মৃত ব্যক্তির জন্য কি কি করা যাবে আর কি কি করা যাবে না?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
অসুস্থ্য ব্যক্তির জন্য কোনো খতম পড়া যাবে কি ( উপরে উল্লেখিত)?
Answer
মৃত ব্যক্তির জন্য করণীয় ও বর্জনীয়: কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি জীবন ও মৃত্যুর একমাত্র মালিক। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপর।
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের সমাজে এ সংক্রান্ত অনেক বিভ্রান্তি ও কুসংস্কার প্রচলিত আছে। নিচে ধাপে ধাপে কুরআন, হাদিস ও নির্ভরযোগ্য হানাফি কিতাবের আলোকে উত্তর প্রদান করা হলো।
১. মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন খতম ও তসবিহ খতম পড়া যাবে কি?
(ক) মূলনীতি
ইসলামের মূলনীতি হলো—প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ আমলের জন্য দায়ী। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ" "এবং মানুষের জন্য তাই আছে, যা সে চেষ্টা করে।" (সূরা আন-নাজম: ৩৯)
তবে হাদিসে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া, ইস্তিগফার ও সদকা করার অনুমতি এসেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، وَعِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، وَوَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ" "মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ছাড়া: (১) সদকায়ে জারিয়া, (২) এমন ইলম যা থেকে উপকার নেওয়া হয়, (৩) নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)
(খ) কুরআন খতম পড়ে মৃতকে ঈসালে সওয়াব করা
হানাফি মাজহাবে কুরআন খতম করে মৃতকে ঈসালে সওয়াব করা জায়েজ। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (২/২৪৩) গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
"মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন পড়া এবং তার সওয়াব মৃতকে পৌঁছানো—এটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নিকট গ্রহণযোগ্য।"
তবে শর্ত হলো:
- কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা (যেমন ৪১ বার ইয়াসিন, ৭৫০০০ বার তসবিহ) কে ফরজ বা ওয়াজিব মনে করা যাবে না।
- এগুলোকে অপরিহার্য আকীদা বানানো যাবে না।
- বিনা পারিশ্রমিকে, ইখলাসের সাথে পড়তে হবে।
- মৃতের ওয়ারিশদের সম্পদ থেকে টাকা নিয়ে খতম পড়ানো—এটি বিদআত ও নাজায়েজ।
(গ) নির্দিষ্ট সংখ্যার খতম (৪১ ইয়াসিন, ৭৫০০০ তসবিহ ইত্যাদি)
এ ধরনের নির্দিষ্ট সংখ্যার খতমের কোনো দলিল হাদিসে নেই। এটি পরবর্তী যুগে প্রচলিত হয়েছে। মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি" (১/৩২৭) গ্রন্থে বলেন:
"মৃতের জন্য কুরআন পড়া জায়েজ, কিন্তু নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা এবং তা ওয়াজিব মনে করা বিদআত।"
সুতরাং:
- সাধারণভাবে কুরআন পড়ে সওয়াব মৃতকে বখশানো—জায়েজ।
- ৪১ ইয়াসিন, ৭৫০০০/১২৫০০০ তসবিহ, সোয়া লাখ দোয়া ইউনুস—এগুলোকে ফরজ/ওয়াজিব মনে করা—বিদআত।
- এগুলো নফল হিসেবে পড়া যেতে পারে, তবে একে সুন্নাহ বা অপরিহার্য বলা যাবে না।
২. মৃত ব্যক্তির জন্য জিকির করা যাবে কি?
হ্যাঁ, জায়েজ। মৃতের জন্য দোয়া, ইস্তিগফার, দরুদ ও জিকির করা যায়। আল্লাহ বলেন:
"وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ" "এবং যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে: হে আমাদের রব! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের ভাইদেরও, যারা ঈমানের সাথে আমাদের পূর্বে গত হয়েছে।" (সূরা আল-হাশর: ১০)
তবে মৃতের ঘরে সমবেত হয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে জিকিরের মজলিস করা—এটি সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।
৩. মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন খতমের নিয়ম
- এককভাবে কুরআন পড়ে সওয়াব মৃতকে বখশানো—উত্তম।
- পারিশ্রমিক নিয়ে খতম পড়ানো—নাজায়েজ।
- নির্দিষ্ট সময়/সংখ্যা নির্ধারণ করে তা অপরিহার্য করা—বিদআত।
- খতম শেষে দোয়া করা—জায়েজ।
- খতমের জন্য বিশেষ আয়োজন, খাওয়া-দাওয়া, দাওয়াত—এগুলো সুন্নাহ নয়।
৪. মৃত ব্যক্তির জন্য মিলাদ-কিয়াম করা যাবে কি?
মিলাদ-কিয়াম মৃতের জন্য করা—এটি বিদআত।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন—কেউ মৃতের জন্য মিলাদ-কিয়াম করেননি।
- মিলাদ-কিয়ামের প্রচলন পরবর্তী যুগে শুরু হয়েছে।
- ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (১/৫৬০) গ্রন্থে বলেন: "মিলাদ-কিয়ামের মজলিস বিদআত।"
মৃতের জন্য করণীয় হলো: দোয়া, ইস্তিগফার, সদকা, কুরআন তিলাওয়াত (সওয়াব বখশানো)।
৫. মৃত ব্যক্তির জন্য দরুদ পড়া যাবে?
হ্যাঁ, জায়েজ। দরুদ সর্বোত্তম ইবাদত। মৃতের জন্য দরুদ পড়ে সওয়াব বখশানো যায়। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা বা বিশেষ পদ্ধতি নির্ধারণ করা যাবে না।
৬. গোসলের স্থানে মোমবাতি জ্বালাতে হবে?
না, এটি সুন্নাহ নয়, বরং বিদআত।
- মৃতকে গোসল দেওয়ার সময় মোমবাতি জ্বালানোর কোনো দলিল নেই।
- এটি হিন্দু ও অগ্নিপূজকদের সংস্কৃতি থেকে আগত।
- সুন্নাহ হলো: গোসলের স্থান পরিষ্কার, পর্দা, সুগন্ধি ব্যবহার, তিনবার গোসল দেওয়া ইত্যাদি।
৭. মৃত ব্যক্তির আত্মা কি ৪০ দিন পর্যন্ত দোয়া চাইতে আসে?
এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার।
- কুরআন-হাদিসে এর কোনো ভিত্তি নেই।
- মৃত ব্যক্তির আত্মা বারযাখ জগতে থাকে, দুনিয়ায় ফিরে আসে না।
- আল্লাহ বলেন: "وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ" (সূরা মুমিনুন: ১০০)।
- ৪০ দিন, ৩ দিন, ৭ দিন—এসব সংখ্যার কোনো ভিত্তি নেই।
৮. মৃত ব্যক্তির বাড়িতে করণীয় (সুন্নাত) ও বর্জনীয় (বিদআত)
সুন্নাত:
- দ্রুত দাফন করা।
- জানাজা পড়া।
- মৃতের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করা।
- সদকা করা।
- কুরআন পড়ে সওয়াব বখশানো।
- আত্মীয়-স্বজনকে খাবার খাওয়ানো (তবে মৃতের পরিবারের উপর বোঝা চাপানো নয়)।
- তিন দিন পর্যন্ত শোক পালন (স্ত্রীর জন্য ৪ মাস ১০ দিন)।
বিদআত:
- ৩ দিন, ৭ দিন, ১০ দিন, ৪০ দিনের বিশেষ খতম।
- মিলাদ-কিয়াম।
- গোসলের স্থানে মোমবাতি।
- মৃতের ঘরে সমবেত হয়ে বিশেষ জিকির।
- কুরআন খতমের জন্য টাকা নেওয়া।
- মৃতের নামে পশু জবাই করা।
- কবরের পাশে বিশেষ আয়োজন।
- ৪০ দিন পর্যন্ত দোয়া চাওয়ার বিশ্বাস।
- সোমবার মৃত্যুকে বিশেষ ফজিলত মনে করা।
৯. সোমবার মৃত্যুর কোনো ফজিলত আছে?
না, সোমবার মৃত্যুর কোনো বিশেষ ফজিলত হাদিসে প্রমাণিত নয়।
তবে কিছু বর্ণনায় আছে যে, সোমবার রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাত হয়েছিল। কিন্তু সোমবার মৃত্যুকে বিশেষ ফজিলত বলা—এর কোনো দলিল নেই। এটি কুসংস্কার।
১০. অসুস্থ ব্যক্তির জন্য খতম পড়া যাবে কি?
হ্যাঁ, জায়েজ। অসুস্থ ব্যক্তির জন্য:
- কুরআন পড়া
- দোয়া করা
- সদকা করা
- রুকইয়াহ করা (শরিয়াহসম্মত)
তবে নির্দিষ্ট সংখ্যার খতম (৪১ ইয়াসিন, ৭৫০০০ তসবিহ) কে অপরিহার্য মনে করা যাবে না।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | মৃতের জন্য কুরআন পড়া | জায়েজ | | নির্দিষ্ট সংখ্যার খতম | বিদআত (অপরিহার্য মনে করলে) | | মৃতের জন্য জিকির | জায়েজ | | মিলাদ-কিয়াম | বিদআত | | মৃতের জন্য দরুদ | জায়েজ | | গোসলের স্থানে মোমবাতি | বিদআত | | ৪০ দিন দোয়া চাওয়া | কুসংস্কার | | সোমবার মৃত্যুর ফজিলত | ভিত্তিহীন | | অসুস্থের জন্য খতম | জায়েজ (নির্দিষ্ট সংখ্যা ছাড়া) |
আরও পড়ুন
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) — ১/৩২৭
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) — ১/২৪৫
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) — ২/২৪৩
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মাদ শফি)
মূল কথা: মৃতের জন্য দোয়া, ইস্তিগফার, সদকা ও কুরআন তিলাওয়াত—এগুলোই সুন্নাহ। নির্দিষ্ট সংখ্যা, মিলাদ-কিয়াম, ৪০ দিনের বিশ্বাস—এগুলো বিদআত ও কুসংস্কার। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাহর উপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।