বিয়ের সময় কনেকে দেওয়া স্বর্ণ, গিফটের গহনা ও মোহরের আংটি-ব্রেসলেটের আসল মালিক কে?
Family Life · Hanafi
Question
হুজুর,আমার বিয়েতে আমাকে যা স্বর্ণ দেওয়া হয় এবং যা গিফট পায় তা থেকে কিছু গিফটের স্বর্ণ আমার শ্বাশুড়ি আর ননদেরা রেখে দেয়।এছাড়াও বিয়ের পর আমার স্বামী আমাকে যা স্বর্ণ উপহার দেয় তাও কিছু গিফট রেখে দেয়।স্পেশালি মোহর এর আংটি আর ব্রেসলেট।হুজুর আমার স্বামীর মতে এগুলা আমার হবে না।কেনোনা সে সেগুলো কিনে দিয়েছে।এখন আমাকে সেগুলো দিচ্ছেও না।আসলে ইসলাম কি বলে এই ব্যাপারে?
Answer
স্বর্ণের আসল মালিক কে? — ইসলামের দৃষ্টিতে বিস্তারিত উত্তর
উত্তর (সংক্ষেপে): ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে বিয়ের সময় কনেকে যে স্বর্ণ ও গহনা দেওয়া হয় এবং গিফট হিসেবে যা আসে—সবই কনের সম্পূর্ণ মালিকানায় চলে যায়, যদি তা হিবা (দান) হিসেবে দেওয়া হয়। স্বামী নিজে টাকা দিয়ে কিনে দিলেও—যদি তা স্ত্রীকে হিবা/উপহার হিসেবে দেওয়া হয়—তবে মালিকানা স্ত্রীরই হয়; স্বামীর "আমি টাকা দিয়েছি" বলে তা ফেরত নেওয়া বা আটকে রাখার অধিকার নেই। বিশেষভাবে মোহরের আংটি ও ব্রেসলেট সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর মালিকানা, কারণ মোহর স্ত্রীর হক (সূরা নিসা: ৪)। তবে কিছু সূক্ষ্মতা আছে, যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. মূল নীতি: হিবা (দান) সম্পন্ন হলে মালিকানা হস্তান্তরিত হয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يُعْطِيَ عَطِيَّةً فَيَرْجِعَ فِيهَا إِلَّا الْوَالِدَ فِيمَا يُعْطِي وَلَدَهُ» "কোনো ব্যক্তির জন্য তার দেওয়া দান ফিরিয়ে নেওয়া হালাল নয়, পিতা তার সন্তানকে যা দেয় তা ছাড়া।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৩৯; তিরমিজি: ২১৩২; নাসাঈ: ৩৬৯০ — হাসান সহীহ)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী, হিবা তিনটি শর্তে সম্পন্ন হয়:
- ঈজাব ও কবুল (দানকারীর প্রস্তাব ও গ্রহীতার সম্মতি),
- কবজা (দখল) — গ্রহীতা জিনিসটি হাতে পাওয়া,
- দানকারীর মালিকানাধীন হওয়া।
কবজা সম্পন্ন হলে মালিকানা সম্পূর্ণভাবে গ্রহীতার কাছে চলে যায়; দানকারীর আর কোনো অধিকার থাকে না। (আল-হিদায়া, কিতাবুল হিবা; রাদ্দুল মুহতার: ৫/৬৮৮-৬৯০)
২. বিয়ের সময় কনেকে দেওয়া স্বর্ণ
বিয়ের সময় পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন বা শ্বশুরবাড়ি থেকে কনেকে যে স্বর্ণ/গহনা দেওয়া হয়—এগুলো সাধারণত হিবা হিসেবে দেওয়া হয়। সুতরাং:
- কনের সম্পূর্ণ মালিকানা এতে প্রতিষ্ঠিত হয়।
- পরে কেউ তা ফেরত দাবি করতে পারে না।
- শ্বশুড়ি বা ননদ যদি তা "রেখে দেয়" (আটকে রাখে), তবে তা গাসব (অন্যায় দখল) হিসেবে গণ্য হবে এবং তারা গুনাহগার হবে।
«مَنْ ظَلَمَ قِيدَ شِبْرٍ مِنَ الْأَرْضِ طُوِّقَهُ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ» "যে ব্যক্তি এক বিঘত জমি অন্যায়ভাবে দখল করবে, কিয়ামতের দিন সাত তবক জমিন তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরানো হবে।" — (সহীহ বুখারী: ২৪৫৩; সহীহ মুসলিম: ১৬১২)
এ হাদীস জমিন সম্পর্কে হলেও মূলনীতি হলো—অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ আটকে রাখা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কুরআনে ইরশাদ:
«وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ» "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।" — (সূরা বাকারা: ১৮৮)
৩. মোহরের আংটি ও ব্রেসলেট — বিশেষভাবে স্ত্রীর হক
মোহর হলো বিয়ের বিনিময়ে স্ত্রীর উপর স্বামীর ওয়াজিব দায়। কুরআনে ইরশাদ:
«وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً» "তোমরা নারীদের তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে দিয়ে দাও।" — (সূরা নিসা: ৪)
মোহর যা-ই হোক—নগদ টাকা, স্বর্ণ, আংটি বা ব্রেসলেট—তা সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর মালিকানা। স্বামী মোহর হিসেবে যা দিয়েছে, তা ফেরত নেওয়ার কোনো অধিকার তার নেই। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"মোহর স্ত্রীর হক; তা আদায় করা স্বামীর উপর ওয়াজিব। আদায়ের পর তা স্ত্রীর সম্পদ, তাতে স্বামীর কোনো অধিকার নেই।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/১০১-১০২, কিতাবুল মাহর)
বিশেষভাবে: মোহরের আংটি ও ব্রেসলেট যদি মোহর হিসেবে নির্ধারিত হয় বা মোহরের অংশ হিসেবে দেওয়া হয়—তবে তা স্পষ্টভাবে স্ত্রীর সম্পদ। স্বামীর "আমি কিনেছি" বলে তা আটকে রাখা শরীয়তবিরোধী ও গুনাহের কাজ।
৪. স্বামী নিজে টাকা দিয়ে কিনে স্ত্রীকে দিলে
এখানে দুটি অবস্থা:
(ক) যদি হিবা/উপহারের নিয়তে দেওয়া হয়: মালিকানা স্ত্রীর। স্বামী "আমি কিনেছি" বলে ফেরত চাইতে পারে না। রাসূল ﷺ বলেছেন:
«الْعَائِدُ فِي هِبَتِهِ كَالْعَائِدِ فِي قَيْئِهِ» "নিজের দান ফিরিয়ে নেওয়া ব্যক্তি যেন নিজের বমি ফিরিয়ে খায়।" — (সহীহ বুখারী: ২৬২২; সহীহ মুসলিম: ১৬২২)
(খ) যদি শুধু ব্যবহারের অনুমতি (ইয়ারাত) হয়, মালিকানা হস্তান্তরের নিয়ত না থাকে: তবে মালিকানা স্বামীরই থাকে। কিন্তু বিয়ের উপহার, মোহর বা গিফট হিসেবে দেওয়া গহনা সাধারণত হিবার নিয়তেই হয়—এবং প্রথা (উরফ) অনুযায়ীও তা স্ত্রীর। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) উরফের ভিত্তিতে হিবা নির্ধারণের নীতি উল্লেখ করেছেন। (রাদ্দুল মুহতার: ৫/৬৯০)
সুতরাং: স্বামী যদি স্পষ্টভাবে "এটা তোমাকে দিলাম" বলে দেয় বা বিয়ের উপহার হিসেবে দেয়—তবে তা স্ত্রীর। "আমি টাকা দিয়েছি" বলে তা ফেরত নেওয়া ইসলামে বৈধ নয়।
৫. শ্বশুড়ি ও ননদেরা স্বর্ণ রেখে দিলে
এটি স্পষ্ট গাসব ও হারাম। কারণ:
- স্বর্ণ কনের মালিকানাধীন,
- তাদের কোনো শরীয়তসম্মত অধিকার নেই,
- জোরপূর্বক বা চালাকি করে আটকে রাখা আমানতের খিয়ানত ও সম্পদ আত্মসাৎ।
কুরআনে ইরশাদ:
«إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا» "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন—আমানত তার হকদারের কাছে ফিরিয়ে দিতে।" — (সূরা নিসা: ৫৮)
রাসূল ﷺ বলেছেন:
«أَدِّ الْأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ، وَلَا تَخُنْ مَنْ خَانَكَ» "যে তোমাকে আমানত রেখেছে, তাকে তা ফিরিয়ে দাও; আর যে তোমার সাথে খিয়ানত করেছে, তুমি তার সাথে খিয়ানত করো না।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৩৫; তিরমিজি: ১২৬৪)
৬. ব্যবহারিক পরামর্শ ও করণীয়
- শান্তভাবে ও হিকমতের সাথে কথা বলুন: স্বামীকে বুঝান যে ইসলামে হিবা ফেরত নেওয়া নিষিদ্ধ এবং মোহর স্ত্রীর হক। সরাসরি অভিযোগ না করে ভালোবাসা ও দ্বীনি দলিলের মাধ্যমে বোঝান।
- দলিল পেশ করুন: উপরের আয়াত ও হাদীসগুলো স্বামীকে দেখান; প্রয়োজনে কোনো বিশ্বস্ত আলেমের সাথে পরামর্শ করুন।
- সাক্ষী রাখুন: পারিবারিক আলোচনায় ন্যায়পরায়ণ ও দ্বীনদার ব্যক্তিদের সাক্ষী রাখুন।
- ধৈর্য ও দুআ: আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন; তিনি হক আদায়কারীর সহায়।
- যদি না মানে: স্থানীয় মুফতি/দারুল ইফতার সাথে যোগাযোগ করুন; প্রয়োজনে শরীয়তসম্মত পথে হক আদায়ের ব্যবস্থা নিন। তবে পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে প্রথমে সুলহ (আপস) ও বুঝানোর চেষ্টা করুন।
- মনে রাখুন: মোহর ও হিবা—দুটোই স্ত্রীর হক। তবে পারিবারিক শান্তি রক্ষার জন্য ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সাথে সমাধান কাম্য।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | মালিকানা | দলিল | |---|---|---| | বিয়েতে কনেকে দেওয়া স্বর্ণ/গহনা | কনের (হিবা সম্পন্ন হলে) | আল-হিদায়া; রাদ্দুল মুহতার ৫/৬৮৮ | | গিফটের স্বর্ণ | কনের | সূরা বাকারা: ১৮৮; বুখারী: ২৬২২ | | মোহরের আংটি/ব্রেসলেট | কনের (মোহর = স্ত্রীর হক) | সূরা নিসা: ৪; রাদ্দুল মুহতার ৩/১০১ | | স্বামী কিনে উপহার দিলে | স্ত্রীর (হিবার নিয়তে) | আবু দাউদ: ৩৫৩৯; বুখারী: ২৬২২ | | শ্বশুড়ি/ননদ আটকে রাখলে | গাসব/হারাম | সূরা নিসা: ৫৮; বুখারী: ২৪৫৩ |
উপসংহার: ইসলামের দৃষ্টিতে আপনার বিয়ের স্বর্ণ, গিফটের স্বর্ণ এবং বিশেষভাবে মোহরের আংটি ও ব্রেসলেট—সবই আপনার সম্পূর্ণ মালিকানা। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কেউ তা আটকে রাখার শরীয়তসম্মত অধিকার রাখে না। তবে পারিবারিক কল্যাণের জন্য ধৈর্য, হিকমত ও দ্বীনি দলিলের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করুন; প্রয়োজনে আলেমের পরামর্শ নিন।
والله أعلم بالصواب