মিথ্যা অপবাদ দিলে কি গুনাহ হয়? পরিত্রানের উপায় কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
২। নামাজে الله أكبر বলতে গিয়ে অজান্তেই الله وكبر উচ্চারণ হয়ে গেলে নামাজের কোনো সমস্যা হবে? নামাজ কি বাতিল হয়ে যাবে?
Answer
প্রশ্নোত্তর: নামাজ ও গুনাহ সংক্রান্ত
প্রশ্ন ১: মিথ্যা অপবাদ (কাজিন সম্পর্কে সমকামিতার মিথ্যা অপবাদ)
গুনাহ হওয়ার বিষয়টি:
হ্যাঁ, উক্ত ব্যক্তির গুনাহ হয়েছে। কারণ—
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ۖ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ
অর্থ: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয়ই কিছু ধারণা পাপ। আর তোমরা গোয়েন্দাগিরি করো না এবং একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তা অপছন্দই করো। আর আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)
হাদীসে এসেছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟» قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: «ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ» قِيلَ: أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ قَالَ: «إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ»
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমরা কি জানো গীবত কী?" সাহাবায়ে কেরাম বললেন: "আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।" তিনি বললেন: "তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কিছু বলা যা সে অপছন্দ করে।" জিজ্ঞাসা করা হলো: "আমি যা বলছি তা যদি তার মধ্যে থাকে তবে?" তিনি বললেন: "যদি তা তার মধ্যে থাকে তবে তুমি গীবত করলে; আর যদি তা না থাকে তবে তুমি অপবাদ (বুহতান) দিলে।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৯)
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়: যেহেতু কাজিনের মধ্যে সমকামিতা নেই, তাই এটি শুধু গীবত নয়; বরং বুহতান (মিথ্যা অপবাদ) — যা গীবতের চেয়েও গুরুতর পাপ। ইমাম নববী (রহঃ) বলেন: "বুহতান হলো এমন মিথ্যা বলা যা দ্বারা কোনো ব্যক্তিকে অপমান করা হয়।" (শরহু সহীহ মুসলিম)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন: "বুহতান হলো গীবতের চেয়েও কঠিন; কারণ এতে মিথ্যা ও অপবাদ উভয়ই বিদ্যমান।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৪০৩)
মাফ চাওয়ার বিষয়টি:
হ্যাঁ, তাকে কাজিনের কাছে মাফ চাইতে হবে। কারণ—
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ فَلْيَتَحَلَّلْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمٌ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ»
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যার কাছে তার ভাইয়ের হক নষ্ট করার বিষয় থাকে, সে যেন আজই তাকে মাফ করিয়ে নেয়, সেদিন আসার আগে যেদিন কোনো দিনার-দিরহাম থাকবে না। যদি তার নেক আমল থাকে তবে তা থেকে নিয়ে নেওয়া হবে; আর যদি নেক আমল না থাকে তবে তার সাথীর গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।" (সহীহ বুখারী: ২৪৪৯)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন: "গীবত ও বুহতানের তাওবা তিনটি শর্তে সহীহ হয়: (১) আল্লাহর কাছে তাওবা করা, (২) যার গীবত করা হয়েছে তার কাছে মাফ চাওয়া, (৩) যে مجلسে গীবত করা হয়েছে সেখানে সংশোধন করা বা ক্ষমা প্রার্থনা করা।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৪০৫)
সরাসরি মাফ না চেয়ে পরিত্রাণের উপায়:
প্রশ্নে বলা হয়েছে যে কাজিন এ বিষয়ে জানে না এবং পরিচিত ব্যক্তিরা তাকে চিনে না। এমতাবস্থায়—
উলামায়ে কেরামের মতামত:
১. যদি কাজিনের কাছে পৌঁছার সম্ভাবনা না থাকে এবং তার কষ্ট হওয়ার আশঙ্কা না থাকে — তবে তার কাছে মাফ না চেয়ে বরং তার জন্য দুআ ও ইস্তিগফার করা এবং তার প্রশংসা করা (যেখানে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল সেখানে) — এটাই সর্বোত্তম পথ।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন: "যদি গীবতকারী জানতে পারে যে, যার গীবত করা হয়েছে সে যদি জানতে পারে তবে আরও বেশি কষ্ট পাবে বা সম্পর্ক নষ্ট হবে, তবে তার কাছে মাফ না চেয়ে তার জন্য দুআ করা এবং তার প্রশংসা করা উত্তম।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৮/২৩৩)
ইমাম নববী (রহঃ) বলেন: "গীবতের কাফফারা হলো: যার গীবত করা হয়েছে তার জন্য দুআ করা, তার প্রশংসা করা এবং যে مجلسে গীবত করা হয়েছে সেখানে তার প্রশংসা করা।" (আল-আযকার: ৩২৪)
২. তবে হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত হলো: যদি মাফ চাওয়ার দ্বারা আরও বড় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা না থাকে, তবে মাফ চাওয়া উত্তম ও নিরাপদ। আর যদি ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে তার জন্য দুআ করা এবং তার প্রশংসা করা।
মুফতি তাকি উসমানি (দাঃবাঃ) বলেন: "গীবত ও অপবাদের তাওবা হলো: (১) আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা, (২) যার হক নষ্ট হয়েছে তার হক ফিরিয়ে দেওয়া বা মাফ চাওয়া — যদি সম্ভব হয় এবং ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে।" (ফাতাওয়া উসমানি: ৩/৪৫৬)
সারসংক্ষেপ:
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | গুনাহ হয়েছে কি? | হ্যাঁ, বুহতান (মিথ্যা অপবাদ) — যা কবিরা গুনাহ | | মাফ চাওয়া কি জরুরি? | হ্যাঁ, সম্ভব হলে এবং ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলে | | সরাসরি মাফ না চাইলে? | তার জন্য দুআ করা, ইস্তিগফার করা, তার প্রশংসা করা | | তাওবার শর্ত | (১) আল্লাহর কাছে তাওবা, (২) হক ফিরিয়ে দেওয়া/মাফ চাওয়া, (৩) সংশোধন |
পরামর্শ: উক্ত ব্যক্তি যেহেতু দ্বীনের বুঝ পাওয়ার পর অনুতপ্ত, তাই সে যেন:
- আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করে
- কাজিনের জন্য দুআ করে
- সম্ভব হলে কাজিনের কাছে মাফ চায় (যদি ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে)
- ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে বিরত থাকে
প্রশ্ন ২: নামাজে "الله أكبر" বলতে গিয়ে "الله وكبر" উচ্চারণ হয়ে গেলে
বিধান:
নামাজ বাতিল হবে না। কারণ—
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
الْخَطَأُ فِي الْقِرَاءَةِ لَا يُبْطِلُ الصَّلَاةَ إِذَا لَمْ يَتَغَيَّرِ الْمَعْنَى
অর্থ: "পাঠে ভুল হলে নামাজ বাতিল হয় না, যতক্ষণ না অর্থ পরিবর্তিত হয়।"
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন: "যদি কেউ 'الله أكبر' এর স্থলে 'الله وكبر' বলে, তবে তা নামাজ বাতিল করবে না; কারণ এটি নামাজ ভঙ্গের মতো অর্থের পরিবর্তন করে না, বরং এটি 'و' (ও) এর অতিরিক্ত।" (রাদ্দুল মুহতার: ১/৪০৫)
ইমাম হাসকাফি (রহঃ) বলেন: "তাকবীরে তাহরীমায় যদি 'الله أكبر' এর পরিবর্তে 'الله وكبر' বলা হয়, তবে নামাজ সহীহ হবে; কারণ এটি নামাজ ভঙ্গের মতো অর্থের পরিবর্তন করে না।" (আদ-দুররুল মুখতার: ১/৪০৫)
ফাতাওয়া আলমগিরিতে এসেছে:
وَلَوْ قَالَ: اللَّهُ وَكْبَرُ، أَوْ اللَّهُ الْكَبِيرُ، أَوِ اللَّهُ كَبِيرٌ، يَجُوزُ فِي قَوْلِ أَبِي حَنِيفَةَ وَأَبِي يُوسُفَ وَمُحَمَّدٍ
অর্থ: "যদি কেউ 'আল্লাহু ওয়া কাবার', 'আল্লাহুল কাবীর', বা 'আল্লাহু কাবীর' বলে, তবে ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) এর মত অনুযায়ী তা জায়েয হবে।" (ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/৬৮)