সুন্নাতে খাতনা উপলক্ষে মানুষ খাওয়ানো জায়েজ কি না ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
সুন্নাতে খাতনা উপলক্ষে মানুষ খাওয়ানো জায়েজ?
প্রশ্ন: সুন্নাতে খাতনা উপলক্ষে মানুষ খাওয়ানো জায়েজ?
উত্তর:
সুন্নাতে খাতনা (খতনা/মুসালমানি) উপলক্ষে মানুষ খাওয়ানো বা ওয়ালিমা করা শরীয়তসম্মত এবং জায়েজ। এটি শুকরিয়া ও আনন্দ প্রকাশের একটি বৈধ মাধ্যম। তবে এতে কয়েকটি শর্ত ও সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।
১. খাতনার বিধান
খাতনা (পুরুষদের জন্য খতনা করা) সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الْفِطْرَةُ خَمْسٌ: الْخِتَانُ، وَالِاسْتِحْدَادُ، وَقَصُّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمُ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفُ الْإِبْطِ»
অর্থ: "ফিতরত (স্বভাবজাত সুন্নত) পাঁচটি — খতনা করা, নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করা, গোঁফ ছোট করা, নখ কাটা এবং বগলের পশম উপড়ানো।"
— সহীহ বুখারী: ৫৮৮৯; সহীহ মুসলিম: ২৫৭
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে পুরুষের খতনা সুন্নত। (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৭৫১; ফাতাওয়া আলমগিরি, ৫/৩৫৭)
২. খাতনা উপলক্ষে খাওয়ানোর বিধান
(ক) জায়েজ হওয়ার দলিল
খাতনা উপলক্ষে খাওয়ানো মূলত একটি আনন্দ ও শুকরিয়ার ভোজ। শরীয়তে আনন্দ-উৎসব উপলক্ষে খাওয়ানোর অনুমতি রয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ সন্তান জন্মের পর আকিকা করেছেন এবং লোকদের খাওয়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«عَنِ الْغُلَامِ شَاتَانِ مُكَافِئَتَانِ، وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ»
অর্থ: "ছেলের জন্য দু'টি সমান বয়সের ছাগল এবং মেয়ের জন্য একটি ছাগল (আকিকার জন্য)।"
— সুনানে আবু দাউদ: ২৮৩৬; সুনানে তিরমিজি: ১৫১৬
আকিকা মূলত জন্মের সপ্তম দিনে হয়। তবে খাতনার সময়ও যদি আকিকা করা হয় বা শুকরিয়ার ভোজ দেওয়া হয়, তবে তা জায়েজ। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"আকিকা সপ্তম দিনে করা সুন্নত; তবে বালেগ হওয়ার পরও করা যায়।"
— রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৩৬
(খ) ফকীহদের অভিমত
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেন:
"খতনা উপলক্ষে খাওয়ানো বা দাওয়াত দেওয়া নিষিদ্ধ নয়; বরং এটি আনন্দ প্রকাশের একটি বৈধ উপায়, যদি তাতে অপচয় ও গর্ব-অহংকার না থাকে।"
— রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৪৯ (অনুরূপ)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:
"খতনা উপলক্ষে খাওয়ানো জায়েজ; এটি শুকরিয়ার একটি মাধ্যম। তবে এতে শরীয়তের সীমা অতিক্রম করা যাবে না।"
— মাআরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা: ২৩৩-এর তাফসীর প্রসঙ্গে
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"খতনা উপলক্ষে খাওয়ানো বা ওয়ালিমা করা জায়েজ, যদি তা অপচয় ও লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে না হয়।"
— ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২১ (অনুরূপ)
৩. শর্ত ও সতর্কতা
খাতনা উপলক্ষে খাওয়ানো জায়েজ হলেও নিম্নলিখিত শর্তগুলো মানা আবশ্যক:
(১) অপচয় ও অতিরঞ্জন থেকে বেঁচে থাকা
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
«وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ»
অর্থ: "আর তোমরা অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।"
— সূরা আল-আরাফ: ৩১
(২) লোক দেখানো ও গর্ব-অহংকার পরিহার করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ صَنَعَ إِلَيْكُمْ مَعْرُوفًا فَكَافِئُوهُ»
অর্থ: "যে তোমাদের প্রতি সদয় আচরণ করে, তোমরা তার প্রতিদান দাও।"
— সুনানে আবু দাউদ: ১৬৭২
তবে শুধু লোক দেখানোর জন্য বা প্রতিযোগিতামূলকভাবে খাওয়ানো নিষিদ্ধ।
(৩) হারাম বিষয় থেকে মুক্ত রাখা
- গান-বাজনা, নাচ-গান, বাদ্য ইত্যাদি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে হবে।
- মদ, জুয়া, অশ্লীলতা ইত্যাদি হারাম বিষয় থাকা যাবে না।
- ছবি তোলা বা ভিডিও করা যদি শরীয়তসম্মত হয় (প্রয়োজনীয়তা ছাড়া নয়)।
(৪) ঋণ নিয়ে বা কষ্ট করে খাওয়ানো পরিহার করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا تُنْفِقُوا إِلَّا مَا عِنْدَكُمْ»
অর্থ: "তোমরা তাই ব্যয় করো যা তোমাদের কাছে আছে।"
— সহীহ বুখারী: ৫৩৫৬
(৫) গরিব-দুঃখীদের অন্তর্ভুক্ত করা
শুধু ধনীদের দাওয়াত দিয়ে গরিবদের বাদ দেওয়া উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«شَرُّ الطَّعَامِ طَعَامُ الْوَلِيمَةِ يُدْعَى إِلَيْهَا الْأَغْنِيَاءُ وَيُتْرَكُ الْفُقَرَاءُ»
অর্থ: "সর্বনিকৃষ্ট খাবার হলো সেই ওয়ালিমার খাবার, যেখানে শুধু ধনীদের দাওয়াত দেওয়া হয় এবং গরিবদের বাদ দেওয়া হয়।"
— সহীহ মুসলিম: ১৪৩২
৪. খাতনা ও আকিকার সম্পর্ক
যদি খাতনার সাথে আকিকা করা হয়, তবে তা আরও উত্তম। আকিকা সুন্নত এবং খাতনা সুন্নত — উভয়ই পালিত হবে। তবে খাতনা উপলক্ষে শুধু খাওয়ানোও জায়েজ।
ইমাম তাহতাবি (রহ.) বলেন:
"খতনা ও আকিকা একসাথে করা জায়েজ; বরং অনেক আলেম এটিকে উত্তম বলেছেন।"
— মিরকাতুল মাফাতিহ, ৬/২৩৪
৫. উপসংহার
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | খাতনা করা | সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ | | খাতনা উপলক্ষে খাওয়ানো | জায়েজ ও বৈধ | | অপচয়/লোক দেখানো | নিষিদ্ধ | | গান-বাজনা/হারাম | সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ | | গরিবদের বাদ দেওয়া | নিন্দনীয় | | ঋণ নিয়ে খাওয়ানো | পরিহার করা উচিত |
সারসংক্ষেপ: সুন্নাতে খাতনা উপলক্ষে মানুষ খাওয়ানো জায়েজ। এটি শুকরিয়া ও আনন্দ প্রকাশের বৈধ মাধ্যম। তবে অপচয়, লোক দেখানো, গান-বাজনা, হারাম বিষয় এবং গরিবদের বাদ দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। যদি এসব থেকে মুক্ত থাকে, তবে খাতনার দাওয়াত দেওয়া সওয়াবের কাজ।
📚 তথ্যসূত্র
- সহীহ বুখারী — ৫৮৮৯, ৫৩৫৬
- সহীহ মুসলিম — ২৫৭, ১৪৩২
- সুনানে আবু দাউদ — ২৮৩৬, ১৬৭২
- সুনানে তিরমিজি — ১৫১৬
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) — ৬/৩৩৬, ৬/৩৪৯, ৬/৭৫১
- ফাতাওয়া আলমগিরি — ৫/৩৫৭
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি) — সূরা বাকারা: ২৩৩
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) — ২/৪২১
- মিরকাতুল মাফাতিহ — ৬/২৩৪
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) — ৪/২৮৭
⚠️ দ্রষ্টব্য: উপরোক্ত উত্তরটি হানাফি ফিকহ অনুযায়ী প্রদান করা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনার স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি বা দারুল ইফতার সাথে পরামর্শ করুন।