পুলিশ প্রশসনে চাকরি
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
বাংলাদেশে পুলিশ/প্রশাসন/কাস্টমস ক্যাডারে চাকরির বিধান
প্রশ্ন: বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিসিএস দিয়ে পুলিশ/প্রশাসন/কাস্টমস ক্যাডারে যাওয়া কি জায়েজ? ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়াও সরাসরি কুফরি সরকারের আনুগত্যের বিষয়টি আমলে নিলে? মেডিকেলের মতো রুখসতের সুযোগ আছে কি?
সংক্ষিপ্ত শরয়ী সিদ্ধান্ত:
ঘুষ, দুর্নীতি, অন্যায় জুলুম এবং শরীয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে শতভাগ মুক্ত রাখার শর্তে বিসিএস দিয়ে পুলিশ, প্রশাসন বা কাস্টমস ক্যাডারে চাকরি করা মূলত জায়েয ও বৈধ।
মেডিকেল ক্যাডারের মতো এসব ক্যাডারেও সাধারণ মানুষের সেবা করা, সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অপরাধ দমন করা এবং মজলুমের হক আদায় করে দেওয়ার শরয়ী রুখসত বা সুযোগ রয়েছে।
বিস্তারিত শরয়ী বিশ্লেষণ ও আবশ্যকীয় মূলনীতিসমূহ:
১. অ-ইসলামি বা সেক্যুলার সরকারের অধীনে সরকারি চাকরির হুকুম:
ফিকহের নির্ভরযোগ্য মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো অমুসলিম বা সেক্যুলার সরকারের অধীনে প্রশাসনিক বা সরকারি বিভিন্ন বিভাগে চাকরি করা মূলত জায়েয, যদি অর্পিত কাজের মূল দায়িত্বটি শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ ও জনকল্যাণমূলক হয়। কিতাবে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, সাধারণ জনগণের উপকার ও সেবা অর্জনের লক্ষ্যে সেক্যুলার বা অ-ইসলামি শাসনব্যবস্থার অধীনেও সরকারি চাকরি গ্রহণ করা শরীয়তসম্মত।
২. জুলুম প্রতিরোধ ও খেদমতের নিয়ত (রুখসতের ভিত্তি):
প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারে যোগ দিয়ে যদি কোনো কর্মকর্তা মিথ্যা মামলা, অন্যায় গ্রেফতার বা নিরপরাধ মানুষের ওপর জুলুম না করে বরং সাধারণ মানুষকে জালেমের হাত থেকে রক্ষা করার এবং সঠিক বিচার ও ইনসাফ কায়েম করার নিয়ত রাখেন, তবে এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি অন্যতম উত্তম খেদমত বা রুখসত হিসেবে গণ্য হয়।
৩. সরকারের আনুগত্যের শরয়ী সীমারেখা:
ইসলামি শরীয়তে রাষ্ট্র বা সরকারের আনুগত্য কেবল শরীয়তসম্মত ও জনকল্যাণমূলক (মুবাহ) কাজের মাঝেই সীমাবদ্ধ। হাদিস শরীফের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হলো—لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةِ اللهِ (অর্থাৎ আল্লাহর নাফরমানি বা গোনাহের কাজে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না)।
অতএব, চাকরিতে থাকাকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা সরকার যদি কখনো শরীয়তবিরোধী কোনো অন্যায়, নিরপরাধ কারো ওপর জুলুম, মিথ্যা রিপোর্ট তৈরি বা ঘুষ গ্রহণের নির্দেশ দেয়, তবে সেই সুনির্দিষ্ট নির্দেশ বা আদেশ অমান্য করা আবশ্যক; সেখানে আনুগত্য করা সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েয।
৪. সংবিধান ও সিস্টেমের রক্ষক হওয়ার বিষয়:
চাকরিতে নিয়োগের সময় যে শপথ বা আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে, ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে তা মূলত রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও দায়িত্ব পালনের একটি অঙ্গীকার। একজন ঈমানদার কর্মকর্তার মূল আনুগত্য থাকবে মহান আল্লাহর বিধানের প্রতি। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজেকে ব্যক্তিগত কুফরি, আকিদাগত ভ্রষ্টতা ও গোনাহের কাজ থেকে বাঁচিয়ে রেখে কেবল জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব পালন করবেন।
৫. কখন এই চাকরি নাজায়েয হবে:
যদি কোনো নির্দিষ্ট পদে বা কর্মস্থলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে, সেখানে অবস্থান করলে সরাসরি শরীয়তবিরোধী কাজ (যেমন: ঘুষ নেওয়া, নির্দোষ মানুষকে নির্যাতন করা বা অন্যায়ের আইনি বৈধতা দেওয়া) ছাড়া দায়িত্ব পালন করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং তা থেকে বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ না থাকে, তবে কেবল সেই সুনির্দিষ্ট পদ বা পরিস্থিতিতে চাকরি করা নাজায়েয হবে।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. বুহুস ফি কাযায়া ফিকহিয়্যাহ মুয়াসারা (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৯৮ (অধ্যায়: 'আমালুল মুসলিম ফী দাওয়াইরিল হুকুমাহ' — অ-ইসলামি ও সেক্যুলার সরকারের অধীনে সরকারি চাকরি ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কাজের শরয়ী ফায়সালা)।
২. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩৫৯–৩৬১ (অধ্যায়: সরকারের আনুগত্যের সীমারেখা, 'লা ত্বাআতা ফী মা'সিয়াতিল্লাহ' মূলনীতি এবং অন্যায়ের ক্ষেত্রে আদেশ অমান্য করার বাধ্যবাধকতা)।
- পৃষ্ঠা: ৩৬১–৩৬২ (অধ্যায়: শরীয়তবিরোধী আইনি পরিস্থিতিতে একজন মুসলিমের করণীয় ও বাধ্যবাধকতার সীমানা)।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৫২ (অধ্যায়: কিতাবুস সিয়াসা ওয়াল হিজরাহ — অ-ইসলামি বা সেক্যুলার প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জনসেবা ও অপশাসন থেকে মুসলমানদের রক্ষার উদ্দেশ্যে অংশগ্রহণের ফাতাওয়া)।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।