রিসেলিং বা ড্রপ শপিং ব্যবসার শরয়ী বিধান।
Business and Job · Hanafi
Question
মাননীয় মুফতি সাহেব দা.বা.
বিষয়: রিসেলিং বা ড্রপ শপিং পদ্ধতিতে ব্যবসা প্রসঙ্গে।
প্রশ্ন: আমি greenish trade ltd (https://www.greenishtradeltd.com) ও Globalway (https://globalwaybd.com) নামক দুটি রিসেলিং ইকমার্স ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ব্যবসা করি, তাদের ব্যবসার রীতিনীতি প্রায় এক। কিছু পার্থক্য আছে। তাদের সাথে ব্যবসা করতে হলে তাদের একটি একাউন্ট খুলতে হয়। একাউন্ট খুলতে greenish trade ওয়েবসাইটে কোন প্রকার ফি দিতে হয় না, কিন্তু Globalway ওয়েবসাইটে ১৪০০ টাকা দিতে হয়, তারা বলে টাকা নেওয়ার কারণ হলো, তারা ব্যবসা করার জন্য অনলাইনে কিছু কাজ শিখাবে তার ক্লাস ফি হিসেবে নিতেছে। তাদের কাছ থেকে পণ্য বিক্রির রীতিনীতি হলো, তারা ওয়েবসাইটে পণ্যের মূল্য ও বিবরণ দিবে আমি এখান থেকে নিয়ে মর্কেটিং করে লভ্যাংশ অর্জন করবো। যেমন: তাদের ওয়েবসাইটে একটি বইয়ের ছবি বা ভিডিও ও তার বিবরণ দেওয়া আছে ও মূল্য নির্ধারণ আছে ৪০০ টাকা (যা তারা নিবে) আরেকটি মূল্য থাকে ৫০০ বা ৬০০ টাকা (যে মূল্যে আমি বিক্রি করবো) এর মূল্যের ভিতরে আমি বিক্রি করবো। এখন আমার কাজ হলো ওয়েবসাইট হতে বইয়ের ছবি/ভিডিও ও বিবরণ নিয়ে আমার ফেইসবুক পেজে বা অন্য কোন সোশাল মিডিয়ায় আপলোড করবো তা থেকে কাস্টমার আমার সাথে ডিল করবে। কাস্টমার অর্ডার কনফার্ম করলে আমাকে তার ঠিকানা দিবে। আমি ওয়েবসাইটে কাস্টমারের ঠিকানা দিয়ে দিব।আর কোম্পানি কাস্টমারের কাছে বই ডেলিভারি দিবে। কাস্টমার ডেলিভারি রিসিভ করার পর আমার একাউন্টে আমার লভ্যাংশ কোম্পানি দিয়ে দিবে। আর এ দু ওয়েবসাইটের রিটার্ন পলিসি হলো, যদি কাস্টমার পণ্য রিটার্ন করে বা রিসিভ না করে তাহলে Greenish trade এর নিয়মে আমার ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে (এ বিষয়ে আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে যে পণ্য আপনাদের তাহলে ডেলিভারি চার্জ আমি দেব কেন? তারা বলে যে আপনার কাস্টমার আপনি কিভাবে ডিল করবেন আপনি জানেন)। আর Globalway এর নিয়মে ডেলিভারি চার্জ বাবদ ১০০ আমার দিতে হবে (এ বিষয়ে আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে যে পণ্য আপনাদের তাহলে ডেলিভারি চার্জ আমি দেব কেন? তারা বলে আপনার কথায় কাস্টমারের কাছে পণ্য গেছে তাই ডেলিভারি চার্জ আপনার দিতে হবে)। এখানে আমার কিছু বিষয়ে জটিলতা মনে হয়। ১. আমার পণ্যের কবজা হয় না। ২. অণ্যের পন্য রিটার্ন হলে আমার ডেলিভারি চার্জ দিতে হয়। এখন মুফতি সাহেবের নিকট জানার বিষয় হলো উল্লেখিত পদ্ধতিতে ব্যবসা করতে শরয়ী কি কি জটিলতা আছে তার নিরসন। এবং তার পদ্ধতিগত কি পরিবর্তন করলে তাতে বৈধ পথ অবলম্বন করা যাবে। বিস্তারিত জানিয়ে হালাল ভাবে দুনিয়ায় চলার পথ হতে সাহায্য করবেন।
নিবেদক
মুহা. তাহমিদ
শ্রীপুর, গাজীপুর
যোগাযোগ: mdtahmidhossain151@gmail
Answer
রিসেলিং বা ড্রপ শপিং পদ্ধতিতে ব্যবসার শরয়ী বিধান
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
ভূমিকা
আপনার প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিটি বর্তমানে "ড্রপ শপিং" বা "রিসেলিং" নামে পরিচিত। এতে মূলত তিনটি পক্ষ থাকে: (১) মূল কোম্পানি/সাপ্লায়ার, (২) রিসেলার (আপনি), (৩) ক্রেতা/কাস্টমার। শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি মূলত সামসারাহ (মধ্যস্থতাকারী) বা ওকালত (প্রতিনিধিত্ব)-এর অন্তর্ভুক্ত, যা মূলত জায়েয। তবে আপনার বর্ণিত পদ্ধতিতে কয়েকটি শরয়ী জটিলতা রয়েছে, যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. মূল ব্যবসায়িক পদ্ধতির শরয়ী বিশ্লেষণ
(ক) সামসারাহ বা দালালি হিসেবে ব্যবসা
আপনি কোম্পানির পণ্য নিজের কাছে রাখছেন না, বরং কোম্পানির পণ্যের ছবি/বিবরণ নিয়ে মার্কেটিং করছেন এবং ক্রেতা পেলে কোম্পানিকে জানাচ্ছেন। কোম্পানি সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে এবং আপনাকে লভ্যাংশ দিচ্ছে। এটি মূলত সামসারাহ (দালালি) বা ওকালত (প্রতিনিধিত্ব)-এর অন্তর্ভুক্ত।
শরয়ী মূলনীতি: সামসারাহ বা দালালি জায়েয। দালাল তার খেদমতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক (কমিশন) নিতে পারে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৬৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৯৭)
তবে শর্ত হলো—দালালি বা ওকালতের চুক্তিটি স্পষ্ট হতে হবে এবং পারিশ্রমিক নির্ধারিত হতে হবে।
(খ) মূল্য নির্ধারণ ও লভ্যাংশ
আপনি কোম্পানির নির্ধারিত মূল্য (যেমন ৪০০ টাকা) থেকে বেশি মূল্যে (যেমন ৫০০-৬০০ টাকা) বিক্রি করছেন এবং পার্থক্যটুকু আপনার লভ্যাংশ হিসেবে থাকছে। এটি সামসারাহর ক্ষেত্রে জায়েয, কারণ দালাল তার খেদমতের বিনিময়ে বেশি পারিশ্রমিক নিতে পারে, যদি চুক্তিতে তা স্পষ্ট থাকে।
ইমদাদুল ফাতাওয়া (খণ্ড ৩, পৃ. ১৩৪): "দালালি বা কমিশনের ব্যবসায় মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া জরুরি নয়; বরং নির্দিষ্ট হারে কমিশন ঠিক করে নিলেই যথেষ্ট।"
২. শরয়ী জটিলতাসমূহ
জটিলতা ১: পণ্যের কবজা (দখল) না হওয়া
আপনি পণ্যের মালিক না হয়েও পণ্য বিক্রি করছেন। ফিকহের পরিভাষায় এটি "বাইউ মা লা ইয়ামলিক" (যা আপনার মালিকানায় নেই তা বিক্রি করা)-এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা নিষিদ্ধ।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তুমি যা তোমার মালিকানায় নেই তা বিক্রি করো না।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৫০৩; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১২৩২)
তবে সমাধান: যদি আপনি নিজেকে কোম্পানির প্রতিনিধি (ওয়াকিল) বা দালাল (সামসার) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন—অর্থাৎ আপনি কোম্পানির পক্ষ থেকে ক্রেতার সাথে চুক্তি করছেন এবং কোম্পানি সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করছে—তাহলে এটি জায়েয হবে। কারণ তখন আপনি নিজে বিক্রেতা নন, বরং কোম্পানির প্রতিনিধি।
শর্ত: চুক্তিতে স্পষ্ট থাকতে হবে যে আপনি কোম্পানির প্রতিনিধি/দালাল হিসেবে কাজ করছেন, নিজে পণ্যের মালিক নন।
জটিলতা ২: রিটার্ন হলে ডেলিভারি চার্জ আপনাকে দেওয়া
এটি একটি বড় জটিলতা। যদি পণ্য কোম্পানির হয় এবং কোম্পানি সরাসরি ক্রেতার কাছে পাঠায়, তাহলে রিটার্নের ক্ষেত্রে ডেলিভারি চার্জ আপনার উপর চাপানো শরীয়তের দৃষ্টিতে অন্যায় ও অবৈধ।
শরয়ী মূলনীতি: "ক্ষতি সেই বহন করবে যে লাভের মালিক।" (আল-খারাজ বিমা দামানাতিল আমল)
যেহেতু পণ্যের মালিক কোম্পানি এবং লাভের বড় অংশও কোম্পানির, তাই রিটার্নের ক্ষতিও কোম্পানির বহন করা উচিত। আপনাকে জোরপূর্বক ডেলিভারি চার্জ দেওয়ানো আকদে ফাসিদ (বাতিল চুক্তি)-এর অন্তর্ভুক্ত।
সমাধান:
- চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে, রিটার্নের ক্ষেত্রে ডেলিভারি চার্জ কে বহন করবে।
- যদি কোম্পানি বলে যে "আপনার কথায় ক্রেতা পণ্য নিয়েছে, তাই চার্জ আপনার"—এটি শরীয়তসম্মত নয়। কারণ আপনি তো কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন, ক্রেতার সাথে প্রতারণা করেননি।
- বৈধ পথ: হয় কোম্পানি নিজেই রিটার্নের চার্জ বহন করবে, অথবা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা থাকবে যে রিসেলার নির্দিষ্ট হারে (যেমন ১০০ টাকা) চার্জ বহন করবে—এবং রিসেলার তা জেনে-বুঝে রাজি হয়েছে। তবে এটি নিছক শর্ত হিসেবে জায়েয হবে, কিন্তু নৈতিকভাবে কোম্পানির উচিত নয়।
জটিলতা ৩: Globalway-এর ১৪০০ টাকা ফি
Globalway ১৪০০ টাকা "ক্লাস ফি" হিসেবে নিচ্ছে। এটি দুটি দিক থেকে দেখতে হবে:
-
যদি প্রকৃতপক্ষে প্রশিক্ষণ/ক্লাস দেওয়া হয় এবং তার বিনিময়ে ফি নেওয়া হয়—তাহলে এটি ইজারাহ (ভাড়া)-এর অন্তর্ভুক্ত, যা জায়েয। কারণ প্রশিক্ষণ একটি খেদমত, তার বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ।
-
যদি ক্লাসের নামে অতিরিক্ত ফি নেওয়া হয় এবং প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রশিক্ষণ না দেওয়া হয়—তাহলে এটি আকলে বাতিল (অবৈধ ভক্ষণ)-এর অন্তর্ভুক্ত হবে।
কুরআন: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।" (সূরা নিসা: ২৯)
পরামর্শ: নিশ্চিত হয়ে নিন যে ১৪০০ টাকার বিনিময়ে প্রকৃত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় কি না। যদি প্রকৃত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তাহলে তা জায়েয।
৩. বৈধ পথ অবলম্বনের জন্য করণীয়
(ক) চুক্তির ধরন স্পষ্ট করুন
আপনি কোম্পানির সাথে সামসারাহ (দালালি) বা ওকালত (প্রতিনিধিত্ব)-এর চুক্তি করুন। চুক্তিতে স্পষ্ট থাকবে:
- আপনি কোম্পানির প্রতিনিধি/দালাল হিসেবে কাজ করবেন।
- কোম্পানি সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করবে।
- আপনার পারিশ্রমিক/কমিশন নির্দিষ্ট থাকবে (যেমন: বিক্রয়মূল্যের ১০% বা নির্দিষ্ট পরিমাণ)।
- রিটার্নের ক্ষেত্রে দায়-দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
(খ) রিটার্ন পলিসি ন্যায্যভাবে নির্ধারণ করুন
- রিটার্নের চার্জ কোম্পানি বহন করবে, অথবা
- চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে যে রিসেলার নির্দিষ্ট পরিমাণ (যেমন ১০০ টাকা) বহন করবে—এবং রিসেলার তা জেনে-বুঝে রাজি হয়েছে।
- জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া বৈধ নয়।
(গ) পণ্যের মালিকানা ও দায়
যেহেতু পণ্য কোম্পানির এবং কোম্পানি সরাসরি ডেলিভারি দেয়, তাই:
- পণ্যের মান, ডেলিভারি, রিটার্ন—সব দায় কোম্পানির।
- আপনি শুধু মার্কেটিং ও ক্রেতা সংগ্রহের কাজ করবেন।
- আপনার পারিশ্রমিক হবে কমিশন, যা কোম্পানি আপনাকে দেবে।
(ঘ) বিকল্প পদ্ধতি: ওয়াকালাহ চুক্তি
আপনি কোম্পানির ওয়াকিল (প্রতিনিধি) হিসেবে ক্রেতার সাথে চুক্তি করবেন। কোম্পানি আপনাকে নির্দিষ্ট কমিশন দেবে। ক্রেতা কোম্পানির কাছে পেমেন্ট করবে, কোম্পানি আপনাকে কমিশন দেবে। এতে পণ্যের মালিকানা ও দায় কোম্পানির থাকবে, আপনি শুধু মধ্যস্থতাকারী।
ফাতাওয়া উসমানি (খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৫): "ওয়াকালাহ চুক্তিতে ওয়াকিল নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক পাবে এবং মূল ব্যবসার দায় মুয়াক্কিলের উপর থাকবে।"
৪. সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত পরামর্শ
| বিষয় | শরয়ী হুকুম | সমাধান | |------|-----------|--------| | পণ্যের কবজা না থাকা | জায়েজ নেই | তাই নিজেকে সেই কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে চুক্তিবদ্ধ করুন | | রিটার্নে ডেলিভারি চার্জ | অবৈধ (যদি জোরপূর্বক হয়) | চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন; ন্যায্যভাবে নির্ধারণ করুন | | ১৪০০ টাকা ক্লাস ফি | জায়েয (যদি প্রকৃত প্রশিক্ষণ হয়) | নিশ্চিত হোন যে প্রকৃত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় | | লভ্যাংশ | জায়েয (কমিশন হিসেবে) | নির্দিষ্ট হারে কমিশন ঠিক করুন |
চূড়ান্ত পরামর্শ:
- চুক্তিপত্র লিখিতভাবে করুন — মৌখিক চুক্তির চেয়ে লিখিত চুক্তি উত্তম, যাতে পরবর্তীতে বিরোধ এড়ানো যায়।
- সামসারাহ/ওয়াকালাহ চুক্তি করুন — নিজেকে বিক্রেতা হিসেবে নয়, বরং দালাল/প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করুন।
- রিটার্ন পলিসি ন্যায্যভাবে নির্ধারণ করুন — জোরপূর্বক চার্জ চাপানো থেকে বিরত থাকুন।
- সন্দেহজনক কোম্পানি থেকে বিরত থাকুন — যদি কোম্পানি শরীয়তবিরোধী শর্ত আরোপ করে, তবে সেই কোম্পানির সাথে ব্যবসা পরিহার করুন।
- হালাল উপার্জনের জন্য দুআ করুন — আল্লাহ তা'আলা হালাল রুজি দান করুন।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "হালাল স্পষ্ট এবং হারাম স্পষ্ট। কিন্তু এতদুভয়ের মাঝে কিছু সন্দেহজনক বিষয় রয়েছে, যা অনেক মানুষ জানে না। যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও সম্মান রক্ষা করবে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৯৯)
والله أعلم بالصواب