়, তবে সামাজিক ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি হবে)।

ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন—

"নিকাহ শুদ্ধ না হলে সহবাস জিনা; তালাকের কোনো প্রশ্ন নেই।" (রাদ্দুল মুহতার)


প্রশ্ন ৪: মেয়ে কি নিজে থেকেই পরবর্তীতে অন্য কোথাও বিবাহ করতে পারবে?

উত্তর: যেহেতু উক্ত পদ্ধতিতে নিকাহ শুদ্ধ হয়নি, তাই:

  1. মেয়ে স্বাধীন: সে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে (ইজাব-কবুল, সাক্ষী, অভিভাবকের অনুমতি) অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে

  2. তবে ইদ্দত পালনের প্রয়োজন নেই: কারণ শুদ্ধ নিকাহ হয়নি, তাই ইদ্দতও ফরজ নয়। তবে সতর্কতা হিসেবে তাওবা ও ইস্তিগফার করা উচিত।

  3. অভিভাবকের অনুমতি: হানাফি মাযহাব মতে প্রাপ্তবয়স্কা মেয়ে নিজে বিবাহ করতে পারে, তবে অভিভাবকের অনুমতি নেওয়া উত্তম ও সুন্নত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

    "যে নারী অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করে, তার বিবাহ বাতিল।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮৩)

    তবে হানাফি মাযহাব মতে প্রাপ্তবয়স্কা মেয়ের নিজের বিবাহ শুদ্ধ হবে, তবে অভিভাবকের অনুমতি না নেওয়া গুনাহ।

  4. সাবধানতা: ভবিষ্যতে যেন শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে নিকাহ হয় — স্পষ্ট ইজাব-কবুল, দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী, অভিভাবকের অনুমতি ও মহর নির্ধারণ।


সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. উক্ত লিখিত পদ্ধতিতে নিকাহ শুদ্ধ? | না, শুদ্ধ হয়নি | | ২. লিখিত নিকাহর শর্ত | স্পষ্ট ইজাব-কবুল, একই মজলিস, দুই সাক্ষী, প্রাপ্তবয়স্ক, স্বেচ্ছা | | ৩. তালাক বাধ্যতামূলক? | না, কারণ নিকাহই হয়নি; আলাদা হওয়া ফরজ | | ৪. মেয়ে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে? | হ্যাঁ, শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে |


উপদেশ

প্রিয় প্রশ্নকারী, উক্ত ঘটনায় নিকাহ শুদ্ধ হয়নি। তাই অবিলম্বে:

  1. তাওবা করুন — আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
  2. আলাদা হয়ে যান — একত্রে বসবাস সম্পূর্ণ হারাম।
  3. শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে নিকাহ করুন — যদি উভয়ে বিবাহ করতে চান, তবে স্পষ্ট ইজাব-কবুল, দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী, অভিভাবকের অনুমতি ও মহর নির্ধারণ করে নতুন করে নিকাহ করুন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে হালাল-হারামের পার্থক্য বুঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.