সুন্নাতে খাতনা উপলক্ষে মানুষ খাওয়ানো জায়েজ কি না ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5630
Questioner: Sabrina Akter Nadi
Question Asked: 17 Sep 2026, 11:21 PM
Reviewed & Published: 17 Sep 2026, 11:25 PM
Views: 44
Tokens: 3,671
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

সুন্নাতে খাতনা উপলক্ষে মানুষ খাওয়ানো জায়েজ?

Answer

সুন্নাতে খাতনা উপলক্ষে মানুষ খাওয়ানো জায়েজ?

প্রশ্ন: সুন্নাতে খাতনা উপলক্ষে মানুষ খাওয়ানো জায়েজ?

উত্তর:

সুন্নাতে খাতনা (খতনা/মুসালমানি) উপলক্ষে মানুষ খাওয়ানো বা ওয়ালিমা করা শরীয়তসম্মত এবং জায়েজ। এটি শুকরিয়া ও আনন্দ প্রকাশের একটি বৈধ মাধ্যম। তবে এতে কয়েকটি শর্ত ও সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।


১. খাতনার বিধান

খাতনা (পুরুষদের জন্য খতনা করা) সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«الْفِطْرَةُ خَمْسٌ: الْخِتَانُ، وَالِاسْتِحْدَادُ، وَقَصُّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمُ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفُ الْإِبْطِ»

অর্থ: "ফিতরত (স্বভাবজাত সুন্নত) পাঁচটি — খতনা করা, নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করা, গোঁফ ছোট করা, নখ কাটা এবং বগলের পশম উপড়ানো।"

— সহীহ বুখারী: ৫৮৮৯; সহীহ মুসলিম: ২৫৭

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে পুরুষের খতনা সুন্নত। (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৭৫১; ফাতাওয়া আলমগিরি, ৫/৩৫৭)


২. খাতনা উপলক্ষে খাওয়ানোর বিধান

(ক) জায়েজ হওয়ার দলিল

খাতনা উপলক্ষে খাওয়ানো মূলত একটি আনন্দ ও শুকরিয়ার ভোজ। শরীয়তে আনন্দ-উৎসব উপলক্ষে খাওয়ানোর অনুমতি রয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ সন্তান জন্মের পর আকিকা করেছেন এবং লোকদের খাওয়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«عَنِ الْغُلَامِ شَاتَانِ مُكَافِئَتَانِ، وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ»

অর্থ: "ছেলের জন্য দু'টি সমান বয়সের ছাগল এবং মেয়ের জন্য একটি ছাগল (আকিকার জন্য)।"

— সুনানে আবু দাউদ: ২৮৩৬; সুনানে তিরমিজি: ১৫১৬

আকিকা মূলত জন্মের সপ্তম দিনে হয়। তবে খাতনার সময়ও যদি আকিকা করা হয় বা শুকরিয়ার ভোজ দেওয়া হয়, তবে তা জায়েজ। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"আকিকা সপ্তম দিনে করা সুন্নত; তবে বালেগ হওয়ার পরও করা যায়।"

— রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৩৬

(খ) ফকীহদের অভিমত

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেন:

"খতনা উপলক্ষে খাওয়ানো বা দাওয়াত দেওয়া নিষিদ্ধ নয়; বরং এটি আনন্দ প্রকাশের একটি বৈধ উপায়, যদি তাতে অপচয় ও গর্ব-অহংকার না থাকে।"

— রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৪৯ (অনুরূপ)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:

"খতনা উপলক্ষে খাওয়ানো জায়েজ; এটি শুকরিয়ার একটি মাধ্যম। তবে এতে শরীয়তের সীমা অতিক্রম করা যাবে না।"

— মাআরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা: ২৩৩-এর তাফসীর প্রসঙ্গে

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:

"খতনা উপলক্ষে খাওয়ানো বা ওয়ালিমা করা জায়েজ, যদি তা অপচয় ও লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে না হয়।"

— ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২১ (অনুরূপ)


৩. শর্ত ও সতর্কতা

খাতনা উপলক্ষে খাওয়ানো জায়েজ হলেও নিম্নলিখিত শর্তগুলো মানা আবশ্যক:

(১) অপচয় ও অতিরঞ্জন থেকে বেঁচে থাকা

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

«وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ»

অর্থ: "আর তোমরা অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।"

— সূরা আল-আরাফ: ৩১

(২) লোক দেখানো ও গর্ব-অহংকার পরিহার করা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ صَنَعَ إِلَيْكُمْ مَعْرُوفًا فَكَافِئُوهُ»

অর্থ: "যে তোমাদের প্রতি সদয় আচরণ করে, তোমরা তার প্রতিদান দাও।"

— সুনানে আবু দাউদ: ১৬৭২

তবে শুধু লোক দেখানোর জন্য বা প্রতিযোগিতামূলকভাবে খাওয়ানো নিষিদ্ধ।

(৩) হারাম বিষয় থেকে মুক্ত রাখা

  • গান-বাজনা, নাচ-গান, বাদ্য ইত্যাদি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে হবে।
  • মদ, জুয়া, অশ্লীলতা ইত্যাদি হারাম বিষয় থাকা যাবে না।
  • ছবি তোলা বা ভিডিও করা যদি শরীয়তসম্মত হয় (প্রয়োজনীয়তা ছাড়া নয়)।

(৪) ঋণ নিয়ে বা কষ্ট করে খাওয়ানো পরিহার করা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا تُنْفِقُوا إِلَّا مَا عِنْدَكُمْ»

অর্থ: "তোমরা তাই ব্যয় করো যা তোমাদের কাছে আছে।"

— সহীহ বুখারী: ৫৩৫৬

(৫) গরিব-দুঃখীদের অন্তর্ভুক্ত করা

শুধু ধনীদের দাওয়াত দিয়ে গরিবদের বাদ দেওয়া উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«شَرُّ الطَّعَامِ طَعَامُ الْوَلِيمَةِ يُدْعَى إِلَيْهَا الْأَغْنِيَاءُ وَيُتْرَكُ الْفُقَرَاءُ»

অর্থ: "সর্বনিকৃষ্ট খাবার হলো সেই ওয়ালিমার খাবার, যেখানে শুধু ধনীদের দাওয়াত দেওয়া হয় এবং গরিবদের বাদ দেওয়া হয়।"

— সহীহ মুসলিম: ১৪৩২


৪. খাতনা ও আকিকার সম্পর্ক

যদি খাতনার সাথে আকিকা করা হয়, তবে তা আরও উত্তম। আকিকা সুন্নত এবং খাতনা সুন্নত — উভয়ই পালিত হবে। তবে খাতনা উপলক্ষে শুধু খাওয়ানোও জায়েজ।

ইমাম তাহতাবি (রহ.) বলেন:

"খতনা ও আকিকা একসাথে করা জায়েজ; বরং অনেক আলেম এটিকে উত্তম বলেছেন।"

— মিরকাতুল মাফাতিহ, ৬/২৩৪


৫. উপসংহার

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | খাতনা করা | সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ | | খাতনা উপলক্ষে খাওয়ানো | জায়েজ ও বৈধ | | অপচয়/লোক দেখানো | নিষিদ্ধ | | গান-বাজনা/হারাম | সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ | | গরিবদের বাদ দেওয়া | নিন্দনীয় | | ঋণ নিয়ে খাওয়ানো | পরিহার করা উচিত |

সারসংক্ষেপ: সুন্নাতে খাতনা উপলক্ষে মানুষ খাওয়ানো জায়েজ। এটি শুকরিয়া ও আনন্দ প্রকাশের বৈধ মাধ্যম। তবে অপচয়, লোক দেখানো, গান-বাজনা, হারাম বিষয় এবং গরিবদের বাদ দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। যদি এসব থেকে মুক্ত থাকে, তবে খাতনার দাওয়াত দেওয়া সওয়াবের কাজ।


📚 তথ্যসূত্র

  1. সহীহ বুখারী — ৫৮৮৯, ৫৩৫৬
  2. সহীহ মুসলিম — ২৫৭, ১৪৩২
  3. সুনানে আবু দাউদ — ২৮৩৬, ১৬৭২
  4. সুনানে তিরমিজি — ১৫১৬
  5. রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) — ৬/৩৩৬, ৬/৩৪৯, ৬/৭৫১
  6. ফাতাওয়া আলমগিরি — ৫/৩৫৭
  7. মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি) — সূরা বাকারা: ২৩৩
  8. ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) — ২/৪২১
  9. মিরকাতুল মাফাতিহ — ৬/২৩৪
  10. ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) — ৪/২৮৭

⚠️ দ্রষ্টব্য: উপরোক্ত উত্তরটি হানাফি ফিকহ অনুযায়ী প্রদান করা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনার স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি বা দারুল ইফতার সাথে পরামর্শ করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.